আমার বাবা আমার যিশু-০৪

74 Views

Spread the love

 চার.

আমি আঠারোটা বছর মোটামুটি বাবা মায়ের কাছে ছিলাম। এই আঠারো বছরের ভেতরে এমন একটা ঈদ আমার জীবনে আসেনি যখন আমি ঈদের আগের দিন বাবা মায়ের ঝগড়া দেখিনি। রোজার মাস চলে এসেছে। বাবা ছাড়া বাড়ির সকলেই মোটামুটি রোজা আছে। আমিও বেশ কটা রোজা আছি। সারা রোজার মাস ধরে জিনিস কেনাকাটা চলছে। বাড়িতে ময়দা কিনে এনে মেশিন বসিয়ে সেমাই তৈরী করা হচ্ছে। দর্জি ডেকে বাড়ির ছেলেমেয়েদের জন্যে জামাকাপড় বানাতে দেওয়া হচ্ছে। ভোররাতে দেশভাগের পর যশোরে এসে থিতু হওয়া বিহারিদের কাওয়ালি শুনতে শুনতে ঘুম ভেঙে উঠে আমরা সকলে সেহেরি খাচ্ছি। আমরা তখন খুব পাকিস্তানী। কথায় কথায় উর্দু বলার চেষ্টা করছি। আমাদের বাবা বাড়িতে উর্দু মৌলবি নিয়ে এসেছেন আমাদের জোরেসোরে উর্দু শিক্ষা দেওয়ার জন্যে।

সবই হচ্ছে ঠিকঠাক। ঈদের দুদিন আগে থেকে হুড়দাড়াম শুরু হয়ে গেছে। আমাদের জুতো তখনও কেনা হয়নি। বাবার বক্তব্য হচ্ছে জুতো তো মাত্র গতবছরই বেশ বড় সাইজ দেখে কেনা হয়েছে। চামড়ার জুতো। সুতরাং এ বছর আর ছেলেমেয়েদের জুতো কেনবার দরকার নেই। বাবার কথা আমার বড়বোন, আমার ছোট ভাইবোনেরাও মোটামুটি মেনে নিয়েছে কিন্তু আমি মানতে পারছিনে। কারণ ঈদে আমার নতুন জুতো দরকার। প্রতিটি ঈদেই আমার নতুন জুতো দরকার। সুতরাং আমি স্কুলঘরের ঘুপচির ভেতরে বসে রান্নাঘরের বঁটি দিয়ে জুতো কেটে দু ভাগ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সহজে কি চামড়ার জুতো ছিঁড়তে চায়? তাছাড়া জুতো কিনে দেবার পর মাত্র হাতে গোনা দু-চারদিন মাত্র পরেছি, জুতো পুরনো হওয়ার সময় পেল কই? কিন্তু আমার কাছে এই যুক্তি বাতিল। কারণ আমার নতুন ও চকচকে জুতো চাই। যে জুতোর গন্ধে রাতে চোখে ঘুম আসবে না। কারণ নতুন জুতো কিনে মাথার কাছে রেখে আমি ঘুমোব। বাবা আমার জুতোর দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে বললেন, তোর জুতোর এই হাল হলো কী করে? আমি নিরীহ মুখ করে বললাম, পরতে পরতে। বাবা ভ্রু কুঞ্চিত করে বললেন, তোকে তো আমি বেশি জুতো পরতে দেখিনি! আমারও উত্তর সঙ্গে সঙ্গে, রোজ আমি জুতো পরে স্কুলে যাই তো, তাই। আমার রক্ষা যে, স্কুলে যাওয়ার সময় বাবা বাড়ি থাকেন না। আবার যখন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরি তখনও বাবা বাড়ি ফিরে আসেন না। জুতো যে বঁটি দিয়ে কেটেছি এটা বোঝা বা ধরতে পারা বাবার পক্ষেও কঠিন ছিল। কারণ জুতো কাটার পরে ভারী নোড়া দিয়ে তার ধারগুলো থেঁতো করেছি। ধূলির ভেতরে নিয়ে গিয়ে ধূলি মাখিয়েছি। কলসির ভাঙা চাড়ি দিয়ে ধারগুলো এবরোথেবরো করেছি। কাচের ধারালো প্রান্ত দিয়ে রঙ ঘষে ঘষে তুলেছি। কারও পক্ষে এরপর জুতোর প্রাচীনত্ব সম্পর্কে কোনোপ্রকারের দ্বিমত থাকবার কথাই নয়!

ফলে শেষমেশ জুতো একজোড়া কেনা হতো বটে কিন্তু সে জুতো যে ঈদের দিন পরব তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। তার জন্যে তো পরিবেশ লাগে। আমার স্মরণে প্রতিটি ঈদের আগের রাতে এইসব জিনিস কেনাকাটা নিয়ে ঝগড়া লাগত। সে ঝগড়া প্রথমে সামান্য জিনিসপত্র নিয়ে লাগলেও শেষ পর্যন্ত সে ঝগড়া ব্যক্তিগত পর্যায়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হতো এবং তার ফলে যা হবার ছিল তাই হতো। অর্থাৎ মারামারি, গালাগালি, হৈচৈ। আমরা বাড়ির ছেটে ছোট ছেলেমেয়েরা ঘুম থেকে উঠে চোখ জুলজুল করে সব তাকিয়ে দেখতাম। তারপর কাঁদতে থাকতাম। তারপর ঘুমিয়ে পড়তাম। ঈদের আগের রাতে ঝগড়া শুরু হলে সে ঝগড়া সাধারণত মাঝরাত পর্যন্ত চলত। তারপর ক্লান্ত হয়ে উভয় পার্টি ঘুমিয়ে পড়লে পরদিন ভোরেই আবার হৈচৈ করে উঠে পড়তে হতো। কারণ সকালে কালেকট্ররিয়েটের মাঠে যাবে সকলে নামাজ পড়তে। বাবাও যাবেন। সেমাই রান্না করতে হবে। নামাজে যাওয়ার আগে সকলে কাচাদুধে ভেজানো খোরমাখেজুর খেয়ে তবে মাঠে যাবে। আমিও তাদের সঙ্গে যাব। আমি মেয়ে তো কী! কালেকট্ররিয়েটের মাঠের বারান্দায় মেলা বসেছে সেই সকাল থেকে। আমার মতো ছেলেমেয়েরা সেখানে আনন্দ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি সেখানে যাব। সেখানে নতুন জুতো আর জামা পরে ঘুরঘুর করব। আমার চেহারা আর রংঢঙ দেখিয়ে মানুষের মাথা ঘুরিয়ে দেব! আমার বয়স দশ তো কী, আমারও ঈদ আছে!

এই ঈদটির কথা, এই রকম নিরানন্দ ঈদটির কথা আমি জীবনেও ভুলতে পারিনি! আবার নতুন জুতো পায়ে পরার গোপন গভীর আনন্দের কথাও নয়।

কিন্তু এবারের ঝগড়া এমন যে আমার আর ভোরে উঠে জুতো-জামা পরে কালেকটরির মাঠে যাওয়া হলো না। নতুন জুতো, নতুন জামা পরা হলো না। বাড়ির পরিবেশ এমন যে, মা গম্ভীর মুখে কিছু একটা রান্না করলেও সেখানে যাওয়ার উপায় নেই। মা এখন কাউকে সেখানে ঢুকতে দেবেন না। বড়মা রাগ করে পাশের বাড়িতে চলে গেছেন। সেখানে তাঁর নিজস্ব সংসার আছে। সেখানে তিনি রাতে ঘুমান। কিন্তু দুনিয়া উচ্ছন্নে যাক, নতুন কাপড় গায়ে উঠুক বা না উঠুক, আমাকে নতুন জুতো জোড়া পরতেই হবে।

তো সেবারের ঈদে ভোরবেলা ঘুম থেকে জেগে উঠে ঘরের ভেতরে চুপ করে বসে বসে অনেকক্ষণ ভাবলাম। আমার বড় বোন বিছানায় আরাম করে শুয়ে গল্পের বই পড়ছেন। ঈদের দিনে বাড়িতে ঝগড়াঝাঁটি তো বোন শুয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়বেন না তো কি করবেন। কিন্তু আমি দমে যাবার পাত্র নই। আমি আপনমনে গোসল সেরে, পুরনো জামাকাপড় পরে, নতুন পরতে সাহস হলো না কারণ তাতে যদি মা মনে করেন আমার মনে খুব ফূর্তি হয়েছে! তাই পুরনো জামা-কাপড় পরে, বসে বসে নতুন জুতোজোড়া পায়ে লাগালাম। খয়েরি রঙের চামড়ার জুতো। রঙে গ্লেজ দিচ্ছে। চামড়া থেকে নতুনের গন্ধ বেরোচ্ছে! এ মুহূর্তে আমার মতো সুখী আর কে?

জুতো জোড়া পায়ে পরে পরম আনন্দে ঘরের ভেতরে হাঁটতে লাগলাম! ঘরের একোণ থেকে ওকোণ। আবার ওকোণ থেকে একোণ। নতুন জুতোর মস্ মস্ শব্দ হতে লাগল ঘরময়। তারপর আস্তে করে উঠোনে বেরোলাম। জুতোর মসমসানি যতদূর সম্ভব লঘু করে হাঁটতে চেষ্টা করলাম। তখুনি মায়ের চোখের সামনে পড়ে গেলাম। কঠিন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে মা বলে উঠলেন, ঈদ করা হচ্ছে? হ্যাঁ, ঈদ? মায়ের কথা শুনে আমি লজ্জায় যেন মরে গেলাম। জুতো জোড়ার ওপরে রাগ হতে লাগল শব্দ করবার জন্যে। তাড়াতাড়ি ঘরে উঠে এলাম। তারপর জুতো পরে বিছনার ওপরে পা ঝুলিয়ে বসে থাকলাম। মাঝে মাঝে মুগ্ধ দৃষ্টিতে পা তুলে জুতোজোড়া তাকিয়ে দেখতে লাগলাম। এই ঈদটির কথা, এই রকম নিরানন্দ ঈদটির কথা আমি জীবনেও ভুলতে পারিনি! আবার নতুন জুতো পায়ে পরার গোপন গভীর আনন্দের কথাও নয়।

একদিন স্কুলের হলঘর হাঁটতে বেড়াবার সময় একজন রাজমিস্ত্রির একটি ডালা ভাঙা স্যুটকেস চোখে পড়ল। কৌতূহলী হয়ে সেই স্যুটকেসের ডালা সরাতেই আমি একটি পাতা ছেঁড়া হলুদ চেহারার বই চোখে দেখলাম। ত্বরিতে বইটি সেখান থেকে সরিয়ে আমি পড়ে দেখতে লাগলাম। প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠা নেই কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না। অপুর কঞ্চি নিয়ে খেলাটা পড়েই আমার ভেতরে কেমন যেন একটা মোহের সৃষ্টি হলো। একটি রোমান্টিক মোহ। অবোধ বালিকা আমি।

পাঁচ.

বাবা তার উত্তরাধিকার সূত্রে যে মস্তবড় বাগানবাড়িটা পেলেন, যার পশ্চিমপ্রান্তে অর্থাৎ বড় রাস্তার ধারে ছিল একটি স্কুলঘর। রোজ সকালে সেখানে একটা প্রাইমারি স্কুল বসত। যে স্কুলটি ছিল আমার দাদার সময়ে প্রতিষ্ঠিত। ভেতরের দিকে দু-তিনটি ঘরে আমরা থাকতাম। সেই বাড়িটিতে ছিল অনেক গাছগাছালি। কাঁঠাল, নারকেল, সজিনা, পেয়ারা, করমচা গাছে ভর্তি। তবে আমগাছ ছিল না, এটুকু মনে আছে। আমার জন্যে তাই সই। আমি মেয়েমানুষ হলেও গাছগাছালি আমার প্রিয় ছিল।

কিন্তু আমার বাবার ইচ্ছ হলো তিনি এই জমিতে দোতলা দালান তুলবেন। আর তার জন্যে আমাদের বাড়ির সামনের স্কুলঘরটি ভাঙতে হবে। এই স্কুল আবার আমার দাদা ও বাবা-চাচাদের সাহায্যে চলত। বিনা ভাড়ায় স্কুলটিকে দাদার বাগানবাড়ির সমুখের জমিতে এটাকে স্থাপন করা হয়েছিল সেই কবে, আমি জানিনে। সেই স্কুলকে এখন উঠে যেতে হবে। এই স্কুলে আমি ক্লাস ওয়ান পর্যন্ত পড়েছিলাম। তারপর এমএসটিপি স্কুলে ভর্তি হয়ে যাই। স্কুলটি ছিল মাত্রই একটি বড় হলঘর। বড় মানে বেশ বড়। স্কুল ছুটি হলে এই হলঘরে আমরা বাচ্চারা বসে খেলতাম। তবে ঘরটি ছোট হলেও তার পাশে খেলামেলা বাগান ছিল। টিফিনের সময় বাচ্চারা পেছনের বাগানে গিয়ে খেলত। আমিও কতদিন ঐ স্কুলে পড়ার সময় আমার বন্ধু ভোলার সঙ্গে খেলেছি। তারপর এতদিন বাদে বাবা বললেন, স্কুলটিকে সরে যেতে হবে।

কোথায় সরবে? তখন আমার বড়বাবা চুড়িপট্টির বাজারের কাছে তাঁর নিজের ছোট্ট একটি জায়গা পড়ে ছিল। সেখানে স্কুলটিকে সরিয়ে নিতে বললেন।

আমি ছোট হলেও আমার মোটেই ইচ্ছে ছিল না যে, বাবা বসতবাড়িটা ভেঙে আবার বড় একটা দোতলা বাড়ি করেন। কিন্তু বাবার বড় বাড়ি দরকার। তাঁর এতগুলো ছেলেমেয়ে, বড় হলে থাকবে কোথায়?  তাছাড়া আমার মায়েরও খুব ইচ্ছে দোতলা একটা বাড়ি করা হোক। তো শুরু হলো দোতলা বাড়ি করা। আমি এই বাগানবাড়িতে এসে পেয়ারা গাছের ডালে হেলান দিয়ে বসে দুপা মাটিতে ঝুলিয়ে আপনমনে গল্পের বই পড়তাম। একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে দেখি সেই পেয়ারা গাছ গায়েব। তাকে কেটে ফেলা হয়েছে। সেই প্রথম আমার ছেলেবেলার একটি স্বপ্ন চোখের সামনে ধ্যুলিস্যাৎ হতে দেখলাম। সেই গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে আমি কি শুধু বই পড়তাম? না, সেই ডালে বসে আমি রূপকথার রাজ্যে যেন ভেসে বেড়াতাম। আমার কল্পনার দোসর ছিল সেই বেঁটেখাটো পাতা ছড়ানো পেয়ারাগাছটি। যে গাছে প্রচুর ছোট ছোট পেয়ারা হতো। যার ভেতরটা ছিল টুকটুকে লাল। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে অনেক কান্নাকাটি করলাম। কিন্তু কিছুই হলো না। আরও একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে দেখি আমাদের উঠোনের প্রান্তে সেই বিশাল কাঁঠালগাছটি আর নেই।

আমাদের বাবা তখুনি গাছগুলো কাটতেন যখন আমরা কেউ বাড়ি থাকতাম না বা স্কুলে চলে যেতাম। তো যাহোক বাড়ি বানানো চলতে লাগল। বিশাল গভীর ভিত খোঁড়া হলো বাড়ির। স্কুলঘরটা ব্যবহৃত হতে লাগল শহরের বাইরে থেকে আসা রাজমিস্ত্রিদের জন্য। তারা সারাদিনরাত কাজ করত। সবচেয়ে ঝামেলার কথা আমরাও ঐ বাড়ির ভেতরেই বসবাস করতাম। আমরাইবা যাবো কোথায়? আমি মাঝে মাঝে মিস্ত্রিদের কাজ করা দেখতাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে তাদের কাজ করা দেখতাম। আমার কেন জানি দেখতে ভালো লাগত। আবার সুযোগ হলেই মিস্ত্রিরা যে হলঘরে থাকত, সেখানে দিনের বেলা কেউ থাকত না। সকলেই কাজে থাকত। আমি সেই হলঘরে ঢুকে খুঁজে দেখতাম কোথাও নতুন কোনো জিনিস চোখে পড়ে কি না। এরকম একটি ব্যবহারের প্রশংসা করা যায় না জানি, তবু আমার জীবনের একঘেয়েমি কাটাবার জন্যে এইসব খুব উপকারে দিত!

এমনি একদিন স্কুলের হলঘর হাঁটতে বেড়াবার সময় একজন রাজমিস্ত্রির একটি ডালা ভাঙা স্যুটকেস চোখে পড়ল। কৌতূহলী হয়ে সেই স্যুটকেসের ডালা সরাতেই আমি একটি পাতা ছেঁড়া হলুদ চেহারার বই চোখে দেখলাম। ত্বরিতে বইটি সেখান থেকে সরিয়ে আমি পড়ে দেখতে লাগলাম। প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠা নেই কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না। অপুর কঞ্চি নিয়ে খেলাটা পড়েই আমার ভেতরে কেমন যেন একটা মোহের সৃষ্টি হলো। একটি রোমান্টিক মোহ। অবোধ বালিকা আমি। একটি বিঘূর্ণীত পরিবেশে আবোলতাবোল হয়ে বেড়ে ওঠা বালিকা আমি। রাতের বেলা ঘুম লাগলে বালিশ কাঁধে নিয়ে বেড়াতে হয় কোথায় একটু ঘুমোনোর জায়গা পাওয়া যায় এই ভেবে। তার ওপর বাড়িভর্তি মিস্ত্রি, ছোট ছোট ভাইবোন, দুই মা, রাগী বাবা, দুষ্টু নয়ন, এইসব দূরে চলে গিয়ে আমার ভেতরে এমন একটি বোধের সঞ্চয় হলো, যা ভাষায় প্রকাশ করতে গেলে তাকে হেয় করা হবে। এ যেন পাথর ছুঁয়ে কে আমাকে সোনা করে দিল!

মনে আছে, পরে রাজমিস্ত্রির অনুমতিতে পুরো বইটি পড়লাম। একদিনে নয়, ধীরে ধীরে। বইয়ের প্রথম কয়েকটি পাতা মিসিং হলেও অপু দুর্গার সঙ্গে সখ্য জমাতে আমার দেরি হলো না। একটা ঘোরের ভেতরে আমি বইটি সঙ্গে নিয়ে যেন সমস্ত বাড়ি ঘুরতে লাগলাম। সমস্ত বাড়িই তখন মাটি খুঁড়ে মুখব্যাদান করে পড়ে আছে। সেখানে কোনো হাঁটার জায়গা যেন নেই। তবু তার ভেতরেই রান্না খাওয়া, কাপড় কাচা, স্কুলে যাওয়া, স্কুল থেকে বাড়ি ফেরা, মিস্ত্রিদের হৈচৈ, তাদের নিজেদের রান্নাখাওয়া, কাদায় পানিতে বাড়ি সয়লাব, আর আমার হাতে সেই বাঁশবাগান, সেই তেপান্তরের মাঠ,  সেই কড়ির মালা চুরি, দূর্গা ও অপুর রেলগাড়ি দেখতে যাওয়া, ঝড়বৃষ্টির সময় সর্বজয়ার লুকিয়ে গাছের তলা থেকে প্রতিবেশির একটি ফল কুড়িয়ে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া। পল্লির সেই অসহায় ভেজা বিষণœ দারিদ্র যেন আমার মনের পরতে পরতে কীরকমের একটি সর্বগ্রাসী মমতার জন্ম দিয়ে চলল।

তারপর দুর্গার মৃত্যু। এ যেন একেবারে গ্রহণযোগ্য নয়। রাতে বালিশে চোখ ভিজিয়ে ফেলা। এই বই পড়তে পড়তে যেন আমি রাতারাতি ভীষণভাবে পরিপক্ক হয়ে উঠলাম। শরীরে নয়, মনে।

ছয়.

স্কুলের মাইনে জমা পড়া ছিল আমাদের স্কুল জীবনের দুর্ভাগ্যের ঘটনা।

এই স্মৃতি এখনও আমাকে মাঝে মাঝে বিত্রস্ত করে তোলে, বিশেষ করে একজন স্পর্শকাতর বালিকার জীবনে।

মাসের পর মাসে চলে যেত আমাদের ভাইবেবানদের কারও স্কুলের ফিস জমা দেওয়া হতো না। ক্লাসে মাঝে মাঝে দিদিমনিরা এই নিয়ে কথা বলতেন। না বলে তাদেরও তো উপায় ছিল না। একটু বড় হলে পরে আমি লজ্জায় যেন স্কুলের দিদিমনিদের চোখের সামনে মাথা তুলতে পারতাম না। মনে হতো বুঝি বিনা পারিশ্রমিকেই দিদিমনিদের জ্ঞানভাণ্ডার আমি লুট করে নিচ্ছি! আমরা তখন স্কুলের মহিলা শিক্ষকদের দিদিমনি বলে সম্বোধন করতাম। এমন নয় যে, আমার বাবার টাকা ছিল না। শুধু বাবার মন ছিল না যে, মনে করে সঠিক সময়ে স্কুলের মাইনেটা দিয়ে দেবেন। আমার ভায়েরা পড়ত সম্মিলনী স্কুলে আর আমরা পড়তাম এমএসটিপি গার্লস্ হাইস্কুলে। স্কুল দুটি ছিল প্রাইভেট। ছাত্রছাত্রীদের মাইনায় স্কুল চলত এবং শিক্ষকদের বেতন হতো। আমি যখন ক্লাস ওয়ানে পড়ি তখন যেমন বাবা স্কুলের মাইনে দেরি করে দিতেন, তারপর আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি সেই একই স্কুলে তখনও বাবা মাইনে দেরি করে দিতেন।

যখন মাইনে দিতেন তখন এত টাকা দিতে হতো যে, বাবা বরাবর আফসোস করে বলতেন যে, সামনের বছর থেকে কোনো মেয়েকে আর পড়াবেন না। শুধু শুধু এতগুলো করে কাচা টাকার অপচয় যেন বাবার মনে বড় আঘাত দিত। আর এত যে কষ্ট করে পড়াচ্ছেন, তারই বা রেজাল্ট কি? সবই তো ফক্কিকার! না, মেয়ে বিয়ে দিয়ে পরের ঘরে পাঠিয়ে দাও। সেখানে সে করবেটা কি? সারা জীবনভর তো চুলোতেই কাঠ ঠেলবে!

আমার সব বোনেরাও ঐ একই স্কুলে পড়ে বড় হয়েছে। আমার মনে পড়ে, আমার ছোট বোন শিলু যখন ক্লাস ফোর বা ফাইভে পড়ে তখন আমি ক্লাস নাইনে বা টেনে পড়ি। একদিন আমার বোন শিলু স্কুলে গিয়ে তার ক্লাসে বসতেই কোনো একজন দিদিমনি শিলুকে রাগ করে বললেন, তুমি ঠিকমতো স্কুলের মাইনে দিতে পারো না কেন? তোমার বাবাকে বলবে যেন ঠিক সময়ে স্কুলের বেতনটা দিয়ে দেন। এই কথা শুনে আমার ছোটবোন শিলু অপমানিত বোধ করে কাঁদতে কাঁদতে স্কুল ছেড়ে বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলো এবং মায়ের কাছে গিয়ে সবকথা বলল। মায়ের তখন রাগ হলো আমার ওপরে। মা একটি হাতচিঠি লিখে তৎক্ষণাৎ শিলুকে আমার কাছে পাঠালেন। আমি তখন ক্লাসের ফাঁকে বন্ধুদের সঙ্গে স্কুলের ছাদে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। শিলু আমার কাছে হাতচিঠি নিয়ে উপস্থিত হলো। আমি তো শিলুকে দেখে অবাক। কারণ ছোট ক্লাসের মেয়েরা কখনো দোতলায় উঠত না। তাদের ক্লাস হতো নিচের তলায়। আমি ঘাবড়ে গিয়ে শিলুর কাছ থেকে সেই চিঠি নিয়ে খুলে দেখি মা লিখেছেন,

মঞ্জু, বিশেষ বিরক্ত হইয়া এই চিঠি লিখিলাম। তোমার ছোট বোন শিলু, স্কুলের মাইনা ঠিকসময়ে দিতে না পারায় ক্লাসের দিদিমনির বকা খাইয়া কাঁদিতে কাঁদিতে বাড়ি ফিরিয়া আসিয়াছে। আর তুমি উপরের ক্লাসে বসিয়া তাহার কোনো খবরই রাখো না! তোমার ভাব দেখিয়া আজকাল মনে হয় তুমি বুঝি চিরদিন এমনই বড় ছিলে। তোমার ছোটবোনের অপমান তোমার গায়ে লাগে না। যাই হোক শিলুকে আবার ক্লাসে ফিরাইয়া লইয়া যাইবে এবং তাহাকে ক্লাসে ঠিকমতো বসাইয়া আসিবে।

ইতি তোমার মা।

মায়ের এই করুণ চিঠি, ক্ষোভ করে লেখা চিঠি এখনও আমার কাছে রয়ে গেছে। এত যে টালমাটাল অবস্থার ভেতর দিয়ে জীবনের পথ চলা, এত যে দেশ-বিদেশ, এত যে সাংসারিক তুলকালামÑতার ভেতরেও এই চিঠিখানি আমার পুরনো কাগজের পোঁটলার ভেতরে বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে। বস্তুত এই চিঠি হঠাৎ হাতে এসে পড়ায় আমার অতীত যেন করুণ সুরে আবারো কথা বলে উঠল।

তারপরও বলব স্কুল জীবন ছিল আমার সবচেয়ে সুখের জীবন। সকাল এগারোটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত  স্কুল চললেও আমার কেন জানি মনে হতো আরও কিছুক্ষণ স্কুল চললেও আমার আপত্তি হবে না। এমনকি স্কুলের দাই বিন্দুদিদি বা দাশুর মার সঙ্গে বাকি সময়টা কাটিয়ে দিতে পারলেও আমার কোনো কষ্ট হতো না। এখন ভাবলে মনে হয়, বাড়ির পরিবেশ থেকে যতক্ষণ আমি পালিয়ে থাকতে পারতাম ততক্ষণই যেন আমার ভালো লাগত, নিরাপদ মনে হতো। এখন পেছনের দিকে তাকিয়ে মনে হয় কত ভীষণ একটি নেতিবাচক মনোভাব ছিল আমার নিজের ছেলেবেলার পরিবেশ সম্বোন্ধে।

কোনো গহীন অন্ধকারের ভেতরে আমি বড় বিশ্বাসের সঙ্গে পথ হাতড়ে চলেছি। মনে হতো, আমার জন্যে নিশ্চয় ভালো কোনো কিছু কোথাও অপেক্ষা করছে। কারণ মানুষের জীবন এত নিরানন্দ হতে পারে না! এখন মনে হয় এসবই ছিল আমার উইশফুল থিংকিং।

একটু আগে স্কুলের ছাদের কথা বললাম। এই ছাদটি ছিল আমাদের ক্লাসরুমগুলোর লাগোয়। এল প্যাটার্নের ছিল দোতলাটি। আমাদের ক্লাসরুমের সামনে থেকেই শুরু হয়েছিল সেই ছাদ। কোনো সিমেন্ট যেন ছিল না সেই ছাদে। শুধু যেন চুন-সুরকির ঢালাই করা ছিল। আমাদের রুমের বাইরে থেকে ছাদটা শুরু হয়ে লম্বালম্বি টানা বারান্দার মতো অনেকদূর গিয়ে তারপর হাতের ডানদিকে ঘুরে গিয়েছিল ছাদটা। হাতের ডানদিকে ঘুরে যাওয়ার জায়গাটা ছিল বেশ প্রাইভেট। আমরা বন্ধুরা দলবেঁধে সেখানেই বসে আড্ডা দিতাম টিফিনের সময় বা কোনো ক্লাস যদি হঠাৎ করে বাতিল হয়ে যেত সে সময়। আমি, দিলরওশন, বেলা, সুলতা, বিনু, রোকেয়া, অর্চনা আমরা সকলে মিলে জমজমাট আড্ডা দিতাম। কোনোদিন আমাদের ভেতরে কেউ হয়তো যেমন বেলা বলে উঠত, এই, আমি কিছুতেই এখন হাসব না। মা কালির দিব্যি, কিছুতেই না। আমাকে কেউ হাসাতে পারবে না! একথা শুনে আমাদের ভেতরে দিলরওশন হয়তো বলে উঠত, তোকে হাসাতে আমার একসেকেন্ডও লাগবে না! আর তার কথা শুনে বেলা বলে উঠত, ইস্, কত তোর শক্তি একবার দেখি! এরপর দিলরওশন অদ্ভুত সব কথা বলে চলত বেলাকে হাসাবার জন্যে। বেলা অবশ্যই হাসতো না কিন্তু আমরা শুনে হাসতে হাসতে পেটে খিল লেগে যেত। আর আমাদের পেটে খিল লাগা দেখে বেলা হঠাৎ ফ্যাং করে মুখের শব্দ করে উঠত। আমরা সেটাকেই হাসি ধরে নিয়ে তাকে আরও হাসাতে চেষ্টা করতাম। একসময় বেলাও হাল ছেড়ে দিয়ে হিহি করে উঠত। নির্বোধ বালিকা বেলার এইসব নির্বোধ জলসা কত যে আমাদের প্রাণশক্তি বাড়িয়ে তুলত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

তো এইসব ঘটনার নেপথ্যে লুকিয়ে থাকত স্কুলের মাইনে ঠিক সময়ে পরিশোধ না করার এক করুণ সামাজিক ইতিহাস। শুধু মাত্র বাবার খাম-খেয়ালিপনার জন্যে। মোটেই হিসাবী ছিলেন না বাবা। হাতে টাকা-পয়সা এলেই তিনি বেহিসাবী খরচ করতেন। দরকারী  কাজগুলোর দাবি পূরণ না করেই তিনি বাজার থেকে প্রচুর পরিমাণে খাবার-দাবার কিনে আনতেন। মনে হয় চোখে যা দেখতে, ভালো লাগত, তাই কিনে আনতেন। মিতব্যয়ীতা বাবার ভেতরে যেন ছিল না। ফলে যা হবার তাই হতো। শৃঙ্খলার সঙ্গে কোনোকিছুর যেন সুরাহা করা যেত না।

তবে এসব ডামাডোলের ভেতরেও মাঝে মাঝে বাবাকে খুশি হতে দেখতাম। বাবাকে খুশি দেখলে আমরা খুব খুশি হয়ে উঠতাম। গ্রীষ্মের রাতে তারাভরা আকাশের নিচে ছাদের ওপরে উঠে বাবা হাওয়া খেতেন। আমরা বাবার সঙ্গে থাকতাম। মা ছাদে পাটি বিছিয়ে দিতেন। চাল-মুড়ি ভেজে ঝালমশলা দিয়ে মাখিয়ে ছাদে টেনে এনে আমাদের ছোট ছোট বাটিতে করে খেতে দিতেন। মা নিজেও চালভাজা, মুড়িভাজা খেতে খুব পছন্দ করতেন। বাবা আপনমনে গান করতেন। তখনকার দিনের সিনেমার সব হিন্দি গান। আমি হা করে তারাভরা আকাশের দিকে চেয়ে থাকতাম। ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠার অপূর্ব একটি আনন্দে আমার মন ছলছল করে উঠত। তখন পর্যন্ত ভাবিনি যে, মানুষের জীবনের সবকিছু একটি চলমান ছায়া ছাড়া আর কিছু নয়।

আমার নিজের ভবিষ্যৎ আমি নিজে তখনও জানতাম না। কিন্তু এটুকু আমার মনে হতো যেন কোনো গহীন অন্ধকারের ভেতরে আমি বড় বিশ্বাসের সঙ্গে পথ হাতড়ে চলেছি। মনে হতো, আমার জন্যে নিশ্চয় ভালো কোনো কিছু কোথাও অপেক্ষা করছে। কারণ মানুষের জীবন এত নিরানন্দ হতে পারে না! এখন মনে হয় এসবই ছিল আমার উইশফুল থিংকিং। কারণ, নিরানন্দ পরিবেশের ভেতরে আশায় উজ্জীবিত হয়ে পথ চলতে গেলে মানুষকে কোথাও না কোথাও একটি কল্পনার রাজ্য খুঁড়ে তুলতে হয়।


 

আনোয়ারা সৈয়দ হক

১৯৪০ সালের ৫ নভেম্বর যশোর জেলার চুড়িপট্টি গ্রামে এক মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা গোলাম রফিকউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন একজন ব্যবসায়ী ও মা আছিয়া খাতুন একজন গৃহিণী। তার বাবা খুবই ধার্মিক মানুষ ছিলেন। তাকে ছোটবেলায় কঠিন পর্দা ও অন্যান্য ইসলামী শরিয়ত মেনে চলতে হতো। তার শৈশব ও কৈশোর কাটে যশোরে।

তার পাঠদানের হাতেখড়ি হয় মায়ের কাছে। চুড়িপট্টির মোহনগঞ্জ প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। মধুসূদন তারাপ্রসন্ন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক ও ১৯৫৮ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত স্কুল ও কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। কলেজ গ্রন্থাগারে প্রচুর বই থাকলেও তিনি তা অধ্যয়নের সুযোগ পান নি। সে সময়ে শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবই পড়ারই সুযোগ পেত। তাই মাঝে মাঝে উপন্যাস, ম্যাগাজিন ও অন্যান্য সাহিত্য পেলে তারা নিজেদের ধন্য মনে করত। ১৯৫৯ সালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। তিনি ইংরেজি সাহিত্যে পড়তে চাইলেও তার বাবার আগ্রহে তাকে মেডিকেলে ভর্তি হতে হয়। ১৯৬৫ সালে তিনি এমবিবিএস পাস করেন। পরে ১৯৭৩ সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য লন্ডনে যান। তিনি সেখান থেকে ১৯৮২ সালে মনোবিজ্ঞানে এমআরসি ডিগ্রী লাভ করে দেশে ফিরে আসেন।

এমবিবিএস পাস করার পর তিনি তৎকালীন পাকিস্তান বিমান বাহিনী মেডিকেল কোরে লেফটেন্যান্ট পদে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালে মক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সম্পূর্ন নয় মাস তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। ঢাকা এয়ারবেসের মেডিক্যাল সেন্টারে তিনি চিকিৎসা করেছেন সৈনিকদের এবং তাদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের। ১৯৭৩ সালে তিনি বিমানবাহিনীর চাকরি থেকে ইস্তেফা দিয়ে লন্ডন চলে যান এবং সেখানে কয়েকটি হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। লন্ডন থেকে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে দেশে এসে ১৯৮৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে মনোরোগ বিভাগে সহকারী প্রভাষক হিসাবে যোগ দেন। ১৯৮৯ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৯৩ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন ঢাকার মানসিক স্বাস্থ ইন্সটিটিউটের পরিচালক ও প্রভাষক। ১৯৯৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে অবসর নেন। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্য ও স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন হাসপাতালে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সাল থেকে তিনি ঢাকার বারডেম হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের প্রভাষক ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত আছেন।

তার প্রথম ছোটগল্প পরিবর্তন ১৯৫৪ সালে দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত হয়। ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তিনি নিয়মিত দৈনিক ইত্তেফাকের কচি কাঁচার আসরে লিখতেন। মাইকেল মধুসূদন কলেজে পড়াকালীন দৈনিক আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী ও গুলিস্তা পত্রিকায় তার লেখা গল্প, কবিতা প্রকাশিত হতো। গুলিস্তা পত্রিকায় লিখে তিনি পুরষ্কৃতও হয়েছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াকালীন লেখালেখির পাশাপাশি তিনি কলেজের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িয়ে পড়েন। এই সময়ে ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম শ্রেণীর পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন মেডিকেল জার্নালে তার লেখা ছাপা হতো। তার প্রথম উপন্যাস ১৯৬৮ সালে সচিত্র সন্ধানীতে প্রকাশিত হয়। তার সেই প্রেম সেই সময় ও বাজিকর উপন্যাসে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা বর্ণিত হয়েছে। নরক ও ফুলের কাহিনী উপন্যাসে লিখেছেন তার ছেলেবেলার কথা। বাড়ি ও বণিতা উপন্যাসে চিত্রায়িত হয়েছে মধ্যবিত্ত পরিবারের সামাজিক সমস্যা। উপন্যাস ছাড়া তিনি শিশুদের জন্য সাহিত্য রচনা করেছেন। ১৯৭৭ সালে ছানার নানার বাড়ি, বাবার সাথে ছানা (১৯৮৬), ছানা এবং মুক্তিযুদ্ধ (১৯৮৭), ১৯৯০ সালে তৃপ্তি, আবেদ হোসেনের জোৎস্না দেখা, ১৯৯২ সালে হাতছানি, আগুনের চমক এবং মুক্তিযোদ্ধার মা নামক শিশুতোষ গল্প ও উপন্যাসগুলি প্রকাশিত হয়।

তিনি ১৯৬২-৬৩ সালের দিকে সৈয়দ শামসুল হকের অনুপম দিন, শীত বিকেল, সম্রাটের ছবি, এক মহিলার ছবি, দেয়ালের দেশ পড়ে তার সাথে দেখা করার চেষ্টা করেন। তিন পয়সার জোসনা গল্পটি পড়ার পর তিনি সৈয়দ হককে চিঠি লিখেন। সৈয়দ হক এক মাস পর সেই চিঠির জবাব দেন। এরপর প্রতিনিয়তই তারা চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ করতে থাকেন। একদিন সৈয়দ হক তাকে ঢাকার গুলিস্তান সিনেমা হলের চিন-চাও রেস্তোরায় দেখা করতে বলেন। প্রথম সাক্ষাতে সৈয়দ হক তাকে উদ্দেশ্য করে একটি কবিতা লিখেন। তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তখন তারা ব্রিটিশ কাউন্সিলসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন। ১৯৬৫ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি সৈয়দ হকের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সৈয়দ হক ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ফুসফুসের কর্কটরোগ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এই দম্পতির দুই সন্তান। মেয়ে বিদিতা সৈয়দ হক একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষক। ছেলে দ্বিতীয় সৈয়দ হক একজন আইটি বিশেষজ্ঞ, গল্পকার ও গীতিকার। তিনি যুক্তরাজ্যের রিচমন্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টারন্যাশনাল ফিনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে এমবিএ পাস করেন।

ছোটগল্প
• পরিবর্তন (১৯৫৪)
• পারুলীর উড্ডয়ন
• হেলাল যাচ্চিল রেশমার সাথে দেখা করতে
• গলে যাচ্ছে ঝুলন্ত পদক
• অন্ধকারে যে দরোজা
• মানসিক সমস্যার গল্প
• শূন্যতার সাথে নৃত্য
• গুজরিপঞ্জম
• গ্রাম গঞ্জের গভীরে
• পূর্ণিমায় নখের আঁচড়
• সূর্য ওঠার গল্প

উপন্যাস

• তৃষিতা (১৯৭৬)
• সোনার হরিণ (১৯৮৩)
• সেই প্রেম সেই সময়
• বাজিকর
• জলনুড়ি
• তারাবাজি
• হাতছানি
• উদয় মিনাকে চায়
• অস্থিরতার কাল, ভালোবাসার সময়
• ভালোবাসার লাল পিঁপড়ে
• নরক ও ফুলের কাহিনী
• বাড়ি ও বনিতা
• গা শিরশির (২০১১)
• কার্নিশে ঝুলন্ত গোলাপ
• সেই ভাষণটি শোনার পর
• নিঃশব্দতার ভাঙচুর
• তাম্রচূড়ের লড়াই
• সেইসব দিন
• যোজন দূরের স্বজনেরা
• ঘুম
• খাদ
• আহত জীবন
• আকাশ ভরা
• দুই রমণী
• নারী : বিদ্রোহী
• সবুজ পশমি চাদর
• ব্যবহ্নতা
• আয়নার বন্দী
• নখ
• সন্দেহ
• ঘুমন্ত খেলোয়াড়
• রূপালী স্রোত
• চেমনআরার বাড়ি

কাব্যগ্রন্থ

• কিছু কি পুড়ে যাচ্ছে কোথাও
• তুমি আগে যাবে, না আমি
• স্বপ্নের ভেতর
• তুমি এক অলৌকিক বাড়িঅলা
• কাল খুব কষ্টে ছিলাম
• আমার শয্যায় এক বালিশ-সতীন

প্রবন্ধ
• নারীর কিছু কথা আছে
• কিশোর-কিশোরীর মন ও তার সমস্যা
• যেমন আমাদের জীবন
• ক্ষুব্ধ সংলাপ (২০১১)
• মেয়ে হয়েছি বেশ করেছি (২০১২)
• তোমার কথা
• পিকাসোর নারীরা

শিশুসাহিত্য
• ছানার নানার বাড়ি (১৯৭৭)
• বাবার সাথে ছানা (১৯৮৬)
• ছানা এবং মুক্তিযুদ্ধ (১৯৮৭)
• পথের মানুষ ছানা
• একজন মুক্তিযোদ্ধার ছেলে
• আমাদের মুক্তিযোদ্ধা দাদাভাই
• মন্টির বাবা
• তোমাদের জন্য এগারোটি
• উল্টো পায়ের ভূত
• আমি ম্যাও ভয় পাই
• আমি বাবাকে ভালোবাসি
• হানাদার বাহিনী জব্দ
• মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ছড়া
• ছোটখেলের বীর
• যেমন আমাদের জীবন
• সর্পরাজের যাদু
• আমার মা সবচেয়ে ভালো (২০০৮)
• তুমি এখন বড় হচ্ছো
• টুটুলের মা-গাছ
• উদাসী বালক
• তপনের মুক্তিযুদ্ধ
• কাঠের পা
• আগুনের চমক
• দশ রঙের ছড়া
• মুক্তিযুদ্ধের পাঁচটি উপন্যাস

অনুবাদ

• ল্যু সালোমে : সাহিত্যভুবনের অগ্নিশিখা (২০১২)

স্মৃতিকথা

• অবরুদ্ধ

ভ্রমণকাহিনী

• উড়ে যাই দূরে যাই

পুরস্কার ও সম্মাননা

• ভাষা ও সাহিত্যে একুশে পদক-২০১৯
• উপন্যাস শাখায় নৃ প্রকাশনী থেকে ছানা ও নানুজান-এর জন্য পাঞ্জেরী ছোটকাকু আনন্দ আলো শিশুসাহিত্য পুরস্কার-২০১৯
• উপন্যাসে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০১০
• কবীর চৌধুরী শিশুসাহিত্য পুরস্কার-২০০৭
• ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০০৬
• অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার
• মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার
• শিশু একাডেমি পুরস্কার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *