আমার বাবা আমার যিশু-০২

152 Views

Spread the love

এরকম রাগ ছিল বাবার বড় ভাই আমাদের বড়বাবারও। কিন্তু বড়বাবা থাকতেন অন্য বাড়িতে। মানে আমার দাদার বাড়িতে। পৈত্রিক সূত্রে বড়বাবা সেই বাড়ি অধিকার করেন। আমার বাবা ভাগে পান পুরনো দালানসহ একটা মস্ত বড় জমি। সেই জমিতে বাবা চার-পাঁচখানা ঘর, রান্নাঘর, গোয়াল ঘর, ঢেঁকিঘর তুলে আমাদের সঙ্গে নিয়ে বসবাস শুরু করেন। তার আগে পর্যন্ত আমরা ছোট্ট একটা বাড়িতে থাকতাম। সেই বাড়িও ছিল আমার দাদার। আমার ছোট চাচার ভাগে সেই ছোট বাড়ি এবং তার সঙ্গে আরও কয়েকখানা বাড়ি পড়ে। সুতরাং সেই ছোট বাসা থেকে আমরা বড় বাড়িতে এসে পড়ি।

আগে যখন ছোট বাড়িতে ছিলাম, যে বাড়িটা পরবর্তী কালে আমার ছোট চাচার ভাগে পড়েছিল। সে বাড়িটা আমার খুব পছন্দের ছিল। সেই বাড়িতেই আমার শৈশব কাটে। বাড়িটাতে ছোট ছোট তিনটে ঘর ছিল। ভেতরের দিকে লম্বা ও চওড়া একটি টানা বারান্দা ছিল। সেই টানা বারান্দার ওপরে বসে বসে আমি মাথা তুলে পৃথিবী দেখতাম। আমাদের বাড়ির পেছন দিকে একটা মস্ত বড় বেল গাছ ছিল। সেই গাছে বেল ধরত অনেক। বেল ঝুলে থাকত গাছে। আবার একটা নারকেল গাছও ছিল। বাতাসে নারকেল গাছের মাথায় পাতাগুলো দোল খেত। সেদিকটা ছিল কাপুড়িয়া পট্টি। আমাদের ছোট বাসা থেকে বেরোলেই হাতের বাঁয়ে গলি। আর গলি পেরোলেই কাপুড়িয়া পট্টি। এই পট্টি ছিল কাপড়ের ব্যবসার একটি জমজমাট স্থান। শুধু কাপড় নয়। সব রকমের জিনিস বিক্রি হতো। সোনার গহনা থেকে জুতো পর্যন্ত। কাপুড়িয়া পট্টির শেষ মাথায় ছিল কালিবাড়ি। রোজ সন্ধ্যেবেলা সেখানে কাঁসার ঘণ্টা বাজত কালিঠাকুরের অঞ্জলি শেষ হলে। আর তার উল্টোদিক থেকে ভেসে আসত আযান। আমি ছোট হলেও আমার মনের ভেতরে কীসের যেন বেদনা জমা হতো। মনে হতো দিন শেষ হলো! আর একটু পরেই রাত শুরু হয়ে যাবে। এত বড় বাড়িতে শুধু জ্বলবে মাত্র দুটো হ্যারিকেন। একটি লেখাপড়ার টেবিলে। আরেকটি রান্নাঘরে। তা ছাড়া পুরো বাড়ি, গাছতলা, কুয়োতলা, কলঘর, গোয়ালঘর, ঢেঁকিঘর সব থাকবে অন্ধকারে। সেখানে রাতের বেলা কোন মচ্ছব শুরু হবে কে জানে?

অন্ধকার আমি ভালোবাসতাম না। অন্ধকার আমি জীবনে কোনওদিন ভালোবাসিনি। আকাশে হাজার তারা আর চাঁদ উঠলেও নয়! ছেলেবেলা থেকে আমি চেয়েছি আলোকিত জীবন এবং ভাগ্যের জোরে সেই জীবনই পেয়েছিলাম।

তো আমার সেই ছেলেবেলাতেই ভারত তিনভাগ হয়ে গেল। তার আগে আগে শুরু হলো রায়ট। আমার বাবাকে দেখতাম রাতদিন দৌড়ে বেড়াচ্ছেন। কোথায় কে আটকে পড়েছে, কোন বন্ধুকে সাহায্য করতে হবে—এইসব নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।

আমাদের চুড়িপট্টির রাস্তায় নতুন ধরনের মানুষজনদের ঘোরাফেরা করতে দেখি। যাদের ভাষা বিহারি। যাদের চেহারার ভেতরে কোনওপ্রকারের শালীনতার ছিঁটাফোটাও নেই। যারা সরকারি রাস্তায় বিশাল গরু জবাই করে মাংস ভাগ করে।

দেশ ভাগের পর আমার বাবার যেমন বন্ধুবান্ধবেরা ছারখার হয়ে গেল। কেউ রায়টে মারা পড়ল। কেউ দেশ ছেড়ে চলে গেল। আমার ছেলেবেলার বন্ধুরাও একে একে হারাতে লাগল। আমার ছেলেবেলা হয়ে উঠল একটি ভাঙচুরের ছেলেবেলা।

একদিন আমার চোখের সামনেই আমাদের পট্টিতে রায়ট শুরু হলো। বাঁশ আড়আড়ি করে ধরে রায়টারদের আমাদের পট্টিতে ঢোকার জন্যে কিছু মানুষ বাধা দিতে লাগল। আমি দৌড়ে এসে কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে খবর দিলাম। মা তাড়াতাড়ি বাবার খোঁজ করতে শুরু করলেন। আর আমি একটা পেন্সিল দিয়ে বাড়ির বেড়ার গায়ে বড় বড় করে লিখলাম—মঞ্জুরা এ বাড়িতে আর থাকে না! কারণ আমার দৃঢ় ধারণা হলো—রায়টরা যখন আমাদের বাড়িতে ঢুকবে—তখন বেড়ার গায়ে পেন্সিলে লেখা আমার খবরটা পড়ে তারা বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে!

যদিও আমরা তখন বাড়ির কোনও একটি ঘুপচি কোণে চুপ করে লুকিয়ে থাকব! দেশ ভাগের পর আমার বাবার যেমন বন্ধুবান্ধবেরা ছারখার হয়ে গেল। কেউ রায়টে মারা পড়ল। কেউ দেশ ছেড়ে চলে গেল। আমার ছেলেবেলার বন্ধুরাও একে একে হারাতে লাগল। আমার ছেলেবেলা হয়ে উঠল একটি ভাঙচুরের ছেলেবেলা। আজ যে বন্ধুর সঙ্গে ধূলিমাটি নিয়ে খেলছি, কালই সে বন্ধু চলে গেছে বেনাপোলের ওপার। সম্পর্কের অনিত্যতা আমাকে প্রতিনিয়ত বিপর্যস্ত করেছে। এই ভাঙচুরের নকশা আমার ব্যক্তিগত জীবনেও মরণ খেলা খেলেছে!

তারও আগে যখন আমি নেহাতই ছোট, বাবার সাথে আমার খুব বন্ধুত্ব হয়েছিল। একদিন মনে আছে—ঘরের চৌকি-খাটে বসে বাবা আমাকে কোলে নিয়ে খুব আদর করছেন। আমার গালে চুমো খাচ্ছেন। আমার পেটে সুড়সুড়ি দিচ্ছেন। আমার গালে তার না কামানো গাল ঘষে দিচ্ছেন। আর আমি খিলখিল করে হাসছি। আমি মেয়ে হয়ে জন্মেছি বলে আমার মায়ের ওপরে আর রাগ করছেন না!

আমার বাবা-চাচাদের শরীরও অনেক লম্বা-চওড়া ছিল। চেহারা ফর্সা ছিল। মাথাভর্তি চুল ছিল। টাক বলে আমাদের বংশে কিছু ছিল না। গলার জোর ছিল। চেঁচালে একমাইল। না চেচাঁলে তিন শ গজ।

আমার বয়স বড়জোর দু’বা আড়াই হবে। ছেলেবেলার স্মৃতি বড় প্রকটভাবে আমার করোটিতে ছাপ ফেলে রেখেছে। এমন কী মায়ের কোলে বিছানায় শুয়ে যখন মায়ের বুকের দুধ খাচ্ছি—তখনও সেই স্মৃতি আমার করোটি ধরে রেখেছে। কারণ একদিন বুকের দুধ খাওয়াতে খাওয়াতে মা দুষ্টুমি করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—মঞ্জু , আমি মরে যাই? এই দ্যাখ মঞ্জু—আমি মরে যাচ্ছি! এই কথা বলে মা তাঁর দুচোখ বুজে ফেললেন। আমি বুঝলাম মা মরে গেছেন। আমি মুখ থেকে দুধের বোঁটা ফেলে জোর করে মায়ের চোখ দুটো খুলতে চেষ্টা করলাম। এরপর মা হেসে ফেললেন। আমি বুঝলাম মা মরেন নি।

তবে আমার প্রতি বাবার ভালোবাসার প্রকাশ সেই প্রথম এবং আমার স্মৃতিতে যেন সেটিই শেষ!

তো আমার বড়বাবার কথা একটু বলি। তাঁর নাম ছিল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী। বিশাল শরীরের মানুষ ছিলেন তিনি। চোখগুলো ছিল অনেক বড় বড়। আমার বাবা-চাচাদের সকলেরই চোখ ছিল বড় বড়। আর সেই চোখে যখন রাগ দেখা দিত—তখন সেখানে রক্তের রেখাও আবছা ফুটে উঠত। সেটা ছিল আরও ভয়াবহ ব্যাপার।

আমার বাবা-চাচাদের শরীরও অনেক লম্বা-চওড়া ছিল। চেহারা ফর্সা ছিল। মাথাভর্তি চুল ছিল। টাক বলে আমাদের বংশে কিছু ছিল না। গলার জোর ছিল। চেঁচালে একমাইল। না চেচাঁলে তিন শ গজ। আমার দুজন ফুপু। যাঁরা বেঁচে ছিলেন, তাঁরা ছিলেন আর দশজন মেয়েদের মতোই তবে লম্বা ছিলেন দুজনেই। ফর্সা ছিল তাঁদের চেহারা। আর মাথাভর্তি ছিল কোঁকড়ানো কালো চুল। তবে কোনও ভাইবোনের সঙ্গে কোনও ভাইবোনের মিলমহব্বত ছিল না। এ ছিল এক অদ্ভুত পরিবার!

আমার দাদা নরিম বক্স চৌধুরীর বড় ভাই ছিলেন করিম বক্স চৌধুরী। তিনি ছিলেন আমাদের বংশের পঞ্চায়েতের হেড। তাঁর কথায় আমাদের কম্যুউনিটির মানুষেরা উঠত-বসত। মাসে একবার করে পঞ্চায়েত বসত আমাদের হাজি দাদার বিশাল দালানের নিচের চত্বরে। হাজি দাদার নাম ছিল হাজি আবদুল করিম। সেখানে পঞ্চায়েতের বিচার-আচার চলত। হাজি দাদা ছিলেন আমার দাদা করিম বক্স চৌধুরীর বোনের জামাই। হাজি দাদার বিশাল ব্যবসা ছিল। তাঁর বড় ছেলে আলমগীর সিদ্দিকী শুনেছি আওয়ামী লীগের জন্মের সময় কোন একটি সংগঠনে জড়িত ছিলেন। আমাদের যশোরের একটি রাস্তা। যে রাস্তায় আমাদের বাড়িঘর ও আত্মীয়-স্বজন। সেই রাস্তাটির নাম হাজি আবদুল করিম রোড। ডাকনাম চুড়িপট্টি।

আমার বয়স যখন আট বা নয়, ততদিনে ভারতবর্ষকে ছিন্নভিন্ন করা হয়ে গেছে।

আমার বড়বাবা ছিলেন সৌখিন একজন মানুষ কিন্তু উড়নচণ্ডী। অনেকটা আমার বাবার মতোই। তবে তার চেয়েও ভয়াবহ। আমার বাবা বাড়ি ছেড়ে গেলে তাঁকে মাঝে মাঝে এখানে-ওখানে খুঁজে পাওয়া যেত কিন্তু বড়বাবাকে কদাপি নয়। কিন্তু তিনি যেদিন বাড়ি ফিরতেন, প্রায়ই রাতের গভীরে বাড়ি ফিরতেন। তিনি সমস্ত পাড়া জানান দিতে দিতে ফিরতেন। আমার মা বলতেন—শিগগির ঘুমো, তোর বড়বাবা বাড়ি ফিরছে!

আমরা তো অবশ্যই ঘুমিয়ে থাকতাম। আমাদের বড়বাবাই তো তাঁর চিৎকারে সমস্ত পাড়া জাগিয়ে দিতেন। আর তিনি যত চিৎকার করতেন ততই পাড়াটা একেবারে মরা মানুষের মতো নিশ্চুপ হয়ে যেত! মাঝে মাঝে নিজের বাড়িতে অর্থাৎ আমার দাদার আদি বাড়িতে ঢোকার আগে বড়বাবার হঠাৎ করে খেয়াল হতো তাঁর মেজো ভাইটির খোঁজখবর নেওয়া দরকার! অনেকদিন দেখা সাক্ষাৎ হয় না! সুতরাং তিনি আমাদের বাড়ির সামনে এসে বাবাকে জোর গলায় ডাকতেন। ‘ঘেনুয়া, ঘেনুয়া। কেয়া বাত? তু জবাব কিউ নিহি দেতি! হামারা সামনে আ যা!’

বাবা জবাব না দিলে বলতেন, ‘ওরে ঘ্যানা, দিস নে কেন? বড়কে মান্য করা ভুলে গেছিস? তুই আমার ছোট ভাই না? তাহলে কথার জবাব দিসনে কেন?’ বাবার সঙ্গে বড়বাবা সাধারণত দেশোয়ালি ভাষায় কথা বলতেন। সেই কবে আমার দাদার বাবা সিপাহী বিদ্রোহের পরপর বিহার ছেড়ে বাংলায় চলে এসেছিলেন কিন্তু তারপরও তারা নিজেদের ভেতরে দেশোয়ালি ভাষাতেই তখন পর্যন্ত কথাবার্তা চালিয়ে যেতেন। বড়বাবার ডাক শুনেও আমার বাবা চুপ করে পড়ে থাকতেন।

কিছুক্ষণ ডাকাডাকি করে বড় বাবা বিরক্ত হয়ে আমার মাকে সম্বোধন করে পরিস্কার বাংলায় বলে উঠতেন, ‘বৌমা, ঘ্যানা আমার ডাকে সাড়া দিচ্ছে না। আমি জানি ও আমার ডাক শুনে। তার বড় ভাইয়ের ডাক শুনেও ঘাঁতি মেরে বিছানায় পড়ে আছে! আমি সবই জানি। তুমি ওকে সাবধান করে দিও যেন এরকম বেচাল-কুচাল আমার সঙ্গে না করে। বুঝলে বৌমা?’ এই কথারও জবাব আসত না। কারণ মাও ভয় পেয়ে চুপ করে থাকতেন।

কেন জানিনে, আমার বড়বাবা আমার মাকে খুব স্নেহ করতেন। আমার মাকে তাঁর শ্বশুরবাড়ির মানুষেরা সাদরে গ্রহণ না করলেও আমার বড়বাবা আমার মাকে কোনওদিনও কটু কথা বলেন নি। আমাকে ও আমার বড়বোনকেও বড়বাবা স্নেহ করতেন কিন্তু সে স্নেহের প্রকাশ জোরে-সোরে ছিল না। আমার বয়স যখন আট বা নয়, ততদিনে ভারতবর্ষকে ছিন্নভিন্ন করা হয়ে গেছে। তখন আমার বড়বাবা মারা গেলেন। বড়বাবা ছিলেন অ্যালকোহলিক। সারাদিন-রাত মদে ডুবে থাকতেন। তাঁকে কোনো কাজ করতে হতো না। কারণ আমার দাদাদাদি যে সয়সম্পত্তি রেখে গিয়েছিলেন—তাই দিয়ে তারা সকল ভাই ও বোনেরা সুখে থাকার মতো ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন কিন্তু তবু তারা সুখি ছিলেন না। সুখ তাদের থেকে দশ হাত দূরে-দূরেই সারা জীবন থেকে গিয়েছিল। রাগের তাড়নায় তারা অস্থির থাকতেন। আর তাই হয়তো মোটামুটি অল্প বয়সে সকলেই দুনিয়া ছেড়েছিলেন।

আমরা ছিলাম সিপাহীযুদ্ধের পরবর্তী বিহার থেকে আগত বিশাল এক বিহারি জনগোষ্ঠী। আমার পূর্বপুরুষেরা সিপাহী বিদ্রোহে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধে হেরে যাবার পর বিহার থেকে তারা দলে দলে যে-যেদিকে পারেন সেদিকেই পালিয়ে গিয়ে জীবন রক্ষা করেছিলেন।

আমি বড় বাবাকে বড় ভালোবাসতাম। অবোধ ছিলাম আমি তবু বড়বাবাকে বড় ভালোবাসতাম! বাড়ি বা পাড়ার সকলে আমার বড়বাবাকে ভীষণ ভয় পেত। তাঁর সামনে কখনও কেউ পড়ে গেলে পালাবার যেন পথ পেত না কিন্তু আমার বড়বাবা তাদের কোনওদিন কিছু বলেছেন বলে আমার স্মরণে নেই। বস্তুত বড়বাবা যেন আপন মনেই পথ চলতেন। কেউ তার চোখের সামনে পড়লেও তিনি যেন গ্রাহ্য করতেন না। তাঁর চেহারার ভেতরে ছিল একটি রাজকীয় ভাব।

তিনি ছিলেন সৌখিন। আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল বাজার। সেই বাজারের ইজারা প্রতিবছর বড়বাবার নামে দেওয়া হতো। সেখান থেকে প্রতিদিন বাজারের তোলা ওঠানো হতো। বড়বাবা এসবের কোনও খোঁজ রাখতেন বলে মনে হয় না। তাঁর কর্মচারিরা সব কাজ করে দিত। আমি শুধু দেখতাম—প্রতিদিন বিকালে বড়বাবার বাড়ির উঠোনে, যা বস্তুত আমার দাদাবাড়িরই উঠোন। সেখানে জমা হতো সারাদিনের সংগ্রহ তরিতরকারি, আলু, কচু, মোচা, মিষ্টিকুমড়ো, লাউ ও কচুর সমাহার। বাজারের কৃষক বা জেলে, যারা পয়সা দিয়ে পারত না। তারা নাকি শাকসব্জি বা মাছ দিয়ে তোলা পূরণ করে দিত। এখন এতসব জিনিস প্রতিদিন খাবে কে? তাই পড়ন্ত বিকালে পাড়ার আত্মীয়-স্বজনেরা জড়ো হতেন। যাদের যা দরকার লাগত তুলে নিয়ে চলে যেতেন। পাড়াভর্তি ছিল আমাদের আত্মীয়-স্বজন। কারণ আমরা ছিলাম সিপাহীযুদ্ধের পরবর্তী বিহার থেকে আগত বিশাল এক বিহারি জনগোষ্ঠী। আমার পূর্বপুরুষেরা সিপাহী বিদ্রোহে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধে হেরে যাবার পর বিহার থেকে তারা দলে দলে যে-যেদিকে পারেন সেদিকেই পালিয়ে গিয়ে জীবন রক্ষা করেছিলেন।

আমার মা হিন্দু কমিউনিটি থেকে মুসলিম কমিউনিটিতে আসার জন্যে আমার দাদি ভালোচোখে দেখতেন না। দাদির পূর্বপুরুষ নাকি ছিলেন এলাহাবাদের। এটিও শোনা কথা। তবে আমার দাদি ছিলেন আরবি, ফারসি এবং উর্দুতে যথেষ্ট জ্ঞানী। দাদির ছিল ভীষণ কঠিন এক ব্যক্তিত্ব।

বাবার মুখে শুনেছি আমার দাদা যখন খুব ছোট ছিলেন তখন তাঁর হাত ধরে দাদার বাবা চিকুরি চৌহান বিহার থেকে প্রথমে কেশবপুর, তারপর সেখান থেকে যশোর আগমন করেছিলেন। চিকুরি চৌহান ছিলেন গোত্রপ্রধান। তাই তাঁর সঙ্গে সঙ্গে পুরো কম্যুউনিটির আগমন ঘটেছিল। চৌহান পরবর্তীতে চৌধুরীতে রূপান্তর লাভ করে।

চিকুরি চৌহানের পূর্বপুরুষ আদতেই ছিলেন রাজপুতানার অধিবাসী। ছিলেন পৃত্থিরাজের বংশধর কিন্তু ইসলামধর্ম গ্রহণ করবার পর রাজার রাজকীয় রোষের ভয়ে রাতারাতি রাজপুতানা ছেড়ে পূর্বদিকে আশ্রয়ের জন্যে কাফেলার অনুসরণ করতে হয়। কিছুদিন পর তারা খুব সম্ভব বিহারের সাসরামে এসে থিতু হন। পরে সিপাহী বিদ্রোহে যোগ দিয়ে পরাজিত হয়ে আবারও কাফেলা পরিবেষ্টিত হয়ে পূর্ব বাংলায় এসে থিতু হন। পুরুষানুক্রমে আমাদের বংশে গরুর মাংস খাওয়া ছিল একেবারে নিষিদ্ধ। যাকে বলে হারামের হারাম!

এসব বংশপরম্পরায় সব শোনা কথা। যাহোক, যে কারণেই হোক, বড়বাবা আমাকে কেন জানি ভালোবাসতেন। আমার মা হিন্দু কমিউনিটি থেকে মুসলিম কমিউনিটিতে আসার জন্যে আমার দাদি ভালোচোখে দেখতেন না। দাদির পূর্বপুরুষ নাকি ছিলেন এলাহাবাদের। এটিও শোনা কথা। তবে আমার দাদি ছিলেন আরবি, ফারসি এবং উর্দুতে যথেষ্ট জ্ঞানী। দাদির ছিল ভীষণ কঠিন এক ব্যক্তিত্ব। ফলে পাড়ার সকলে তাঁকে খুব ভয় পেত। আমার দাদির ছিল তিন মেয়ে ও তিন ছেলে। তার ভেতরে একটি মেয়ে ছিল জন্মান্ধ। আমার সেই ফুপুটি, মেহেরুন্নেসা অল্প বয়সেই মারা যান। আমার বাবা ছিলেন আমার দাদির তিন নম্বর সন্তান। আর আমার বড়বাবা ছিলেন দাদির দু’নম্বর সন্তান।

এই বড়বাবাকে সকলে ভয় পেলেও আমার কেন জানি ভয় লাগত না। তিনি যখন খুব অসুস্থ এবং বাইরের বৈঠকখানা ঘরে চুপ করে বিছানায় শুয়ে থাকতেন। রাস্তার দরজাটা খোলা রাখতেন রাস্তার মানুষ চলাচল চোখে দেখার জন্যে। তখন আমি চুপ করে সেই খোলা দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতাম। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এটাকে কি বলে রক্তের টান? তা আমি জানিনে।

শুধু শূন্য চোখে ঘরের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। যেন এত অল্প বয়সে মারা যাচ্ছেন বলেও তাঁর কোনও আক্ষেপ নেই।

বড় হয়ে জেনেছি—আমাদের চুড়িপট্টিতে মোহনগঞ্জ প্রাইমারি স্কুল বলে যে স্কুলটি আছে—সেটি আমার এই বড় বাবার জমির ওপরেই আজ বহু বছর ধরে স্থানান্তরিত। প্রথমে এটি ছিল আমাদের জমিতে। আমার দাদা বেঁচে থাকতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই স্কুল। প্রকৃতপক্ষে চুড়িপট্টির আসল নাম হচ্ছে মোহনগঞ্জ। তাই এই স্কুলটির নাম হয় মোহনগঞ্জ প্রাইমারি স্কুল। দাদা ও দাদি মারা গেলে এরপর জমি সব ভাইবোনদের ভেতরে ভাগ হয়ে যায়। আমাদের ভাগে স্কুল-সমেত জমিটুকু পড়ে। আমার বাবা পরবর্তীতে সেখানে বসবাসের জন্যে বাড়ি তৈরী করলেও বাহিরবাড়িতে স্কুল থেকেই যায়। পরবর্তীকালে সেখান থেকে স্কুল উঠে আমার বড় বাবার ভাগে যে সব জমি পড়েছিল তার একটিতে গিয়ে থিতু হয়। সেই হিসাবে বলা হয়তো যায় যে আমার বড়বাবা নিজে বেশি শিক্ষিত না হলেও শিক্ষার প্রতি তাঁর টান ছিল। নইলে কেন তিনি নিজের জমির ওপরে স্কুল পাকাপাকিভাবে স্থনান্তরিত করবেন?

আমি তখন এতসব জানতাম না। শিশু ছিলাম। বড় বাবার জন্যে আমার মনে দুঃখ জমা হতো। আমি রোজ সকালে বাড়ি থেকে নাস্তা খেয়ে এসে বড়বাবার ঘরের পৈঠায় চুপ করে বসে থাকতাম। বড়বাবা কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠতেন, ভাত খেয়েছিস? উত্তরে আমি মাথা হেলিয়ে বলতাম, হ্যাঁ। তারপর আমি চুপ করে তাকিয়ে থাকতাম। বড়বাবাও আর কিছু বলতেন না। আপন মনে দরজার বাইরে রাস্তার লোক চলাচল দেখতেন।

এই ফাঁকে আমি বড়বাবার ঘরের ছাদের নিচে ঘোরানো তাকের দিকে চোখ ফেলে দেখতাম সারি সারি সব আচারের বয়েম। বিশাল বিশাল কাচের বয়েমে যাদের জার বলা যায়। আমার সৌখিন বড়বাবা নানা ধরনের আচার তৈরী করতেন। কতটুক খেতেন তা জানিনে তবে তাকের ওপরে এক ডজন বা দু’ ডজন বয়েম সাজানো থাকত। বড় বড় ভাতি পেঁয়াজের আচার, কচি শশার আচার, জলপাই, গাজর, টমেটো এমনকি লম্বা দেশি বেগুনের আচারও সেইসব বয়েমে থাকত। আমি গোল চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এইসব দেখতাম। কেউ সরষের তেলে ভাসত। কেউ সিরকায় ভাসত।

বড়বাবা আমার সঙ্গে বেশি কথা বলতেন না ঠিক তবে আমি এটুকু বুঝতাম যে আমি যে সকাল থেকে তাঁর দোরগোড়ায় চুপ করে বসে আছি এতে তিনি অখুশি নন। কারণ কেউ তো সাহস করে তাঁর সামনে যেতে পারত না। তিনিও হয়তো কারো সাথে সেভাবে মিশতে পারতেন না। কারণ মানুষের সঙ্গে কীভাবে মিশতে হয় তাও হয়তো তিনি ভুলে গিয়েছিলেন।

আমি বড়বাবার চেহারার ভেতরে দিনদিন রুগ্নতার আভাস পেতাম। শাদা একটা চাদর দিয়ে ঢাকা থাকত তাঁর শরীর। পা লম্বা করে বিছানায় শুয়ে থাকতেন তিনি। তিন-চারটে বালিশ মাথায় দিয়ে উঁচু হয়ে শুয়ে থাকতেন। স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকতেন সামনে। আমার চোখের সামনে তাঁর পেট ধীরে ধীরে স্ফীত হয়ে উঠছে, বুঝতে পারতাম। তিনি যে মারা যাচ্ছেন সেটিও আমি বুঝতে পারতাম কিন্তু কী করে যে তাঁর কষ্টের লাঘব করব বুঝতে পারতাম না। আর বড়বাবাও আমার সামনে কোনওদিন একটুও কাতোরোক্তি করতেন না। তাঁর যে কোনও কষ্ট হচ্ছে আমাকে বুঝতে দিতেন না।

শুধু শূন্য চোখে ঘরের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। যেন এত অল্প বয়সে মারা যাচ্ছেন বলেও তাঁর কোনও আক্ষেপ নেই। তারপর একদিন আমার বড়বাবা মারা গেলেন। কী ছিল তাঁর দুঃখ—ভাইবোনদের প্রতি কী ছিল তাঁর অভিযোগ—কেন তিনি এত অসুখী ছিলেন—আমি তা বোঝার আাগেই তাঁকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হলো।

চলবে


আনোয়ারা সৈয়দ হক

১৯৪০ সালের ৫ নভেম্বর যশোর জেলার চুড়িপট্টি গ্রামে এক মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা গোলাম রফিকউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন একজন ব্যবসায়ী ও মা আছিয়া খাতুন একজন গৃহিণী। তার বাবা খুবই ধার্মিক মানুষ ছিলেন। তাকে ছোটবেলায় কঠিন পর্দা ও অন্যান্য ইসলামী শরিয়ত মেনে চলতে হতো। তার শৈশব ও কৈশোর কাটে যশোরে।

তার পাঠদানের হাতেখড়ি হয় মায়ের কাছে। চুড়িপট্টির মোহনগঞ্জ প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। মধুসূদন তারাপ্রসন্ন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক ও ১৯৫৮ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত স্কুল ও কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। কলেজ গ্রন্থাগারে প্রচুর বই থাকলেও তিনি তা অধ্যয়নের সুযোগ পান নি। সে সময়ে শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবই পড়ারই সুযোগ পেত। তাই মাঝে মাঝে উপন্যাস, ম্যাগাজিন ও অন্যান্য সাহিত্য পেলে তারা নিজেদের ধন্য মনে করত। ১৯৫৯ সালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। তিনি ইংরেজি সাহিত্যে পড়তে চাইলেও তার বাবার আগ্রহে তাকে মেডিকেলে ভর্তি হতে হয়। ১৯৬৫ সালে তিনি এমবিবিএস পাস করেন। পরে ১৯৭৩ সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য লন্ডনে যান। তিনি সেখান থেকে ১৯৮২ সালে মনোবিজ্ঞানে এমআরসি ডিগ্রী লাভ করে দেশে ফিরে আসেন।

এমবিবিএস পাস করার পর তিনি তৎকালীন পাকিস্তান বিমান বাহিনী মেডিকেল কোরে লেফটেন্যান্ট পদে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালে মক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সম্পূর্ন নয় মাস তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। ঢাকা এয়ারবেসের মেডিক্যাল সেন্টারে তিনি চিকিৎসা করেছেন সৈনিকদের এবং তাদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের। ১৯৭৩ সালে তিনি বিমানবাহিনীর চাকরি থেকে ইস্তেফা দিয়ে লন্ডন চলে যান এবং সেখানে কয়েকটি হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। লন্ডন থেকে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে দেশে এসে ১৯৮৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে মনোরোগ বিভাগে সহকারী প্রভাষক হিসাবে যোগ দেন। ১৯৮৯ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৯৩ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন ঢাকার মানসিক স্বাস্থ ইন্সটিটিউটের পরিচালক ও প্রভাষক। ১৯৯৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে অবসর নেন। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্য ও স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন হাসপাতালে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সাল থেকে তিনি ঢাকার বারডেম হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের প্রভাষক ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত আছেন।

তার প্রথম ছোটগল্প পরিবর্তন ১৯৫৪ সালে দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত হয়। ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তিনি নিয়মিত দৈনিক ইত্তেফাকের কচি কাঁচার আসরে লিখতেন। মাইকেল মধুসূদন কলেজে পড়াকালীন দৈনিক আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী ও গুলিস্তা পত্রিকায় তার লেখা গল্প, কবিতা প্রকাশিত হতো। গুলিস্তা পত্রিকায় লিখে তিনি পুরষ্কৃতও হয়েছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াকালীন লেখালেখির পাশাপাশি তিনি কলেজের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িয়ে পড়েন। এই সময়ে ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম শ্রেণীর পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন মেডিকেল জার্নালে তার লেখা ছাপা হতো। তার প্রথম উপন্যাস ১৯৬৮ সালে সচিত্র সন্ধানীতে প্রকাশিত হয়। তার সেই প্রেম সেই সময় ও বাজিকর উপন্যাসে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা বর্ণিত হয়েছে। নরক ও ফুলের কাহিনী উপন্যাসে লিখেছেন তার ছেলেবেলার কথা। বাড়ি ও বণিতা উপন্যাসে চিত্রায়িত হয়েছে মধ্যবিত্ত পরিবারের সামাজিক সমস্যা। উপন্যাস ছাড়া তিনি শিশুদের জন্য সাহিত্য রচনা করেছেন। ১৯৭৭ সালে ছানার নানার বাড়ি, বাবার সাথে ছানা (১৯৮৬), ছানা এবং মুক্তিযুদ্ধ (১৯৮৭), ১৯৯০ সালে তৃপ্তি, আবেদ হোসেনের জোৎস্না দেখা, ১৯৯২ সালে হাতছানি, আগুনের চমক এবং মুক্তিযোদ্ধার মা নামক শিশুতোষ গল্প ও উপন্যাসগুলি প্রকাশিত হয়।

তিনি ১৯৬২-৬৩ সালের দিকে সৈয়দ শামসুল হকের অনুপম দিন, শীত বিকেল, সম্রাটের ছবি, এক মহিলার ছবি, দেয়ালের দেশ পড়ে তার সাথে দেখা করার চেষ্টা করেন। তিন পয়সার জোসনা গল্পটি পড়ার পর তিনি সৈয়দ হককে চিঠি লিখেন। সৈয়দ হক এক মাস পর সেই চিঠির জবাব দেন। এরপর প্রতিনিয়তই তারা চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ করতে থাকেন। একদিন সৈয়দ হক তাকে ঢাকার গুলিস্তান সিনেমা হলের চিন-চাও রেস্তোরায় দেখা করতে বলেন। প্রথম সাক্ষাতে সৈয়দ হক তাকে উদ্দেশ্য করে একটি কবিতা লিখেন। তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তখন তারা ব্রিটিশ কাউন্সিলসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন। ১৯৬৫ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি সৈয়দ হকের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সৈয়দ হক ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ফুসফুসের কর্কটরোগ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এই দম্পতির দুই সন্তান। মেয়ে বিদিতা সৈয়দ হক একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষক। ছেলে দ্বিতীয় সৈয়দ হক একজন আইটি বিশেষজ্ঞ, গল্পকার ও গীতিকার। তিনি যুক্তরাজ্যের রিচমন্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টারন্যাশনাল ফিনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে এমবিএ পাস করেন।

ছোটগল্প
• পরিবর্তন (১৯৫৪)
• পারুলীর উড্ডয়ন
• হেলাল যাচ্চিল রেশমার সাথে দেখা করতে
• গলে যাচ্ছে ঝুলন্ত পদক
• অন্ধকারে যে দরোজা
• মানসিক সমস্যার গল্প
• শূন্যতার সাথে নৃত্য
• গুজরিপঞ্জম
• গ্রাম গঞ্জের গভীরে
• পূর্ণিমায় নখের আঁচড়
• সূর্য ওঠার গল্প

উপন্যাস

• তৃষিতা (১৯৭৬)
• সোনার হরিণ (১৯৮৩)
• সেই প্রেম সেই সময়
• বাজিকর
• জলনুড়ি
• তারাবাজি
• হাতছানি
• উদয় মিনাকে চায়
• অস্থিরতার কাল, ভালোবাসার সময়
• ভালোবাসার লাল পিঁপড়ে
• নরক ও ফুলের কাহিনী
• বাড়ি ও বনিতা
• গা শিরশির (২০১১)
• কার্নিশে ঝুলন্ত গোলাপ
• সেই ভাষণটি শোনার পর
• নিঃশব্দতার ভাঙচুর
• তাম্রচূড়ের লড়াই
• সেইসব দিন
• যোজন দূরের স্বজনেরা
• ঘুম
• খাদ
• আহত জীবন
• আকাশ ভরা
• দুই রমণী
• নারী : বিদ্রোহী
• সবুজ পশমি চাদর
• ব্যবহ্নতা
• আয়নার বন্দী
• নখ
• সন্দেহ
• ঘুমন্ত খেলোয়াড়
• রূপালী স্রোত
• চেমনআরার বাড়ি

কাব্যগ্রন্থ

• কিছু কি পুড়ে যাচ্ছে কোথাও
• তুমি আগে যাবে, না আমি
• স্বপ্নের ভেতর
• তুমি এক অলৌকিক বাড়িঅলা
• কাল খুব কষ্টে ছিলাম
• আমার শয্যায় এক বালিশ-সতীন

প্রবন্ধ
• নারীর কিছু কথা আছে
• কিশোর-কিশোরীর মন ও তার সমস্যা
• যেমন আমাদের জীবন
• ক্ষুব্ধ সংলাপ (২০১১)
• মেয়ে হয়েছি বেশ করেছি (২০১২)
• তোমার কথা
• পিকাসোর নারীরা

শিশুসাহিত্য
• ছানার নানার বাড়ি (১৯৭৭)
• বাবার সাথে ছানা (১৯৮৬)
• ছানা এবং মুক্তিযুদ্ধ (১৯৮৭)
• পথের মানুষ ছানা
• একজন মুক্তিযোদ্ধার ছেলে
• আমাদের মুক্তিযোদ্ধা দাদাভাই
• মন্টির বাবা
• তোমাদের জন্য এগারোটি
• উল্টো পায়ের ভূত
• আমি ম্যাও ভয় পাই
• আমি বাবাকে ভালোবাসি
• হানাদার বাহিনী জব্দ
• মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ছড়া
• ছোটখেলের বীর
• যেমন আমাদের জীবন
• সর্পরাজের যাদু
• আমার মা সবচেয়ে ভালো (২০০৮)
• তুমি এখন বড় হচ্ছো
• টুটুলের মা-গাছ
• উদাসী বালক
• তপনের মুক্তিযুদ্ধ
• কাঠের পা
• আগুনের চমক
• দশ রঙের ছড়া
• মুক্তিযুদ্ধের পাঁচটি উপন্যাস

অনুবাদ

• ল্যু সালোমে : সাহিত্যভুবনের অগ্নিশিখা (২০১২)

স্মৃতিকথা

• অবরুদ্ধ

ভ্রমণকাহিনী

• উড়ে যাই দূরে যাই

পুরস্কার ও সম্মাননা

• ভাষা ও সাহিত্যে একুশে পদক-২০১৯
• উপন্যাস শাখায় নৃ প্রকাশনী থেকে ছানা ও নানুজান-এর জন্য পাঞ্জেরী ছোটকাকু আনন্দ আলো শিশুসাহিত্য পুরস্কার-২০১৯
• উপন্যাসে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০১০
• কবীর চৌধুরী শিশুসাহিত্য পুরস্কার-২০০৭
• ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০০৬
• অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার
• মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার
• শিশু একাডেমি পুরস্কার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *