আমার বাবা আমার যিশু-০৭

124 Views

Spread the love

বিয়ের সময় ঝুড়ির ভেতরে কনের জন্যে লাল টুকটুকে চেলির কাপড় আসতো, গায়ের নতুন ব্লাউজ আসতো, মাথার চুলের জন্যে তেল মশলা আসতো। বিয়েতে মাথার চুল বাঁধাটা ছিল ভীষণ মুন্সিয়ানি একটি কাজ। পাড়ার যে সে মহিলা এই চুল বাঁধতে পারতো না। বিয়ের দিন কনের মাথার চুল ভালো করে সাবান দিয়ে ধুয়ে শুকিয়ে তারপর নানারকমের সুগন্ধি বাঁটা মশলা চুলের পরতে পরতে বিছিয়ে অসংখ্য বিনুনি করে তবে চুল বাঁধা হতো। সেই চুলের খোঁপা করা হতো। চাট্টিখানি কথা ছিল না। সেই খোঁপা যখন বাঁধা হতো তখন চারপাশ সুগন্ধি মশলার গন্ধে বাতাস ভুরভুর করে উঠতো।

 


এগারো


 

আমি যত বড় হয়ে উঠতে লাগলাম বাড়িতে আমাকে নিয়ে অশান্তি শুরু হতে লাগলো। প্রথম কথা, বাবা আমাকে বিয়ে দিয়ে দিতে চান। কারণ আমি আমার বয়সের চেয়েও দ্রুত যেন বড় হয়ে উঠছি। সালোয়ার কামিজ ছেড়ে ছোটবেলা থেকেই আমি শাড়ি পরতে শুরু করেছি। তাতে করে আমাকে আরও বড়সড় বলে মনে হচ্ছে। আমার বয়সী সব মেয়েদের একে একে বিয়ে হয়ে গিয়েছে।

 

চারপাশ থেকে এখন আমার বিয়ের প্রস্তাব আসছে। সব আত্মীয়দের প্রস্তাব।
আমার বাবা পারেন তো কালকেই বিয়ে দিয়ে দেন।
কিন্তু আমার মা বলছেন, অসম্ভব। আমার বড় মেয়েকে ম্যাট্রিকের আগেই বিয়ে দিয়েছি, মেজ মেয়েটিকে আমি এত আগে বিয়ে দেবো না। বিএ পাশ না করিয়ে বিয়ে দেবো না।
বাবা রেগে গিয়ে বললেন, এত বড় কথা। আমার মেয়েকে আমি যখন ইচ্ছে বিয়ে দেবো, তুমি বাধা দেবার কে?
আর মা বললেন, মেয়ে আমারও। আমার মেয়েকে আমি বিএ পাশ না করিয়ে বিয়ে দেবো না।
বাবা চোখ গরম করে তাকিয়ে বললেন, দেবে না?
মা বললেন, না!

 

আর যাকে নিয়ে এত বাক-বিতণ্ডা, অর্থাৎ আমি, আমি তখন অরণ্য রহস্যের পাতা খুলে চোখের সামনে মেলে ধরে পড়ছি! বাবা-মায়ের এরকম ঝগড়ার সঙ্গে আমার নিত্যদিনই পরিচয় হতো। হতে হতে আমার মনে হতো, তারা ঝগড়া করতে থাকুক। আমাকে বিয়ে দিতে আয়োজন করলেই তো বাড়ি ছেড়ে পালাবো, তখন দেখা যাবে!

 

বাবার যেমন জেদ ছিল, আমার মায়েরও তেমনি জেদ ছিল। বকুনি খেলে, মার খেলে, বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবার ভয় দেখালেও মা ছিলেন আমার ব্যাপারে অনড়।
কেন?
তার উত্তর আমার জানা নেই।

তবে বাড়িতে কেউ না থাকলে বা মাঝে মাঝে গভীর রাতে বাড়ির সকলে যখন ঘুমিয়ে পড়েছে এবং বাবা বাড়ির বাইরে তখন আমি বসে বসে মায়ের কাছে আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলতাম। বলতাম, আমি কত বড় লেখক হবো। কত লেখাপড়া করবো। আমি ইংরেজি সাহিত্য পড়বো, টক টক করে ইংরেজিতে কথা বলবো। কিন্তু আমি সাহিত্য করবো বাংলায়।
আমার মা যেন কিছুটা কৌতুকে কিছুটা বিস্ময়ে আমার কথা মন দিয়ে শুনতেন। কথা বলতাম আমি খুব দ্রুততার সাথে। যেহেতু অল্প সময়ের ভেতরে আমাকে অনেক কথা বলে সারতে হবে। কারণ যে—কোনো মুহূর্তে বাবা বাড়িতে এসে হাজির হতে পারেন।

মাকে আমি দেশ-বিদেশের কথা বলতাম। তাঁকে আমি বিদেশে নিয়ে যাবো বলতাম। তিনি আর আমি পাহাড় ও সমুদ্র দেখবো বলতাম। আফ্রিকার জঙ্গলে তাঁকে আমি নিয়ে যাবো বলতাম। কতো কিছু যে বলতাম তার কোনো ঠিকঠিকানা ছিল না!
আর সেই জন্যে কী—না জানি না, মা সবসময় বাবাকে বলতেন , আমাকে বিএ পাশ না করিয়ে তিনি বিয়ে দেবেন না।

 

আমার ক্লাসের বন্ধু ছিল দিলরওশন। ওরা ছিল ভারত থেকে আসা মোজাহের। আমার ছেলেবেলার অনেক বন্ধু দেশ ভাগের পর ভারতে চলে গেলেও এই বন্ধুটিকে আমি প্রাণের বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছি। তার মনের কথা আর আমার মনের কথা একদম এক। আমরা অনেক লেখাপড়া করবো, আমরা মস্তবড় চাকরি করবো, আমরা বিদেশ ভ্রমণ করবো, আমরা জীবনে বিয়ে করবো না!
কিন্তু আমাদের বয়ফ্রেন্ড থাকতে পারে!

সারাদিন স্কুলে বসে আমদের প্ল্যানপ্রোগ্রাম। আমরা মাণিকজোড়। আমি দিলরওশনের বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ। সেও আমাকে তার প্রাণের বন্ধু মনে করে। সমস্ত ক্লাসের ভেতরে আমাদের দুজনের আইকিউ সত্যিকার অর্থে যেন ট্যালি করেছে!

স্কুল ছুটির সময়েও আমাদের দুজনের ভেতরে ক্রমাগত চিঠি চালাচালি হতো। দিলরওশনদের বাসা ছিল লিচুতলায়। লিচুতলা আমাদের বাড়ির কাছে। আমরা তখন একটু বড় হয়ে গিয়েছি। সুতরাং হাতচিঠি চালাচালির ভার পড়ল আমাদের ছোট ভাইবোনদের ঘাড়ে। তাদের চকোলেট বা লজেন্স দেবার লোভ দেখিয়ে আমরা সারাদিনে অন্তত পাঁচ ছ’বার হাতচিঠি চালাচালি করতাম। চিঠির ভাষা ছিল সাধু এবং পরস্পরকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও কৌতুক করে লেখা হতো এইসব চিঠি।
আমাদের বাড়ির নীরস পরিবেশের ভেতরে এটুকু ছিল একটুখানি দখিন হাওয়া।
আমার বড় বোনের ততদিনে জাতের একজন ছেলের সঙ্গে ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গিয়েছে।
এবং বিয়ের সময় কপালে সিঁদুর পরানো হয়েছে। কারণ তখনকার দিনে মুসলমান মেয়েদের বিয়ে হলেও কপালে সিঁদুর পরানো হতো। পায়ে আলতা দেওয়া হতো। ধান দূর্বা দিয়ে বধু বরণ করা হতো।

 

একটু পরেই মাটিলেপা রান্নাঘরে আমি আর সে সেই ছেলেবেলার মতো উপুড় হয়ে বসেছি! তারপর কত গল্প। সে তার ঘরসংসারের গল্প। স্বামী মারা যাবার গল্প। সবকিছুর ব্যাপারেই সে চিরটাজীবন যেন নিরাসক্ত। কিন্তু এসব তো কত পরের কথা। কতযুগ পরের কথা। পাকিস্তান শেষ হয়ে বাংলাদেশের কথা।

 

রাতদিন বাবার মুখে বিয়ে বিয়ে শুনতে একসময় আমার মনেও বিয়ের সখ গজালো। বিশেষ করে আমাদের পাড়ার আমার বয়সী এমনকি আমার চেয়ে বয়সে ছোট মেয়েদেরও বিয়ে হয়ে যেতে লাগল। তখন কারো বয়স দশ, কারো বারো, কারো তেরো। খুব বেশি বয়স হলে কারো চৌদ্দ। একই জাতের ভেতরে এর সঙ্গে তার সঙ্গে বিয়ে হয়ে যেত। বিয়ের সময় ঝুড়ির ভেতরে কনের জন্যে লাল টুকটুকে চেলির কাপড় আসতো, গায়ের নতুন ব্লাউজ আসতো, মাথার চুলের জন্যে তেল মশলা আসতো। বিয়েতে মাথার চুল বাঁধাটা ছিল ভীষণ মুন্সিয়ানি একটি কাজ। পাড়ার যে সে মহিলা এই চুল বাঁধতে পারতো না। বিয়ের দিন কনের মাথার চুল ভালো করে সাবান দিয়ে ধুয়ে শুকিয়ে তারপর নানারকমের সুগন্ধি বাঁটা মশলা চুলের পরতে পরতে বিছিয়ে অসংখ্য বিনুনি করে তবে চুল বাঁধা হতো। সেই চুলের খোঁপা করা হতো। চাট্টিখানি কথা ছিল না। সেই খোঁপা যখন বাঁধা হতো তখন চারপাশ সুগন্ধি মশলার গন্ধে বাতাস ভুরভুর করে উঠতো। আমরা ছেলেমেয়েরা নাক টেনে টেনে সেই সুগন্ধি উপভোগ করতাম। তারপর হবু বরকে খোলা চাতালে চেয়ার টেনে মাঝখানে বসিয়ে তাঁর চোখের সামনে টান টান করে লাল শালুর কাপড় দিয়ে পর্দা করে পর্দার ওপাশে কনেকে বসিয়ে বরের সুমুখেই কনেকে সাজিয়ে দেওয়া হতো, ভাবটা যেন আঁটিতে টক পাবে না! এমন মেয়ে তোমার হতে তুলে দিচ্ছি এর মধ্যে কোনো ছলচাতুরি নেই। গোটা মেয়েটাকে তোমার চোখের সামনেই খোলামেলা রেখে দেনমোহর নিয়ে বিক্রি করে দিচ্ছি!

 

হবু বরের সামনে মেয়েকে এভাবে সাজিয়ে তোলা আমার শিশু বয়সেই মনের মধ্যে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। প্রথম প্রশ্ন ছিল, মেয়েটিকে এভাবে কেন অপমান করা হচ্ছে!
দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল এত দীর্ঘ সময় একটি বাচ্চা মেয়ে এভাবে এত লোকের চোখের সামনে কেন বসে থাকবে?
তৃতীয় প্রশ্ন ছিল মেয়েটি কেন প্রতিবাদ করে উঠে চলে যাচ্ছে না!

 

না, মেয়েরা কেউ উঠে চলে যেত না। বরং এইরকম যমযন্ত্রণা ভোগ করে শ্বশুড় বাড়ি চলে যেত।
এখন এসব ভাবলে কেন জানি মনে হয়, এভাবে নতুন একটি পরিবারে মেয়ে তুলে দেওয়া মানে এক ধরণের মেয়ে বিক্রি। আদিকালে লোকেরা যখন দাসী কিনতো হাটে-বাজারে গিয়ে তখন তো এভাবেই মেয়েরা বাজারে দাঁড়িয়ে থাকতো খদ্দেরের আশায়। সে খদ্দের যেমন দেশি হতে পারতো, তেমনি বিদেশীও হতে পারতো। দাসী কেনার সময় সকলেই মেয়েটিকে হাটের হাজার লোকের সমুখে নেড়েচেড়ে চুল, চোখ, হাত, পা, নখ, শরীরে মাংসের সমাহার দেখেই তো কিনতো। এখনও হিন্দু কমিউনিটির মেয়েরা বিবাহের আগে হবু শ্বশুড়বাড়ির লোকজনের সমুখে চুল খুলে, ভেজা পায়ের ছাপ মাটিতে ফেলে পায়ের নিখুঁত অবয়ব দেখিয়ে, শরীরের গঠন দেখিয়ে তবে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারে।
মনে হয় সেই আদিকালের সিস্টেম ফলো করেই আমাদের বংশে মেয়েদের বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হতো।

 

দেখতে দেখতে আমার সব বন্ধুদেরই বিয়ে হয়ে গেল। সকলেই শ্বশুড়বাড়ি রওনা দিল। অবশ্য সে শ্বশুড়বাড়ি মাত্র রাস্তার এপার বা ওপার। বা বড় জোর দুই রাস্তা পরে। বা খুব বেশি দূর হলে কেশবপুর বা বসুন্দিয়া। যা দু’ চার ঘণ্টা হাঁটলেই পৌঁছে যাওয়া যায়। সব চাচাতো, ফুপাতো, মামাতো, খালাতোর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে ফেললো।
আমার খেলার সাথিরা সকলেই এরপর চলে গেল।

আমার আপন চাচাতো বোন সীতারা চলে গেল। আমার আরেক দূর সম্পর্কের চাচাতো বোন নেজদানেব চলে গেল আমার আরেক দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই এনামুল হকের সঙ্গে বিয়ে হয়ে। সব রাস্তার এপারে-ওপারে বাপের বাড়ি ও শ্বশুড়বাড়ি।
আমাদের পাড়ার দূর সম্পর্কের আত্মীয় এবং আমার অনুগত খেলার বন্ধু মনাক্কা চলে গেল বিয়ে হয়ে কেশবপুর। আমার চেয়ে বয়সে ছোট রাবেয়া ফুপুর বিয়ে হয়ে গেল। আরও বয়সে ছোট আয়েশা ফুপুরও বিয়ে হয়ে গেল। এদের বিয়ে হলো সব পট্টির ভেতরে। আমার বন্ধু মায়ারও বিয়ে হয়ে গেল। তার বিয়ে হলো সামান্য দূরে।
তারা সব লাল শালু পরে, পায়ে আলতা পরে, মল বাজিয়ে, মাথায় সুগন্ধি চুলের খোঁপা সাজিয়ে টকটকে সদ্য প্রস্ফূটিত চেহারা নিয়ে ঝমঝম করতে করতে চলে গেল শ্বশুড়বাড়ি।

 

রাতের গভীরে ঘুম ভেঙে গিয়ে আমি কেন যেন দুশ্চিন্তায় এপাশ-ওপাশ করি।

 

আমি সবচেয়ে বেশি মিস করতে লাগলাম মনাক্কাকে। কারণ মনাক্কা ছিল আমার প্রিয় বন্ধু। নীরব, চুপচাপ। আমার জ্ঞানগম্যির প্রতি ছিল তার অগাধ আস্থা। তার বড় ভাইয়ের নাম ছিল শরীফ। এই শরীফ ভাইই তো আমার ম্যাট্রিকের রেজাল্ট বেরোলে সারা চুড়িপট্টিতে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিল।
তো মনাক্কা ছিল আমার প্রাণের বন্ধু। সে কথা বলতো কম। আমার অনুগত ছিল সে। এমন অনুগত যে আমি তাকে যা বলতাম বিনা প্রতিবাদে সে সেটা সমর্থন করতো। আমার সব কথাতেই হাসিমুখে হ্যাঁ। আর এরকম অনুগত বন্ধুই তো আমি চাইতাম। আমার বাবার মতো। যার মুখে কোনো প্রতিবাদ থাকবে না!
কড়কড়ে দুপুর বেলা আমি যদি মনাক্কাকে বলতাম, এখন রাত হয়ে গেছে, পুতুলদের ঘুম পাড়িয়ে দিই, কি বলিস? তো সঙ্গে সঙ্গে সে আকাশের জলন্ত সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলতো, উরে বাবা, অনেক রাত, ঘুম পাড়িয়ে দে!
আমি যখন অনেক বড় হয়েছি। লেখাপড়া করতে ইংল্যান্ডে গিয়েছি, ঢাকা মেডিকেলের অধ্যাপক, আমি ঠিকই খুঁজে খুঁজে আমার সেই বন্ধুর শ্বশুড়বাড়ি কেশবপুরে গিয়ে উপস্থিত হয়েছি।
তার আগে তার গর্ভ থেকে বেরিয়েছে সাত সাতটি ছেলে আর তারা প্রত্যকেই যৌবনে এবং কর্মক্ষম।
সে একমুঠো একটি মানুষ। চিরজীবনই রোগা, পাতলা, ছোটোখাটো।

আমাকে তিরিশ বছর পরে তার বাড়ির উঠোনে ঢুকতেই দেখি—টিনের চালার বিশাল বাড়ি। কারণ তার বিয়ে হয়েছিল একজন ধনী বয়স্ক বিপত্নীকের সঙ্গে, আমাদের জাতের মানুষের সঙ্গে, সেখানে সে মোটামুটি ভালোই সংসার করেছে। সাধাসিধে মানুষ সে। জীবন, প্রেম বা ভালোবাসা নিয়ে কোনোদিন মাথা ঘামায়নি। তার ছিল নির্বিকার একটি বোধ, যে জন্যে আমাকে প্রায় তিরিশ বছর পর তার বাড়ির উঠোনে দেখে নির্বিকারভাবে বলে উঠেছে, আসছিস? তো আয়, বয়!

একটু পরেই মাটিলেপা রান্নাঘরে আমি আর সে সেই ছেলেবেলার মতো উপুড় হয়ে বসেছি!
তারপর কত গল্প। সে তার ঘরসংসারের গল্প। স্বামী মারা যাবার গল্প। সবকিছুর ব্যাপারেই সে চিরটাজীবন যেন নিরাসক্ত।
কিন্তু এসব তো কত পরের কথা। কতযুগ পরের কথা। পাকিস্তান শেষ হয়ে বাংলাদেশের কথা।

 

এখন তো চুড়িপট্টিতে সকলের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর আমি পড়ে থাকলাম পেছনে। একা।
আমি পড়ি ক্লাস সিক্সে। আমি কি করি?
এখন তো আমারও বিয়ে করতে ইচ্ছে হচ্ছে!

এইসময় যদি বাবা আমার দূর্বলতা টের পেয়ে আমাকে বিয়ে দিয়ে দিতেন তো ঝপ করে বিয়েটা হয়ে যেত। কিন্তু না, বিয়ে হবার নয়! আমার মা প্রতিজ্ঞা করেছেন বিএ পাশ না করলে আমার বিয়ে হবে না। জানি না, কবে আমি বিএ পাশ করবো। আর কবে আমার বিয়ে হবে!

রাতের গভীরে ঘুম ভেঙে গিয়ে আমি কেন যেন দুশ্চিন্তায় এপাশ-ওপাশ করি।

 

চলবে…


 

লেখক

১৯৪০ সালের ৫ নভেম্বর যশোর জেলার চুড়িপট্টি গ্রামে এক মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা গোলাম রফিকউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন একজন ব্যবসায়ী ও মা আছিয়া খাতুন একজন গৃহিণী। তার বাবা খুবই ধার্মিক মানুষ ছিলেন। তাকে ছোটবেলায় কঠিন পর্দা ও অন্যান্য ইসলামী শরিয়ত মেনে চলতে হতো। তার শৈশব ও কৈশোর কাটে যশোরে।

তার পাঠদানের হাতেখড়ি হয় মায়ের কাছে। চুড়িপট্টির মোহনগঞ্জ প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। মধুসূদন তারাপ্রসন্ন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক ও ১৯৫৮ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত স্কুল ও কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। কলেজ গ্রন্থাগারে প্রচুর বই থাকলেও তিনি তা অধ্যয়নের সুযোগ পান নি। সে সময়ে শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবই পড়ারই সুযোগ পেত। তাই মাঝে মাঝে উপন্যাস, ম্যাগাজিন ও অন্যান্য সাহিত্য পেলে তারা নিজেদের ধন্য মনে করত। ১৯৫৯ সালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। তিনি ইংরেজি সাহিত্যে পড়তে চাইলেও তার বাবার আগ্রহে তাকে মেডিকেলে ভর্তি হতে হয়। ১৯৬৫ সালে তিনি এমবিবিএস পাস করেন। পরে ১৯৭৩ সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য লন্ডনে যান। তিনি সেখান থেকে ১৯৮২ সালে মনোবিজ্ঞানে এমআরসি ডিগ্রী লাভ করে দেশে ফিরে আসেন।

এমবিবিএস পাস করার পর তিনি তৎকালীন পাকিস্তান বিমান বাহিনী মেডিকেল কোরে লেফটেন্যান্ট পদে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালে মক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সম্পূর্ন নয় মাস তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। ঢাকা এয়ারবেসের মেডিক্যাল সেন্টারে তিনি চিকিৎসা করেছেন সৈনিকদের এবং তাদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের। ১৯৭৩ সালে তিনি বিমানবাহিনীর চাকরি থেকে ইস্তেফা দিয়ে লন্ডন চলে যান এবং সেখানে কয়েকটি হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। লন্ডন থেকে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে দেশে এসে ১৯৮৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে মনোরোগ বিভাগে সহকারী প্রভাষক হিসাবে যোগ দেন। ১৯৮৯ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৯৩ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন ঢাকার মানসিক স্বাস্থ ইন্সটিটিউটের পরিচালক ও প্রভাষক। ১৯৯৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে অবসর নেন। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্য ও স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন হাসপাতালে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সাল থেকে তিনি ঢাকার বারডেম হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের প্রভাষক ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত আছেন।

তার প্রথম ছোটগল্প পরিবর্তন ১৯৫৪ সালে দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত হয়। ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তিনি নিয়মিত দৈনিক ইত্তেফাকের কচি কাঁচার আসরে লিখতেন। মাইকেল মধুসূদন কলেজে পড়াকালীন দৈনিক আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী ও গুলিস্তা পত্রিকায় তার লেখা গল্প, কবিতা প্রকাশিত হতো। গুলিস্তা পত্রিকায় লিখে তিনি পুরষ্কৃতও হয়েছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াকালীন লেখালেখির পাশাপাশি তিনি কলেজের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িয়ে পড়েন। এই সময়ে ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম শ্রেণীর পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন মেডিকেল জার্নালে তার লেখা ছাপা হতো। তার প্রথম উপন্যাস ১৯৬৮ সালে সচিত্র সন্ধানীতে প্রকাশিত হয়। তার সেই প্রেম সেই সময় ও বাজিকর উপন্যাসে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা বর্ণিত হয়েছে। নরক ও ফুলের কাহিনী উপন্যাসে লিখেছেন তার ছেলেবেলার কথা। বাড়ি ও বণিতা উপন্যাসে চিত্রায়িত হয়েছে মধ্যবিত্ত পরিবারের সামাজিক সমস্যা। উপন্যাস ছাড়া তিনি শিশুদের জন্য সাহিত্য রচনা করেছেন। ১৯৭৭ সালে ছানার নানার বাড়ি, বাবার সাথে ছানা (১৯৮৬), ছানা এবং মুক্তিযুদ্ধ (১৯৮৭), ১৯৯০ সালে তৃপ্তি, আবেদ হোসেনের জোৎস্না দেখা, ১৯৯২ সালে হাতছানি, আগুনের চমক এবং মুক্তিযোদ্ধার মা নামক শিশুতোষ গল্প ও উপন্যাসগুলি প্রকাশিত হয়।

তিনি ১৯৬২-৬৩ সালের দিকে সৈয়দ শামসুল হকের অনুপম দিন, শীত বিকেল, সম্রাটের ছবি, এক মহিলার ছবি, দেয়ালের দেশ পড়ে তার সাথে দেখা করার চেষ্টা করেন। তিন পয়সার জোসনা গল্পটি পড়ার পর তিনি সৈয়দ হককে চিঠি লিখেন। সৈয়দ হক এক মাস পর সেই চিঠির জবাব দেন। এরপর প্রতিনিয়তই তারা চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ করতে থাকেন। একদিন সৈয়দ হক তাকে ঢাকার গুলিস্তান সিনেমা হলের চিন-চাও রেস্তোরায় দেখা করতে বলেন। প্রথম সাক্ষাতে সৈয়দ হক তাকে উদ্দেশ্য করে একটি কবিতা লিখেন। তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তখন তারা ব্রিটিশ কাউন্সিলসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন। ১৯৬৫ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি সৈয়দ হকের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সৈয়দ হক ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ফুসফুসের কর্কটরোগ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এই দম্পতির দুই সন্তান। মেয়ে বিদিতা সৈয়দ হক একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষক। ছেলে দ্বিতীয় সৈয়দ হক একজন আইটি বিশেষজ্ঞ, গল্পকার ও গীতিকার। তিনি যুক্তরাজ্যের রিচমন্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টারন্যাশনাল ফিনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে এমবিএ পাস করেন।

ছোটগল্প
• পরিবর্তন (১৯৫৪)
• পারুলীর উড্ডয়ন
• হেলাল যাচ্চিল রেশমার সাথে দেখা করতে
• গলে যাচ্ছে ঝুলন্ত পদক
• অন্ধকারে যে দরোজা
• মানসিক সমস্যার গল্প
• শূন্যতার সাথে নৃত্য
• গুজরিপঞ্জম
• গ্রাম গঞ্জের গভীরে
• পূর্ণিমায় নখের আঁচড়
• সূর্য ওঠার গল্প
উপন্যাস

• তৃষিতা (১৯৭৬)
• সোনার হরিণ (১৯৮৩)
• সেই প্রেম সেই সময়
• বাজিকর
• জলনুড়ি
• তারাবাজি
• হাতছানি
• উদয় মিনাকে চায়
• অস্থিরতার কাল, ভালোবাসার সময়
• ভালোবাসার লাল পিঁপড়ে
• নরক ও ফুলের কাহিনী
• বাড়ি ও বনিতা
• গা শিরশির (২০১১)
• কার্নিশে ঝুলন্ত গোলাপ
• সেই ভাষণটি শোনার পর
• নিঃশব্দতার ভাঙচুর
• তাম্রচূড়ের লড়াই
• সেইসব দিন
• যোজন দূরের স্বজনেরা
• ঘুম
• খাদ
• আহত জীবন
• আকাশ ভরা
• দুই রমণী
• নারী : বিদ্রোহী
• সবুজ পশমি চাদর
• ব্যবহ্নতা
• আয়নার বন্দী
• নখ
• সন্দেহ
• ঘুমন্ত খেলোয়াড়
• রূপালী স্রোত
• চেমনআরার বাড়ি

কাব্যগ্রন্থ

• কিছু কি পুড়ে যাচ্ছে কোথাও
• তুমি আগে যাবে, না আমি
• স্বপ্নের ভেতর
• তুমি এক অলৌকিক বাড়িঅলা
• কাল খুব কষ্টে ছিলাম
• আমার শয্যায় এক বালিশ-সতীন

প্রবন্ধ
• নারীর কিছু কথা আছে
• কিশোর-কিশোরীর মন ও তার সমস্যা
• যেমন আমাদের জীবন
• ক্ষুব্ধ সংলাপ (২০১১)
• মেয়ে হয়েছি বেশ করেছি (২০১২)
• তোমার কথা
• পিকাসোর নারীরা
শিশুসাহিত্য
• ছানার নানার বাড়ি (১৯৭৭)
• বাবার সাথে ছানা (১৯৮৬)
• ছানা এবং মুক্তিযুদ্ধ (১৯৮৭)
• পথের মানুষ ছানা
• একজন মুক্তিযোদ্ধার ছেলে
• আমাদের মুক্তিযোদ্ধা দাদাভাই
• মন্টির বাবা
• তোমাদের জন্য এগারোটি
• উল্টো পায়ের ভূত
• আমি ম্যাও ভয় পাই
• আমি বাবাকে ভালোবাসি
• হানাদার বাহিনী জব্দ
• মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ছড়া
• ছোটখেলের বীর
• যেমন আমাদের জীবন
• সর্পরাজের যাদু
• আমার মা সবচেয়ে ভালো (২০০৮)
• তুমি এখন বড় হচ্ছো
• টুটুলের মা-গাছ
• উদাসী বালক
• তপনের মুক্তিযুদ্ধ
• কাঠের পা
• আগুনের চমক
• দশ রঙের ছড়া
• মুক্তিযুদ্ধের পাঁচটি উপন্যাস
অনুবাদ

• ল্যু সালোমে : সাহিত্যভুবনের অগ্নিশিখা (২০১২)

স্মৃতিকথা

• অবরুদ্ধ

ভ্রমণকাহিনী
• উড়ে যাই দূরে যাই
পুরস্কার ও সম্মাননা

• ভাষা ও সাহিত্যে একুশে পদক-২০১৯
• উপন্যাস শাখায় নৃ প্রকাশনী থেকে ছানা ও নানুজান-এর জন্য পাঞ্জেরী ছোটকাকু আনন্দ আলো শিশুসাহিত্য পুরস্কার-২০১৯
• উপন্যাসে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০১০
• কবীর চৌধুরী শিশুসাহিত্য পুরস্কার-২০০৭
• ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০০৬
• অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার
• মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার
• শিশু একাডেমি পুরস্কার

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *