আবছায়া

295 Views

Spread the love

জীবন পরিব্রাজক,

মৃত্যুর দরজা পর্যন্ত

.
অপ্রতিমের প্রতিটি পদক্ষেপে গাঢ় আবহ’র বিষাদ। টুকরো টুকরো অন্ধকার জড়ো হয়েছে ওর চোখে, মুখে—শরীরের পুরোটা জুড়ে। তমসাবৃত এ শরীর আলো ধারণে অক্ষম। অথচ মাথার উপরে প্রাচীন সূর্য আলোর দম্ভ নিয়ে দাঁড়িয়ে। অপ্রতিমের জীবনে এই অপ্রত্যাশিত প্রলয় খুব বেশি দিনের নয়। অনভিপ্রেত, অকস্মাৎ এ পাওয়া কষ্টদায়ক, মর্মহন্তারক।

পরিচিত পরিবেশ অথচ ছড়ি হাতে বের হতে হয়। জীবন এখন মৃত্যুসম। অভিনব আর আশ্চর্য কিছু সহসা হাজির হয়ে জীবনকে বদলে দেবে না নিশ্চিত। একাকী চলাও কষ্টকর—চেনা জীবন যেমন বিভ্রান্তিতে ফেলেছে, চেনা পথ অচেনা হতে কতক্ষণ। অপ্রতিম সঙ্গ চায় সৌরভের, নয়তো অন্য কোনো শুভাকাঙ্ক্ষীর।

দৃষ্টি হারিয়েছে বলেই হয়তো মানুষের দৃষ্টিকে ওর বড় ভয়। বাবুলের দোকানে চা খেতে খেতে ভেবে মরে মানুষের অন্তরের কথা, অপ্রকাশ্যে উচ্চারিত বাক্যবাণ। ওর চোখের উপরেই হয়তো মানুষ ছুড়ে দেয় অদ্ভুত রহস্যময় দৃষ্টি। কখনো করুণার, কখনো নির্মম সে দৃষ্টি। চা খেতে এসেছে রজব, সালাউদ্দিন, কণ্ঠস্বরে অচেনা আরো অনেকে। ‘জীবননগর প্রি ক্যাডেট স্কুল’ এর মাস্টার রজব কি ভ্রু কুচকে আছে? নাকি সবসময়ের মতো এখেনো প্রলাপ বকছে, ‘দুই চইখ্যা কানার আবার আলোর ইস্কুল!’ ‘আমরা ঐক্যবদ্ধ’ সংগঠনের সভাপতি সালাউদ্দিন কি মিটিমিটি হাসছে? ও হয়তো সবসময়ের মতো আওড়াচ্ছে মনে মনে, ‘দলছুট হয়ে গেছে গৃহপালিত মানুষ।’

সৌরভের কাঁধে অপ্রতিমের হাত। হাঁটতে হবে। জীবন পরিব্রাজক, মৃত্যুর দরজা পর্যন্ত। একটা পাতা এসে পড়ল অপ্রতিমের মাথায়। উপরে চেয়েও বটগাছকে দেখা আর সম্ভব নয়। বটগাছের ছায়া কি অনুভব করতে পারবে? এ ছায়া ঘন-অন্ধকারে কিভাবে প্রভাব ফেলবে? অদৃশ্য পাখির উড়ে যাবার শব্দ আসে। চোখের আলো কেড়ে নিয়েছে নদীর তরঙ্গ দেখার সাধ। প্রকৃতির ঘ্রাণ ওকে খুব বেশি বিমোহিত করতে পারছে না। অনভ্যস্ত এ বোধ থেকে আলোর স্পর্শ ওকে বেশি আন্দোলিত করে। ব্যাকুল হয়ে যায় আলোতে মিশতে।

অতঃপর অপ্রতিম জেনেছে চোখের ভেতরেই যাবতীয় অন্ধকার।

 

.
অপ্রতিমের পুরো রুম জুড়ে বইয়ের স্তূপ। আযৌবনের কবি হওয়ার অনুশীলনে, সাধনায়, ওর মনে ভাবুক পরিচয় খুব বেশি পাওয়া যায় নি, বরঞ্চ পাঠক পরিচয় ওর সৌভাগ্যে স্বীকৃত হয়ে আছে। লাইব্রেরিতে অসংখ্য ফুল। প্রতিদিনই জীবন্ত থাকছে সুবাস নিয়ে।

বন্ধু সৌরভ আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিন’ বইটা হাতে নিয়ে বলল, ‘তুই তো ইচ্ছে করলে বই পড়েই উত্তম সময় কাটাতে পারিস। বারবার বলা সত্ত্বেও ব্রেইল পদ্ধতিটা শিখে নিচ্ছিস না কেন?’

‘সৌরভ, বই আমার ভেতরটা আন্দোলিত করবে জানি। কিন্তু চোখের অন্ধকার যে মনকে দুর্বল করে ফেলছে। আমি ভেতর থেকে শক্তি পাচ্ছি না, আত্মপ্রত্যয়ের সাহস আমি দেখাতে পারছি না।’

‘আমাদের ‘আলোর স্কুল’ নিয়ে কী করা যায় বল তো? ছাত্রছাত্রী দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। আমার একার পক্ষে স্কুল চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে।’

অপ্রতিমের অন্ধচোখেও গাঢ় অন্ধকার নেমে আসে। ‘আলোর স্কুল’ এর উদ্দেশ্য নিরন্ন আর অসহায় ছেলেমেয়েদের জীবনকে শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত করা। উচ্ছ্বাস আর উদ্দীপনায় স্কুল শুরু হয়েছিল অপ্রতিম, অপরাজিতা এবং সৌরভের হাতে।

‘অপরাজিতা সময় দিচ্ছে না তোকে?’

‘অপরাজিতা বেশ কিছুদিন যাবৎ সময় দিচ্ছে না। ওর পরিবার চায় না ও স্কুলে সময় দিক। অপরাজিতার সাথে তোর ফোনে কথা হয় না?’

অপ্রতিম ব্যথিত হয়। ‘আমি আর ফোন ব্যবহার করছি না। ফোন আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয় আমি অন্ধ, অক্ষম। যাদের ভেতরে শিক্ষার আলো নাই, তারা নামমাত্র আত্মীয়তার সম্পর্ক নিয়ে আমাকে পরামর্শ দেয়। সাহসের পাঠ দেয়, নৈতিকতার পাঠ দেয়। যেন চোখ আছে বলে সে জ্ঞানী আর আমি দৃষ্টিহীন বলে নির্জ্ঞান। কতোটা তুচ্ছ মানসিকতার হলে মানুষ এমনটা ভাবতে পারে।’

অপরাজিতার কথা প্রকাশ্যে এড়িয়ে গেলেও অপ্রতিম ভেতরে ক্লান্তি অনুভব করে। দৃষ্টি হারিয়ে অপ্রতিমের অন্তর্দৃষ্টি, দূরদৃষ্টি বৃদ্ধি পেয়েছে। ইন্দ্রিয়ানুভূতি প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। তবুও বর্তমান জীবন মূলত পরাজয়ের সাক্ষী। আত্মাভিমান জাগে, অবসাদ বোধ করে।

‘অপ্রতিম, রজব স্যার আমাকে উনার স্কুলে জয়েন করতে বলছে?’

‘তোর কী ভাবনা?’

‘বন্ধু, আমি তো হাঁপিয়ে উঠছি ক্রমশ। চাকরি নাই। পরিবার থেকে খুব চাপ দিচ্ছে। বেকার জীবন যন্ত্রণাময়। চোখ থাকতেও অন্ধের মতন।’

সৌরভের উদাহরণে অপ্রতিমের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। অন্ধের দৃষ্টি নিয়ে উদাহরণ। এ অন্ধত্ব তো অহংকার নয়, পরাজয়ের নাম? অপ্রতিম ভেঙে পড়ে। ‘আলোর স্কুল’ বন্ধ হয়ে যাবে। অপরাজিতা সম্পর্ক ছিন্ন করবে। সৌরভ ‘জীবননগর স্কুল’ এ যোগদান করবে। আর কোনো অহংকার কি ওর মধ্যে জমা আছে? যা আছে সবটাই কি অভিমান, আত্মক্ষরণ আর দীর্ঘশ্বাস নয়?

‘অপ্রতিম, সালাউদ্দীন ভাই তো ক্যারাম খেলার টুর্নামেন্ট ছাড়ছে।’

‘আমাকে উত্তেজিত করতেই এ খেলার আয়োজন।’

‘তুই সুস্থ থাকলে তো তোর সাথেই খেলতাম। এখন সালাউদ্দীন ভাইয়ের সাথেই পার্টনার হয়ে খেলতে হবে। উনি খুব জোর করছে।’

হাসি পায় অপ্রতিমের। যদিও দৃষ্টির মতো ওর মুখের অন্ধকারও গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়।

অতঃপর অপ্রতিমের ভাবনায় খেলা করে জীবনকে উপহাস করার আয়োজন। তবু আলোর পৃথিবী সালাউদ্দীনদের জন্য।

অপরাজিতার ভেতরে যেয়ে অন্ধ হতে চেয়েছিল

 

.
এক ঘোর বিষণ্নতা নিয়ে বসে থাকতে হয় অপ্রতিমকে। বইয়ের স্পর্শে মনে ভালোলাগা বোধ ফিরে আসছিল। অন্ধকার হয়তো পুরো শরীর দখল নিয়েছে, তাই বলে স্পর্শের অনুভূতি তো আর হারিয়ে যায় নি। বরং তা আরো বেড়েছে। এখন স্পর্শে থাকে যত্নের পরশ।

ভেতর রুম থেকে মা, বড় ভাই আর ছোট বোনের কথা ভেসে আসে অপ্রতিমের কানে। অপ্রতিমের ভবিষ্যৎ ঘিরেই কথার সূত্রপাত। তারপর বয়ানে বয়ানে তাৎপর্য।

মা বলছে, ‘ওরে তো বিয়া দেয়ন দরকার। বয়স তো তিরিশের মতন হইয়া গেল।’

ছোট বোন বলছে, ‘আমার হাতে অনেক পাত্রী ছিল কিন্তু অন্ধকে কে বিয়ে করবে?’

বড় ভাই বলছে, ‘মা, তোমার তহন অমত করা ঠিক হয় নাই। এহন তো ওই মাইয়ার পরিবার রাজি হইতাছে না।’

মা রেগে ওঠে। ‘আমি কী জানতাম ওর অ্যাক্সিডেন্ট হইবো?’ সহজ হয়ে বলে, ‘মাইয়াডারে একদিন বাড়িত আইনা বুঝামু নাকি? এত-না প্রেম, এহন বিয়া করব না কেন?’

ভাবি এসে যোগ দিল। ‘আমার মনে হয় না ওই মেয়ে আর রাজি হবে। এখনকার মেয়েরা নিশ্চয়তার জীবন চায়, স্বস্তির জীবন চায়।’

বড় ভাই আবার বলছে, ‘অন্ধকালা যা হয়, খুঁইজা বিয়া দিয়া দাও। ও তো আর দেখতাছে না মাইয়ার রূপ। কিন্তু ঠান্ডা কিসিমের মাইয়া লাগব। একটু বোকাও লাগব। বেশি চালাক হইলে সমস্যা আছে।’

‘আস্তে বলো না। শুনতে পাবে তো।’ ভাবির সাবধানী উচ্চারণ।

মা হতাশায় পূর্ণ হয়ে গেল। ‘আমার হইছে যত জ্বালা। এই বয়সে এইসব যন্ত্রণা কার ভালোলাগে।’

সবাই কিছুটা সময়ের জন্য নীরব। অপ্রতিমের শোনার আর ইচ্ছে জাগে না। দরজা বন্ধ করে দিল। জীবন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। অন্ধকার জমে যাচ্ছে। বিলীয়মান। ‘একটুকু ছোঁয়া’ সুখের জন্য সামনে শুধু অন্তহীন অপেক্ষার প্রহর।

এ জীবন প্রক্ষিপ্ত সাদৃশ্য। ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে মা, ভাই, বোন। তাদের আরোপিত দায়িত্বের ফাঁক অপ্রতিম চোখ দিয়ে নয়, মন দিয়ে অনুভব করে। অপরাজিতাও নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে ধীরে ধীরে। সময়ের চোখে যে অপরাজিতাকে প্রয়োজন এখন সবচেয়ে বেশি। একদিন তো হাতে হাত রেখেছিল। সেই হাত কি রেখেছিল খেলার ছলে? অথচ জীবন-বিনিময়ের কথা ছিল। অপ্রতিমের হৃদয়ের কথা, পুলক অনুভব এখন স্মৃতি হয়ে আছে। ছায়ার মতো মিশে আছে অন্ধশরীরে। আহা প্রেম, ভালোবাসা! ভালোবাসার সূচনায় একটি চুম্বন ছিল। সেই চুম্বনের আত্মকাহিনিতে ছিল দুজনের শারীরিক আর মানসিক সমর্থন। অতঃপর অপ্রতিমের মনে জেগে উঠেছিল গভীর প্রেম। অপরাজিতার ভেতরে যেয়ে ও অন্ধ হতে চেয়েছিল—মানসিক সেই অন্ধত্ব আজ নেই, আজ শুধু শারীরিক অন্ধত্বের গাঢ় রূপ।

অপ্রতিম আওড়ে যায় একা একা অস্ফুট স্বরে। তোমার ভেতরে যে অন্ধকার, হে যৌবনবতী, সেখানে চাষ করব ভেবেছিলাম আলোর শিশু।

অপ্রতিমের চোখে জল আর মুখে হাসি। প্রেমে তুমি আর অপ্রেমে তুমি—সরল আর জটিলের সংজ্ঞা। মেয়ে, তুমি কিংবদন্তির পথে এগিয়ে যাও, নিরুদ্বেগে, নবোদ্যমে। মন তো অন্ধ নয়, মন তোমার আঙুল ছোঁয়ার জন্য দাঁড়াবে না। তোমাকেও দাঁড় করিয়ে রাখবে না। অপ্রতিম আর চায় না তোমার সান্নিধ্য, সজীবতা। প্রেমে মিলন কি খুব গুরুত্বপূর্ণ? প্রেমে সততা আর শ্রদ্ধাই গুরুত্বপূর্ণ।

অপ্রতিম আজ অন্ধচোখে নির্ঘুম কাটিয়ে দিবে সারাদিন। চোখের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে ঘুম—রাত নামুক পৃথিবীতে। তারপর ঘুম—উড়ন্ত এক স্বপ্ন। কিছুটা সান্ত্বনা আর স্বস্তিময় সময়।

অতঃপর অপ্রতিম জেনেছে স্বপ্ন অন্ধকারকেও পরাজিত করে। আবছায়া রূপে কালোর বাইরে রঙিন পৃথিবীর হাতছানি দেয়।

সড়কের একটা ভুল সারাজীবনের কান্না হয়ে রইল

 

.
মাঝ রাতে হঠাৎই অসুস্থ হয়ে যায় অপ্রতিম। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে ও একান্ত নিঃস্ব, অসহায় হয়ে যায়। আপনার ভেতরে তিলে তিলে মরে যাওয়ার মতো অবস্থা যেন। রাতের সময়ে প্রকৃতিই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন—পরিবারের কারোরই জেগে থাকার কথা নয়। মাথায় ভীষণ যন্ত্রণা। পেটে প্রচণ্ডরকম ক্ষুধা। একটা শরীরের স্পর্শের আকুতিও ওকে ব্যাকুল করে।

বাড়িটা অন্ধকার গুহায় পরিণত হয়েছে। একে একে বন্ধ হয়ে গেছে যাবতীয় আলোর উৎসমুখ। এই পরিবেশে দৃষ্টি হারানো অপ্রতিম অবুঝ শিশুর মতো আচরণ করে। শিশুর মতো চাঞ্চল্য ওকে অস্থির করে। শিশুরা শরীর ও মন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, অপ্রতিম ব্যর্থ শরীর নিয়ন্ত্রণে। সেই অনিয়ন্ত্রিত শরীর আবার মনকে প্রভাবিত করে।

বিছানা থেকে উঠে টেবিল হাতড়ে খাবারের সেরকম কিছুই পেল না। জল পান করল দুগ্লাস। শুধু তৃষ্ণার ক্ষুধা নিবারণ হলো। তবু মাকে ডাকতে সাহস হলো না। অহেতুক অস্বস্তি শরীরকে বাধা দিল। পরিবারের অন্যরাও অপ্রতিমের ডাক শুনতে রাজি নয়, এই মুহূর্তে।

কান্না পেল প্রচণ্ডরকম। এমন কি হওয়ার কথা ছিল? সড়কের একটা ভুল সারাজীবনের কান্না হয়ে রইল। কবে নিরাপদ হবে সড়ক? কবে নিরাপদ হবে স্বপ্ন, জীবন?

অন্ধকার, ক্ষুধা, মান-অভিমানসহ যাবতীয় ভাবনা টপকে অপরাজিতা মনে উঁকি দিচ্ছে এখন। এ আহ্বান কি মনের নাকি শরীরের? মোহ জেগে উঠছে কি? মোহ নয়, কামনা। কাম, ক্রোধ। শরীরের এ চাওয়া কি অযৌক্তিক? পেটের ক্ষুধা চলে গেল—তৃষ্ণা চলে গেল—জৈবিক ক্ষুধার তাড়নায় অপ্রতিমের অস্থির প্রহর।

একটা অন্ধমেয়েকেই এনে দিক। হোক না সেই মেয়েটি বোবাকালা। তবুও তো প্রতিটি অঙ্গের সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হবে। ঘনকালো অন্ধরং চুলে সুবাস রবে জেগে। যুগল স্তনের শোভা থাকবে। রসাশ্রিত ওষ্ঠাধরে চুম্বনের আদর থাকবে। নাভির গভীরে স্পর্শের পুলক, কামনার স্বাদ থাকবে। অন্ধকার যোনিপথে আলোর উৎস খুঁজে পাবে। কী সব ভাবছে অপ্রতিম? জীবনকে নিজের মতো চালনা করা আর কি সম্ভব? নিজেকে কিরকম অসহায় মনে হয় অপ্রতিমের।

একটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্তও কি পারে না জীবনের রং বদলে দিতে? অন্ধজীবন আত্মহন্তারকের অধিকার তো আর কেড়ে নিতে পারে নি। কী লাভ বেঁচে থেকে? মর্মযাতনায় আপনাকে নিঃশেষ করে দিয়ে! আর কি কোনো প্রাপ্তির সম্ভবনা আছে এ জীবনঘিরে? প্রত্যাশার অধিকারও তো হরণ করে নিয়েছে অন্ধসমাজ, পরিবার, প্রেমিকা। সিঁড়ি বেয়ে ছাদে ওঠা যায়। শূন্যে মেলে দেওয়া যায় শরীরের ভার। এ শূন্যতা হয়তো নিরাশ করবে না। মৃত্যু তো চিরন্তন সত্য—এই সত্যের মৃত্যু হবে না কখনো। তবে কেন জীবনকে ভালোবেসে মৃত্যুর কালক্ষেপণ।

অপরাজিতার কথা মনে পড়ে। এ নারী তো বিদুষী ছিল, কবিতা ভালোবাসত, তবে কেন পরাজিত হয়ে জীবনকে উপভোগ করতে চায়? ও ভালো নেই। পালিয়ে যাওয়া মানুষ কি কখনো ভালো থাকতে পারে? আর কিছু ভাবতে পারছে না অপ্রতিম। প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে অন্ধশরীরের কূপে কূপে। পশম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে সহসা। শরীরকে অস্থির করে তোলা একটা অঙ্গ বড় হয়ে যাচ্ছে আচমকা। অপ্রতিম দেহ-মনে ঠান্ডা হতে চায়। স্বমৈথুনে ডুবে গেল। অতঃপর অনন্ত অন্ধকারে যেয়ে অপ্রতিম আর ঘুমের আবহ পরস্পর জড়িয়ে শুয়ে রইল।

কিন্তু ঘুম কি সহজে আসে? ঘুম তো ক্ষণস্থায়ী মৃত্যু! অথচ অপ্রতিমের নিশ্বাসে-প্রশ্বাসে এখন মৃত্যুর আতঙ্ক, ভয়ংকর-মূর্তিরূপ। নৈঃশব্দ্যের গাঢ় প্রবাহ এক ঘোর বিষণ্নতায় ওর মন দখলে কবর-রূপ নিয়েছে। ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে শরীর। গরমের মধ্যেও অদ্ভুতরকম কাঁপন জেগে উঠছে—অন্যরকম, অনভিপ্রেত।

একটা আয়নার সামনে দাঁড়ালে দেখা যেত কিরকম প্রাণহীন দেহ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অপ্রতিম। আয়না! চোখ! অপ্রতিম! সব অন্ধকার! স্বপ্ন অন্ধকার! জীবন অন্ধকার!

অতঃপর শরীরে কবর বয়ে বেড়ানো অপ্রতিমের আরেকটা অন্ধকার প্রভাতের অপেক্ষা…

কখনো লাল রং দেখে নি। বিপদের রং দেখে নি। রক্তের রং দেখে নি।

 

 

.
‘তোমার কাছে স্বপ্নের রং কি?’

‘কালো।’

‘বেদনার রং?’

‘কালো।’

‘যৌবনের রং?’

‘কালো।’

‘মৃত্যুর রং?’

‘কালো।’

যেমনটা সন্দেহ করেছিল। তাই বিপদ আর রহস্যময়তার রং জিগ্যেস করে নি। রতনের কাছে স্বপ্নের রং বলতে কিছু নেই। ও শুধু বুকে কালোকেই ধারণ করেছে। কালো ছাড়া অন্যসব রং-ই ওর কাছে বিবর্ণ। ও কখনো লাল রং দেখে নি। বিপদের রং দেখে নি। রক্তের রং দেখে নি। বেদনার নীল রং রতনকে স্পর্শ করে নি। ধূসর বিষণ্নতা কি?তাও জানে না এই জন্মান্ধ যুবকটি।

ভালোবাসার রং কী? অপ্রতিম নিজেকেই প্রশ্ন করে। লাল, নীল, সবুজ, গোলাপি নাকি কালো? সাদাও হতে পারে। রতনের কাছে ভালোবাসার রং কী?

‘রতন, তোমার কাছে ভালোবাসার রং কী? ভালোবাসার মানে কী?’

‘আমার তো ওরে ছুঁইলেই ভালালাগে।’

এই ছেলেটি স্পর্শের অনুভূতিতেই ভালোবাসার স্বাদ পেয়েছে। ওর সঙ্গী সাদা নাকি কালো, তা ও কল্পনাও করে না। ও শুধু সান্নিধ্য চায়। এতেই সজীবতা, প্রফুল্লতা অনুভব করে।

কিন্তু অপ্রতিমের শুধু শরীর হলেই চলবে কেন? ও তো মনকেও চাইবে, মস্তিষ্ক চাইবে। অপ্রতিম মনের সব রং সম্পর্কে সচেতন। মানসিক প্রশান্তি না পেলে মন কি বর্ণহীন হয়ে যাবে না?

বাড়িতে আপাতত বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। এতে মায়ের প্রচণ্ডরকম আপত্তি। না বলে পারে নি, ‘আমি মইরা গেলে তোর কী হইব? কে দেখব তোরে?’

‘তুমি কি চাও তোমার আগে আমি মরে যাই?’

মা বুঝে নিয়েছিল এ কথার মর্মার্থ। অন্ধ হোক আর অক্ষমই হোক—হতাশা, অভিমান, ক্ষোভ তো প্রতিটি শরীর জুড়েই বসবাস করে।

গতকাল রাতের অস্থিরতায় মুষড়ে পড়েছিল অপ্রতিম। সৌরভকে খবর পাঠিয়েছিল সঙ্গ’র প্রত্যাশায়। সবার সঙ্গ তো আর সব মন সায় দেয় না। কথায় কথায় মনে জেগেছিল জন্মান্ধদের জীবনরহস্য, জীবনভাবনা সম্পর্কে জানার। জন্মান্ধরা কি স্বপ্ন দেখে? জন্মান্ধদের স্বপ্নের রং কী?

সৌরভ এক জন্মান্ধ ছেলেকে নিয়ে আসবে আশ্বাস দেয়। অন্ধত্বের অভিশাপ থেকে বন্ধুকে রক্ষার উদ্দেশ্যে বলে, ‘কর্নিয়া ট্রান্সপ্ল্যান্টের মাধ্যমে তো চোখ ঠিক করা যায়।’

‘আমার পরিবার থেকে এ ব্যাপারে কেউ খোঁজ রাখবে বলে মনে হয় না। তুই বরঞ্চ একটু খোঁজ-খবর রাখিস।’

‘আমি তো অবশ্যই খোঁজ রাখব। আরও একজন কিন্তু খোঁজ নিচ্ছে।’

‘কে?’

সৌরভ হাসি দিয়ে চলে গেল। অপ্রতিম পরে ভেবেছে এই রহস্যের রং কী?

অপ্রতিম বাড়ি থেকে বের হয়ে কিছুটা পথ এগিয়ে দেয় রতনকে। দুজন যুবকের চোখই দৃষ্টিহীন। আর বাকি সকলের দৃষ্টি সেই দুজনের দিকে। কেউ হাসে, কেউ দুঃখ প্রকাশ করে, কেউ নিছক উদাসীনতায় চেয়ে থাকে। সালাউদ্দীন সামনে এগিয়ে এসে তাচ্ছিল্যের গলায় বলে, অপ্রতিম কি অন্ধদের সাথে বন্ধুত্ব পাতা শুরু করছ নাকি?’

‘সালাউদ্দীন ভাই, আমি শুধু মানুষের সাথেই বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়তে চাই।’

আজ তোমাকে আমি নিয়ে যাব আগামীর পথে। এই হাত ছাড়তে বলো না। অনেক যুদ্ধ করে এই হাত ধরেছি।

‘জানো বোধহয়, ক্যারাম খেলার টুর্নামেন্ট ছাড়ছি। তুমি তো কানা, সব গুটিরেই দেখবা কালা। খেলতে পারবা না। কিন্তু সৌরভ খেলব না কেন? একটু আগে আইসা বলে কী, আমি খেলব না সালাউদ্দীন ভাই। কও তো মিয়া কেমন লাগে। তুমি কি ওরে কিছু বলছ?’

‘আমি মানুষ, গরু-ছাগল সবাইকেই কালো দেখি। আমার কথার দাম কী বলুন।’

অতঃপর অপ্রতিম বুঝতে পারে মানুষ হয়ে ওঠা সবচেয়ে কঠিন।

 

.
অপ্রতিম সিদ্ধান্ত নেয় জীবনকে রাঙানোর। নির্জীব, নিস্পৃহ হয়ে অন্ধজীবনের বোঝা-রূপ বেঁচে থাকায় কোনো স্বার্থকতা নাই। অন্ধকারে আলোর চাষ করতে হবে। নিজেকে তৈরি করতে পাঠে মনোনিবেশ করতে হবে। প্রতিজ্ঞায় সর্বস্ব ঢেলে দিতে হবে।

অপ্রতিম উপলব্ধিতে এ সমাজটাই অন্ধ। নিজেকে অন্ধ ভেবে, আলোহীন পথিক ভেবে গুটিয়ে নিলে অন্ধসমাজের অন্ধত্ব দূর হবে কিভাবে? অন্ধজীবনের সীমাবদ্ধতা মাঝে মাঝে দুর্বল করবে, জৈবিক তাড়না হয়তো বিভ্রান্ত করবে, তারপরও আত্মপ্রত্যয় আর দৃঢ় মনোবলে যাবতীয় সমস্যার সাথে যুদ্ধ করে যাবে।

ব্রেইল শিখবে অপ্রতিম। বেশি বেশি ব্রেইল বই প্রকাশের জন্য আন্দোলন করবে। জীবন সংগ্রামমুখর। এখানে যুদ্ধ না করে সুফল পাওয়া যায় না, সফল হওয়া যায় না।

সৌরভের সাথে বের হলো। আচমকাই একটা নরম হাতের স্পর্শ। অপ্রতিম ঘ্রাণে সমৃদ্ধ নয়, তবে অনুভবে অনুপম।

‘অপরাজিতা?’

‘আজ তোমাকে আমি নিয়ে যাব আগামীর পথে। এই হাত ছাড়তে বলো না। অনেক যুদ্ধ করে এই হাত ধরেছি।’

সৌরভ বলল, ‘তোরা যা। আমাকে “আলোর স্কুল” খুলতে হবে।’

অপ্রতিম কিছুটা সময়ের জন্য বাক্‌রুদ্ধ হয়ে যায়। স্পর্শেই বুঝে নিয়েছে অপরাজিতার অস্তিত্ব। তবে মন বুঝতে এতটা দেরি কেন?

‘হাত তো আমি ছাড়তে বলব না, অপরাজিতা। প্রিয়জনের হাত ধরেই আমি অন্ধকারে নিরাপদ থাকব। কিন্তু প্রিয়জন আলোতে অবস্থান নিয়ে অন্ধকার পরিত্যাগ করলে আমি কিভাবে হাত ধরার স্পর্ধা দেখাব?

‘আলো ধরতে স্পর্ধার প্রয়োজন হয় না। যদিও আমি জানি, আমিই হাত ধরেছি এক আলোকিত মানুষের।’

 

অতঃপর অপ্রতিম বুঝতে পারে জীবন শুধু অন্ধকারে ডুবে যায় না, আলোতেও হেসে ওঠে।

 

 

মহ্সীন চেীধুরী জয়

মহ্‌সীন চৌধুরী জয়

জন্ম ২ এপ্রিল, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ।

 

কবি ও কথাসাহিত্যিক।

 

ঢাকা সিটি কলেজ থেকে মার্কেটিংয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পেশায় সাংবাদিক।

 

প্রকাশিত বই —

 

অদৃশ্য আলোর চোখ [গল্পগ্রন্থ, অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পানি, ২০১৮]

শরীর [গল্পগ্রন্থ, প্রকাশনা সংস্থা তিউড়ি, ২০১৯]

 

সম্পাদনা করেছেন সাহিত্যের ছোট কাগজ ‘শীতলক্ষ্যা’।

 

ই-মেইল : joychironton@gmail.com

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *