আমার বাবা আমার যিশু-০১

186 Views

Spread the love

সম্পাদকীয়

আনোয়ারা সৈয়দ হক—অতল আলো থেকে উদগত একটি রোদফুল—যিনি আমাদের শীতে ছড়িয়ে দেন তার রকমারি রোদের সৌরভ। আর আমরা সেই সৌরভে শীতে মুগ্ধ হই। প্রণোদিত হই। সুখি পালকের মতো বসন্তের বিপুল স্বপ্নে বিভোর হয়ে উড়ে বেড়াই। ফুড়ুৎফাড়াৎ করি অচেনার আকাশে-বাতাসে।

যতটুকু জানি তাকে—তার চেয়ে অধিক না। যতটা জেনেছি তাকে—তার চেয়ে অধিক জানাতে এসেছেন তিনি। এখানে জানবো তার সুদীর্ঘ জার্নি ও যাপনের জার্নাল। হয়তো অনেক আড়াল-আবডাল ছেড়ে কোনো এক বেগানা জীবনের জীবনী বয়ে তিনি উপস্থিত হচ্ছেন আমাদের সম্মুখে।

বেলাভূমি তার স্মৃতি-সমুদ্র থেকে আচড়ে পড়া সেইসব অসামান্য ঢেউ-সমূহের অজানা আলো-আঁধারি গদ্যগুলি ছাপাতে পেরে ধন্যবোধ করছে।


উৎসর্গ :

বেগম রিজিয়া খাতুন

প্রয়াত দেওয়ান মোস্তফা কামাল


লেখকের পূর্ব কথন :

করোনার অখণ্ড অবসর শুধু মাত্র হাতধোয়া আর কালোজিরা, লেবু, হলুদ, তুলসিপাতা আর নিম, আদা, মধু বা দারুচিনি ও হাজারও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা জড়িত বন্ধু ও আত্মীয় স্বজনের কণ্ঠস্বর দ্বারা মথিত ও উদ্বেলিত হবার পরেও হাতে থেকে যায় অঢেল ও অফুরন্ত সময়। এই দুটো হাত আর বন্ধু নয়। অচেনা এক অস্তিত্ব। এদের দূরে রাখাটাই এখন বেঁচে থাকার একটি প্রক্রিয়া।

তবে আমিইবা ছাড় দেবো কেন? এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে হাত দুটোকে একটু খাটিয়ে নিই না কেন? তা ছাড়া মরণেরও তো আর বেশি দেরি নেই। হয় করোনা, না-হয় করুণা—এ দুটোই এখন আমার জীবনের দিক-নির্দেশক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ফলে ‘আমার বাবা আমার যিশু’র জন্মগ্রহণ।

লেখার গতি ও ভঙ্গি খুব-ই যে এলোমেলো, খাপছাড়া এবং কখনওবা অপ্রাসঙ্গিক—তা বলাই বাহুল্য। তবে এটাকেই ধরে নিতে হবে আমার চেতনাপ্রবাহের একটি রূপরেখা হিসাবে। যখন যে কথা মনে উঠেছে। দেরি না করে তা স্মরণের পাতায় তুলে নিয়েছি। তাই অগোছালো এবং অপ্রাসঙ্গিকতার ভেতরেই আছে জীবনের বহমান ছন্দ এবং যাপিত জীবনের অভিনিবেশ। মূলত আমার জীবনকাহিনীর সঙ্গেই যেন আমার বাবা ওৎপ্রোতভাবে জড়িত।

আর দশটি বাবার মতো আমার বাবা অবশ্যই গতানুগতিক ছিলেন না। কিন্তু তিনি অসাধারণও কিছু ছিলেন না। তিনি ছিলেন তিনি। যিনি জীবনে আমাদের কাছে তাঁর সঠিক নামটি উচ্চারণ করে বলেন নি। তিনি তাঁর নিজের হাতের সিগনেচারে ছিলেন ‘গোলাম রফিকউদ্দিন চৌধুরী’। অথচ আমরা স্কুলের খাতায় সারাটা জীবন লিখে গেছি ‘গোলাম রফিউদ্দিন চৌধুরী’। আমাদের ম্যাট্রিক সার্টিফিকেটেও তাই। আমার সব ভাইবোনদের ম্যাট্রিক সার্টিফিকেটেও এই একই ‘গোলাম রফিউদ্দিন চৌধুরী’। নিজের নামটি ঠিকমতো সন্তানেরা যাতে উচ্চারণ করতে পারে ও লিখতে পারে, এ বিষয়েও ছিল তাঁর অনীহা বা উদাসীনতা। কিন্তু কেন? এর উত্তর আমার জানা নেই। বারোজন সন্তানের জনকের এই সাইকির ব্যাখ্যা দেওয়া এতদিন পরে আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়।

এই লেখাটাকে শুধু মাত্র একটি স্মৃতিকথা হিসাবে ধরলে আমি খুশি হবো।

আনোয়ারা সৈয়দ হক
এপ্রিল, ২০২০


আজ আমি এই করোনা অধ্যুষিত পৃথিবীর দ্রুত মানবসম্পদ লোপ পাওয়ার ভয়াবহ অশনি সঙ্কেতে আমার বাবার কথা লিখতে বসেছি। যদি এর পরে আর লেখার সুযোগ না থাকে! এই লেখা কে বা কারা পড়বে জানি না। আদৌ কেউ পড়বে কি না তাও জানি না। কিন্তু আমার আবেগ ধরে রাখবার জন্যেও লেখাটা আমাকে এখন লিখতে হবে। আমি চলে যাওয়ার পরেও এ পৃথিবী চলবে। কিন্তু আমার বাবাকে নিয়ে কেউ আর লিখবে না। কারণ আমার বাবা এমন কোনও নামকরা ব্যক্তি ছিলেন না যে তাঁকে নিয়ে কেউ লিখবে। এমনকি তিনি নিজেও চাইতেন না—কেউ তাঁকে নিয়ে কিছু লিখুক। বা এরকম লেখার কথা তাঁর মাথাতেই আসত না। ‘ইয়ে সব বকোয়াস বন্ধ করো’ বলে তিনি হটিয়ে দিতেন।

আমার বাবা ছিলেন ভীষণ রাগী একজন মানুষ। কিন্তু কেন যে এই রাগ, কীসে যে এই রাগ, আর কী করলে যে এই রাগের উপশম—আমরা ছোট মানুষ তা প্রায়শ বুঝতে পারতাম না। বাবার রাগের কারণে আমরা সব ভাইবোন সর্বক্ষণ যেন তটস্থ হয়ে থাকতাম। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল বাবার রাগ কখন যে চড়ে বসবে, আর বাবা কখন যে নরম মেজাজের থাকবেন—সেটা বোঝা আমার এবং আমার ভাইবোনদের পক্ষে একেবারেই সম্ভব ছিল না। ফলে সবসময়ই আমরা ক’ ভাইবোন আতঙ্কের ভেতরে থাকতাম। সেই আতঙ্কের কোনও সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব ছিল না।

বুকের ধুকপুকানি যেন সর্বদাই বুকটিকে একটি অশান্তির ভেতরে রাখত। বাবা বাড়ির দরজার কড়া নাড়ার আগেই আমরা যে যার জায়গায় সতর্ক হয়ে যেতাম। কিন্তু কেউ পারতপক্ষে বাবার সমানে যাওয়ার সাহস করতাম না। বরং দরজার ফাঁক দিয়ে বাবার গতিবিধি অনুসরণ করার দিকেই আমাদের ঝোঁক ছিল বেশি।

বাবা বাড়িতে যখন কারও ওপরে রাগ করতেন, তখন দরজার ফাঁকফোক দিয়ে বাবাকে লক্ষ্য করতাম। বাবার মুখ রাগে লাল হয়ে যেত। চোখের শাদা পর্দায় লালের ছিটাফোঁটা ভেসে উঠত। বড় বড় হয়ে উঠত চোখ। গলার স্বর পাড়া ছাড়িয়ে অন্য পাড়ায় চলে যেত। মানুষজন আপন মনে বলাবলি করত, ‘আজ ঘেনুয়া ভাইকো রাগ বহুত হো গিয়া!’

তখন তো প্রতিদিন বাবার কাছ থেকে মায়েদের বাজার খরচের টাকা নিতে হতো। সেই টাকায় তেল, মাছ, ডাল, সব্জি, ডিম বাড়িতে আসত। সেগুলো রান্না হতো। প্রতিদিনই রান্না হতো। আর প্রতিদিনই খাওয়া হতো। ফ্রিজ বলে কোনও বস্তু সেসময় ছিল না। এমনকি সিনেমাতেও কখনও ফ্রিজ চোখে দেখতাম না। তাই প্রতিদিন রান্না এবং বাজার করা ছিল তখনকার দিনে মায়েদের জন্যে অবধারিত একটি কাজ।

আমার বাবার ডাক নাম ছিল ঘ্যানা। ছেলেবেলায় অতিশয় ক্ষীণ দেহের অধিকারী হওয়ার জন্যে। যদিও যৌবনে ছিলেন তিনি সবল ও শালপ্রাংশু শরীরের অধিকারী। আমাদের পাড়ায় তখন সকলে দেশোয়ালি ভাষায় কথা বলত, যদিও বাঙালি পরিবেশেই ছিল তাদের সকলের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা।

আমার বাবা মেয়ে-সন্তান হওয়া পছন্দ করতেন না এবং মনের এই বিরূপ ভাব লুকিয়ে রাখতেও পছন্দ করতেন না। সরাসরি বলতেন। কিন্তু বাবার কপাল এমন খারাপের খারাপ যে আমার মায়ের পেট থেকে একের পর এক মেয়ে-সন্তান জন্ম নিত। এমনি হতে হতে ছ’ছ’টা মেয়ে-সন্তান! এই নিয়ে সংসারে অশান্তি লেগে থাকত। আমি ছোট হলেও এ ব্যাপারটা বেশ বুঝতে পারতাম এবং সেজন্যে কেন জানি না আমার নিজেকেই অপরাধী মনে হতো।

আমার একজন বড়মা ছিলেন। আমার বাবার প্রথম স্ত্রী। তিনি ছিলেন বাবার একটু দূর-সম্পর্কের মামাতো বোন। আমাদের বড়মা ছিলেন একেবারে মাটির মানুষ। বাবা যে তাঁকে সংসারে রেখেই পরবর্তী জীবনে বাবার ছেলেবেলার খেলার সাথী প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে আমার মা আসিয়া খাতুন চৌধুরীকে বিয়ে করেছেন। এতে করে তাঁর মনে যত দুঃখই থাক, বাইরে তার কোনও প্রকাশ কোনওদিন দেখি নি।

বড়মা আমাদের নিয়েই হেসে-খেলে দিন কাটাতেন। বরং আমার মা ছিলেন বড়মার ওপরে অনেক ব্যাপারে নির্ভরশীল। বিশেষ করে আমাদের কোনও প্রকারের অসুখ-বিসুখে আমাদের মা এমনভাবে ঘাবড়ে যেতেন যে তিনি সম্পূর্ণভাবেই আমাদের বড়মার ওপরে নির্ভর করতেন। আমাদের বড়মা আবার গাছ-গাছালির ব্যাপারে একজন বিশেষজ্ঞ ছিলেন বলা যায়। কোন গাছের শিকড় বেটে খাওয়ালে কোন অসুখ ভালো হবে, বা নিমপাতা কীভাবে বেঁটে ওষুধের মতো করে ব্যবহার করতে হবে, বা থানকুনি পাতা বা ঘৃত্যকুমারি বা অর্জুন গাছের ছাল কোন জঙ্গলে গিয়ে তুলে আনতে হবে—এসব বিষয়ে আমাদের বড়মা খুব অভিজ্ঞ একজন মানুষ ছিলেন।

আমাদের ভাইবোনদের জ্বরজারি হলে আমরা বড়মার কোলের ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নিতাম। কখনও হাত-পা কেটে ছড়ে গেলে, যা প্রায়ই আমাদের যেত, তখন বড়মার চুনহলুদের চিকিৎসার ওপরে নির্ভর করতে হতো আমাদের। তবে আমাদের মা-ও খুব আদর করতেন আমাদের। বাবা যেহেতু মেয়েদের ততটা পছন্দ করতে পারতেন না। তাই বাবার স্নেহ, মায়ের স্নেহ—এই দুই-স্নেহই মায়ের কাছ থেকে পেতাম। আর বড়মার কাছ থেকে যেটা পেতাম—সেটা ছিল ষোলো আনার ওপরে আঠারো আনা। বড়মা-ও আমাদের অনেক স্নেহ করতেন। আমাদের বড়মার গর্ভে কখনও কন্যা সন্তান জন্ম নেয় নি। সর্বদাই তাঁর গর্ভে পুত্র-সন্তান জন্ম নিয়েছিল। তাঁর প্রথম সন্তান আমাদের নজরুল ভাইয়া। কবি নজরুল ইসলামের নামে নাম রেখেছিলেন আমার বাবা। সেই ভাইটি অকালে মারা গিয়েছিল।

আমাদের বাবা যদি বাড়িতে না থাকতেন তো আমরা খুব সুখেই কাল কাটাতাম। কোনও কোনও সময় অবশ্য খুব কষ্ট হতো। আমাদের বাবা হঠাৎ করে রাগ করে বাড়ি ছেড়ে কোথাও চলে গেলে তখন আমাদের খাওয়ার কষ্ট হতো। বাবা বাড়িতে নেই। কে আমাদের বাজার খরচ দেবে? তখন তো প্রতিদিন বাবার কাছ থেকে মায়েদের বাজার খরচের টাকা নিতে হতো। সেই টাকায় তেল, মাছ, ডাল, সব্জি, ডিম বাড়িতে আসত। সেগুলো রান্না হতো। প্রতিদিনই রান্না হতো। আর প্রতিদিনই খাওয়া হতো। ফ্রিজ বলে কোনও বস্তু সেসময় ছিল না। এমনকি সিনেমাতেও কখনও ফ্রিজ চোখে দেখতাম না। তাই প্রতিদিন রান্না এবং বাজার করা ছিল তখনকার দিনে মায়েদের জন্যে অবধারিত একটি কাজ।

শুধু বাড়িতে মাসকাবারি চাল, মুড়ি, চিড়ে, চিনি এবং গুড়ের অবস্থান সর্বদাই চোখে দেখেছি এবং আমার ছেলেবেলার একটি লাক্সারি এই ছিল যে আমি কাঁসার গেলাসে ভর্তি করে টিউবওয়েলের ঠান্ডা পানি ভরে তার ভেতরে ইচ্ছেমতো চিনি বা গুড় মিশিয়ে তার ওপরে পুরু করে মুড়ি ভাসিয়ে রান্নাঘরের একটি খালি কুলুঙ্গির ওপরে পা তুলে আয়েস করে বসে টুকটুক করে সিপ করতাম আর মনেমনে নিজেকে কোনও বড় হোটেলের লাউঞ্জে বসে আছি এবং সরবত খাচ্ছি—এরকম একটি কল্পনায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে পারতাম!

আমি রাতদিন বই পড়ি বলে আমার খুব সুনাম ছিল। শরবত খাই বা না খাই আমার হাতে সর্বদাই বই থাকতে হবে। এছাড়া আমার যেন অন্য কোনও অস্তিত্ব নেই। এরকম একটি ইমেজ আমি বেশ ছেলেবেলা থেকেই গড়ে তুলতে পেরেছিলাম। এজন্যে বহু গোপন পাপ কাজ থেকে আমি নিস্তার পেয়ে যেতাম।

সেই সঙ্গে হাতে থাকত একটা গল্পের বই। সে বইটি হয়তো এর আগে অনেকবার পড়া হয়েছে কিন্তু তাতে কী? নতুন-নতুন বই কে আমাকে কিনে দেবে? তাই একবার করে পড়া গল্পের বই বারবার করে পড়েই বড় আনন্দ পেতাম!

তবে বাবা হঠাৎ করে দুই স্ত্রী ফেলে, সংসার ফেলে চলে গেলে আমার লাক্সারি ঠিকমতো চললেও—অর্থাৎ মুড়ি মিশ্রিত গুড়ের বা চিনির শরবত চললেও মায়েদের চলত না। তাঁরা বড় বেশি ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠতেন। একগাদা ছোট-ছোট ছেলেমেয়ে। তার ওপরে আমার ছোট ভাই স্বপনের আবার বড় সাইজের মাছ বা ডিম বা মাংস না হলে ভাত খেতে রুচি হয় না। সে-এক ভীষণ কাণ্ড হয়ে যেত তখন। আমার পিঠাপিঠি ভাই নয়ন তো মাংস ছাড়া ভাতে হাতই দেবে না। অথচ স্কুল থেকে ফিরে আমরা তখন মাঝে মাঝে ভাতও পেতাম না। চাল হঠাৎ করে খরচ হয়ে গেছে বলে! তখন উপায় কি?

উপায় অবশ্যই আছে। আমাদের বড়মার বুদ্ধির কাছে সবকিছু হার মেনে যাবে। আমাদের বড়মা সুন্দর করে চালভাজা, তিলের নাড়ু, মুড়িভাজা, চিড়াভাজা করে রাখতেন। আমরা খুশিমনে তা খেতাম। তারপর যদি বাবা সংসার ছেড়ে আরও বেশিদিন উধাও হয়ে যেতেন তো আমাদের মায়ের বাঁশব্যাংক দাঁ দিয়ে কুপিয়ে কাটা হতো। বাঁশব্যাংক মানে বাজারের পয়সা বাঁচিয়ে মা এবং বড়মা বাঁশের খুঁটির গায়ে ছিদ্র করে সেই ছিদ্রে পয়সা জমিয়ে রাখতেন। ছিদ্র ভরে গেলে আবার একটা খুঁটি কেটে তার ভেতরে আবার পয়সা জমিয়ে রাখতেন। এসবই হতো আমাদের বাবার চোখের আড়ালে।

বাবা বেশিদিনের জন্যে অনুপস্থিত থাকলে সেই বাঁশব্যাংক কেটে পয়সা বের করে বাজার করা হতো। চার আনার সরষের তেল, দুইসের চাল, একসের আলু, আধাপোয়া মুসুরির ডাল, একসের দুধ কিনে আনা হতো।

বাজার থেকে এসব কে কিনে আনত? কে আবার। আমি। আমাদের তো কোনও বড় ভাই ছিল না। নজরুল ভাইয়া তো ছেলেবেলাতেই মারা গেছে। তো আমিই সব কিনে আনতাম। কুলুঙ্গির ওপর থেকে তখন আমাকে নামতে হতো। আমি রাতদিন বই পড়ি বলে আমার খুব সুনাম ছিল। শরবত খাই বা না খাই আমার হাতে সর্বদাই বই থাকতে হবে। এছাড়া আমার যেন অন্য কোনও অস্তিত্ব নেই। এরকম একটি ইমেজ আমি বেশ ছেলেবেলা থেকেই গড়ে তুলতে পেরেছিলাম। এজন্যে বহু গোপন পাপ কাজ থেকে আমি নিস্তার পেয়ে যেতাম।

বাড়ি ফেরার পথে তিনি বাজার করে নিয়ে আসছেন। তাঁর পেছন-পেছন বাজারের মেছো মাছ নিয়ে আসছে। ওসমান বিহারি খাসির মাংস নিয়ে আসছে। তরকারিঅলা তরকারির ডালাসহ নিয়ে আসছে। চালের বস্তা ঘাড়ে করে আনছে দুজন। যতসব এলাহি কাণ্ড!

তো বাজারে কে যাবে? আমার বড় বোন রিজিয়া খাতুন? না। কারণ সে তখন শরীরে বড় হয়ে গেছে। তার বুকের দিকে কোনও লুচ্চা চোখ ফেলে তাকাতে পারে। তাহলে তাতে আমার বোনের অপমান হবে। সুতরাং সে অবশ্যই বাজারে যাবে না। আমার ছোট ভাই নয়নও যাবে না, সে পয়সা হিসাব করতে শেখে নি। আরগুলো আরও ছোট। সুতরাং বাজারে যাব আমি। যে তখনও মেয়ে-মানুষ হয়ে ওঠে নি!

তো আমিই যেতাম বাজারে। মায়েরা লিস্ট করে আমার হাতে ফর্দ ধরিয়ে দিতেন। বারবার করে বলে দিতেন। যেন আমি একটু আলাভোলা বলে  কেউ আমাকে ঠকাতে না পারে। কারণ মায়েরা এইটুকু জানতেন যে যারা ছেলেবেলা থেকে ভীষণ ভাবে, বই পড়ুয়া, তারা একটু আলাভোলা হয়। কিন্তু আমার মায়েরা আমকে চিনতেন না! বস্তুত কোনওদিন চিনতে পারেন নি। কারণ কোনওদিন তারা টের পান নি যে তাঁদের সেই বাঁশের খোলে জমানো পয়সা থেকে আমার পার্সেন্টেজ আমি ঠিকই তুলে নিতাম!

চার আনার তেলের জায়গায় চৌদ্দ পয়সার তেল, একপোয়া ডালের জায়গায় সাড়ে তিন ছটাক মুসুরের ডাল। মসলাপাতিও ছিল সব হিসেব কষা। কারণ আমাকেও বাঁচতে হবে! বিকালবেলা একটু চানাচুর ভাজা না খেলে জীবনটা কেমন যেন খালিখালি লাগে! আবার একটা রূপকথার বই বাজারের বইয়ের দোকানে মলাট মেলানো অবস্থায় পড়ে আছে বিগত ক’দিন ধরে। বাইরে থেকে শুধু প্রচ্ছদই দেখছি। ভেতরে দেখার মতো সাহস নেই। যেহেতু কিনে সেটা দেখতে হবে, তার জন্যেও চৌদ্দ আনা পয়সা দরকার। সে ভীষণ রকমের এক দাম কিন্তু বইটি না কিনলেই নয়। রোজরাতে আমি শুধু বইটির প্রচ্ছদ মনে-মনে বুকে ধরে ঘুমিয়ে থাকি। কেউ নেই আমাকে বইটি কিনে দেয়। সুতরাং আমাকেই কিনতে হবে।

এরপর একদিন। হয়তো তিনদিন বা সাতদিন। কখনও সাতদিনের বেশি নয়। হুম-হাম শব্দ করতে করতে আমাদের বাবার আগমন ঘটে। হুম-হাম শব্দটা কীসের? কারণ আমার বাবা ভালো করে জানেন যে তিনি যেদিন বাড়ি ছেড়েছিলেন, সেদিন বাড়িতে বাজার করা হয় নি এবং বাড়িতে তাঁর দুইঘর মিলিয়ে আটটি বাচ্চা ও দুজন স্ত্রী অপেক্ষা করে আছেন। তাই বাড়ি ফেরার পথে তিনি বাজার করে নিয়ে আসছেন। তাঁর পেছন-পেছন বাজারের মেছো মাছ নিয়ে আসছে। ওসমান বিহারি খাসির মাংস নিয়ে আসছে। তরকারিঅলা তরকারির ডালাসহ নিয়ে আসছে। চালের বস্তা ঘাড়ে করে আনছে দুজন। যতসব এলাহি কাণ্ড!

ছেলেবেলা থেকেই আমার মনে এই হতো যে আমাদের দালান বাড়িতে সর্বদাই একটি কালো শকুন তার একটি ভাঙা ডানা আমাদের বাড়ির ছাদের কার্নিশে মেলে রেখেছে! এরকমের একটি বাড়িতে যে যার মতো বেঁচে থাকার উপায় খুঁজে নিয়েছিল।

সেদিন বাড়ি ফিরে এসে বাবার মেজাজ খোশ। কিন্তু আমরা মনে-মনে খাবার দেখে খুশি হলেও সেরকম খোশ না। কারণ কখন আবার বাবার রাগ শুরু হয়ে যাবে—তো ভরা ভাতের থালা উঠোনে টান মেরে ফেলে তিনি বাড়ি ছেড়ে বাইরে চলে যাবেন। আবার কবে বাড়ি ফিরবেন তা কে জানে?

ফলে ছেলেবেলা থেকেই আমার মনে এই হতো যে আমাদের দালান বাড়িতে সর্বদাই একটি কালো শকুন তার একটি ভাঙা ডানা আমাদের বাড়ির ছাদের কার্নিশে মেলে রেখেছে! এরকমের একটি বাড়িতে যে যার মতো বেঁচে থাকার উপায় খুঁজে নিয়েছিল। আমি ছিলাম বইয়ের রাজ্যে, আমার বড় বোনটি ছিল নিরীহ এবং গোপনে প্রসাধনের দিকে মনোযোগী। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চুলের সিঁথি কাটা চলছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে মুখের প্রসাধন চলছে। মা যদি রাগ করে তার হাত থেকে আয়না কেড়ে নিচ্ছেন তো সে গোপনে বালতির পানির ছায়ায় মুগ্ধ হয়ে নিজের চেহারা দেখছে তো দেখছেই। আমি তার দিকে হা করে তাকিয়ে আছি দেখে রাগ করে গোপনে আমাকে মুখ-ঝামটা দিচ্ছে। আমার পিঠাপিঠি ভাই নয়ন এসবের ভেতরে নেই। সে ডান্ডাগুলি নিয়ে সেই কাকাভোরে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। বড়মার ছেলেরা আমার ছোট দুই ভাই। দুজনেই কাদামাটি মেখে আপন মনে খেলছে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হচ্ছে। তারা আপন মনে খেলছেই। আমার বোন শিলু বা সহিদা চৌধুরী সেই সকালেই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে দড়াটানার দিকে। ওখানে একটা ফটোর দোকান আছে। সেই দোকানে ছিপ ফেলে বসে আছে। সে কখন দোকানি বিনা পয়সায় তাকে একটা শাদা-কালো ফটো তুলে দেবে!

আর যদি সে বাড়ি ছেড়ে কোনওদিন না-ও যায়। তাহলে ভোর থেকে সে কলের পাড়ে গিয়ে একভাবে টিউবওয়েল টিপে বালতির ভেতরে পানি ভরতে থাকছে। বালতি ভরে গেলে সেই বালতি শানের ওপরে ঢেলে খালি করে আবারও পানি ভরতে থাকছে। তারপর বালতি আবারও ভরে গেলে আবারও খালি করে আবার ভরে। এরকম সারাদিন। মানা করলেও শোনে না। তার নাকি টিউবওয়েল টিপতে ভালো লাগে!

রাতে শিলুর ঘুমোবার অবস্থাও অভিনব। সে তার বিছানায় বা বিছানার অংশটুকুতে রাতের বেলা আশ্রয় শোবার আগে তাকে কিছু রিচ্যুয়াল সারতে হয়। আর সেটা হলো—সে তার ঘুমোবার কাঁথাখানা কলের পাড়ে নিয়ে গিয়ে বেশ ভালোমতো বালতির পানিতে চুবিয়ে নিয়ে সেটি টানতে টানতে তার শোবার জায়গায় নিয়ে আসে। তারপর সেই ভেজা কাঁথা বেশ ভালো করে গায়-মাথায় জড়িয়ে তার শোবার নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে চুপ করে ঘুমিয়ে পড়ে! তাতে গালি দিলে বা মারলেও কোনও লাভ হয় না। এ ব্যাপরে সে অত্যন্ত দৃঢ় এবং একরোখা।

শিলুর ছোট টুনটুনি। ভালো নাম ফাতেমা চৌধুরী। ঘুম থেকে উঠে আপন মনে বসে বুড়ো আঙুল চুষছে। আঙুল চুষতে চুষতে সরু হয়ে গেছে কিন্তু তার চোষার বিরাম নেই। সে অত্যন্ত নিরীহ স্বভাবের মানুষ। কারও সাতে নেই, পাঁচেও নেই। কিন্তু ঘরের কোণে বসে চোখ চালিয়ে সে সবকিছুই নিরীক্ষণ করে। তার কারণ বাড়িতে কোনও হৈচৈ হলে সে তার জায়গা থেকে না নড়লেও বা মুখে কিছু না বললেও তার মুখে অশান্তির ছায়া পড়ে। তার কপালে হিজিবিজি ঘাম দেখা যায়।

স্বপন আমাদের বড়মার পেছনে সকাল থেকে ঘুরঘুর করছে কিছু খাওয়ার জন্যে। ‘ও মামু, আমার খিদে লেগেছে। ও মামু, আমি খাবো।’এই স্বপনকে নিয়ে আমার বড়মার অনেক জ্বালা। রাতের বেলা প্রায় তার বাথরুম পায় আর বেচারি বড়মাকেই ঘুম থেকে উঠে তাকে বাইরে নিয়ে যেতে হয়। আমাদের বড়মাকে সে তখনও বড়মা বলে ডাকতে পারে না। তাই মামু বলে ডাকে।

আবার আমাদের একটা বাথরুম। সেটা অনেক দূরে। রাতের বেলা সেখানে ভূতপেত্নীদের জমজমাট আসর বসে। সুতরাং আমরা রাতে পেসাবের জ্বালায় মরে গেলেও, পেসাবে বিছানা ভিজিয়ে ফেললেও কেউই বিছানা ছেড়ে উঠবো না। কারণ, সেই বয়সেই আমরা জেনে গেছি—সাবধানীরাই বেঁচে থাকে। তবে সকালে উঠে আমরা কেউই স্বীকার করবো না—বিছানা ভেজানোর দায়টা আমার—না নয়নের—না শিলুর—না টুনটুনির। হাজার মার খেলেও না। মারতে মারতে মেরে ফেললেও না! এইভাবে আমি আমার ছোট ভাই নয়নকে কতদিন বাবার হাতে মার খাইয়েছি। যেখানে প্রকৃতপক্ষে আমিই ছিলাম আসল কালপিট! বেঁচে থাকার জন্যে মানুষকে অনেকিছু করতে হয়!

আর এদিকে আমাদের মা সর্বক্ষণই রান্নাঘরে। কী তিনি রান্না করতেন? কেন সরাক্ষণ তিনি রান্নাঘরে? এখন আর মনে নেই। আর আমি দিনের বেলা স্বার্থপরের মতো সর্বদাই আমার রান্নাঘরের খালি কুলুঙ্গির ভেতরে অথবা ছোট্ট পড়ার ঘরের হাতাভারি কোনও চেয়ারে বইমুখো হয়ে।

যে বাড়ির বাবা এত রাগি। আর যার এতগুলো আন্ডাবাচ্চা। আর যার দু-দুটো স্ত্রী। তার সংসার এরকম ছ্যারাব্যারা হবে না তো আর কার হবে? দুনিয়ার মানুষেরা তো একটি সংসারই সামলে উঠতে পারে না!

 


আনোয়ারা সৈয়দ হক

১৯৪০ সালের ৫ নভেম্বর যশোর জেলার চুড়িপট্টি গ্রামে এক মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা গোলাম রফিকউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন একজন ব্যবসায়ী ও মা আছিয়া খাতুন একজন গৃহিণী। তার বাবা খুবই ধার্মিক মানুষ ছিলেন। তাকে ছোটবেলায় কঠিন পর্দা ও অন্যান্য ইসলামী শরিয়ত মেনে চলতে হতো। তার শৈশব ও কৈশোর কাটে যশোরে।

তার পাঠদানের হাতেখড়ি হয় মায়ের কাছে। চুড়িপট্টির মোহনগঞ্জ প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। মধুসূদন তারাপ্রসন্ন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক ও ১৯৫৮ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত স্কুল ও কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। কলেজ গ্রন্থাগারে প্রচুর বই থাকলেও তিনি তা অধ্যয়নের সুযোগ পান নি। সে সময়ে শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবই পড়ারই সুযোগ পেত। তাই মাঝে মাঝে উপন্যাস, ম্যাগাজিন ও অন্যান্য সাহিত্য পেলে তারা নিজেদের ধন্য মনে করত। ১৯৫৯ সালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। তিনি ইংরেজি সাহিত্যে পড়তে চাইলেও তার বাবার আগ্রহে তাকে মেডিকেলে ভর্তি হতে হয়। ১৯৬৫ সালে তিনি এমবিবিএস পাস করেন। পরে ১৯৭৩ সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য লন্ডনে যান। তিনি সেখান থেকে ১৯৮২ সালে মনোবিজ্ঞানে এমআরসি ডিগ্রী লাভ করে দেশে ফিরে আসেন।

এমবিবিএস পাস করার পর তিনি তৎকালীন পাকিস্তান বিমান বাহিনী মেডিকেল কোরে লেফটেন্যান্ট পদে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালে মক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সম্পূর্ন নয় মাস তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। ঢাকা এয়ারবেসের মেডিক্যাল সেন্টারে তিনি চিকিৎসা করেছেন সৈনিকদের এবং তাদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের। ১৯৭৩ সালে তিনি বিমানবাহিনীর চাকরি থেকে ইস্তেফা দিয়ে লন্ডন চলে যান এবং সেখানে কয়েকটি হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। লন্ডন থেকে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে দেশে এসে ১৯৮৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে মনোরোগ বিভাগে সহকারী প্রভাষক হিসাবে যোগ দেন। ১৯৮৯ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৯৩ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন ঢাকার মানসিক স্বাস্থ ইন্সটিটিউটের পরিচালক ও প্রভাষক। ১৯৯৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে অবসর নেন। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্য ও স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন হাসপাতালে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সাল থেকে তিনি ঢাকার বারডেম হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের প্রভাষক ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত আছেন।

তার প্রথম ছোটগল্প পরিবর্তন ১৯৫৪ সালে দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত হয়। ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তিনি নিয়মিত দৈনিক ইত্তেফাকের কচি কাঁচার আসরে লিখতেন। মাইকেল মধুসূদন কলেজে পড়াকালীন দৈনিক আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী ও গুলিস্তা পত্রিকায় তার লেখা গল্প, কবিতা প্রকাশিত হতো। গুলিস্তা পত্রিকায় লিখে তিনি পুরষ্কৃতও হয়েছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াকালীন লেখালেখির পাশাপাশি তিনি কলেজের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িয়ে পড়েন। এই সময়ে ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম শ্রেণীর পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন মেডিকেল জার্নালে তার লেখা ছাপা হতো। তার প্রথম উপন্যাস ১৯৬৮ সালে সচিত্র সন্ধানীতে প্রকাশিত হয়। তার সেই প্রেম সেই সময় ও বাজিকর উপন্যাসে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা বর্ণিত হয়েছে। নরক ও ফুলের কাহিনী উপন্যাসে লিখেছেন তার ছেলেবেলার কথা। বাড়ি ও বণিতা উপন্যাসে চিত্রায়িত হয়েছে মধ্যবিত্ত পরিবারের সামাজিক সমস্যা। উপন্যাস ছাড়া তিনি শিশুদের জন্য সাহিত্য রচনা করেছেন। ১৯৭৭ সালে ছানার নানার বাড়ি, বাবার সাথে ছানা (১৯৮৬), ছানা এবং মুক্তিযুদ্ধ (১৯৮৭), ১৯৯০ সালে তৃপ্তি, আবেদ হোসেনের জোৎস্না দেখা, ১৯৯২ সালে হাতছানি, আগুনের চমক এবং মুক্তিযোদ্ধার মা নামক শিশুতোষ গল্প ও উপন্যাসগুলি প্রকাশিত হয়।

তিনি ১৯৬২-৬৩ সালের দিকে সৈয়দ শামসুল হকের অনুপম দিন, শীত বিকেল, সম্রাটের ছবি, এক মহিলার ছবি, দেয়ালের দেশ পড়ে তার সাথে দেখা করার চেষ্টা করেন। তিন পয়সার জোসনা গল্পটি পড়ার পর তিনি সৈয়দ হককে চিঠি লিখেন। সৈয়দ হক এক মাস পর সেই চিঠির জবাব দেন। এরপর প্রতিনিয়তই তারা চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ করতে থাকেন। একদিন সৈয়দ হক তাকে ঢাকার গুলিস্তান সিনেমা হলের চিন-চাও রেস্তোরায় দেখা করতে বলেন। প্রথম সাক্ষাতে সৈয়দ হক তাকে উদ্দেশ্য করে একটি কবিতা লিখেন। তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তখন তারা ব্রিটিশ কাউন্সিলসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন। ১৯৬৫ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি সৈয়দ হকের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সৈয়দ হক ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ফুসফুসের কর্কটরোগ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এই দম্পতির দুই সন্তান। মেয়ে বিদিতা সৈয়দ হক একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষক। ছেলে দ্বিতীয় সৈয়দ হক একজন আইটি বিশেষজ্ঞ, গল্পকার ও গীতিকার। তিনি যুক্তরাজ্যের রিচমন্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টারন্যাশনাল ফিনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে এমবিএ পাস করেন।

ছোটগল্প
• পরিবর্তন (১৯৫৪)
• পারুলীর উড্ডয়ন
• হেলাল যাচ্চিল রেশমার সাথে দেখা করতে
• গলে যাচ্ছে ঝুলন্ত পদক
• অন্ধকারে যে দরোজা
• মানসিক সমস্যার গল্প
• শূন্যতার সাথে নৃত্য
• গুজরিপঞ্জম
• গ্রাম গঞ্জের গভীরে
• পূর্ণিমায় নখের আঁচড়
• সূর্য ওঠার গল্প

উপন্যাস

• তৃষিতা (১৯৭৬)
• সোনার হরিণ (১৯৮৩)
• সেই প্রেম সেই সময়
• বাজিকর
• জলনুড়ি
• তারাবাজি
• হাতছানি
• উদয় মিনাকে চায়
• অস্থিরতার কাল, ভালোবাসার সময়
• ভালোবাসার লাল পিঁপড়ে
• নরক ও ফুলের কাহিনী
• বাড়ি ও বনিতা
• গা শিরশির (২০১১)
• কার্নিশে ঝুলন্ত গোলাপ
• সেই ভাষণটি শোনার পর
• নিঃশব্দতার ভাঙচুর
• তাম্রচূড়ের লড়াই
• সেইসব দিন
• যোজন দূরের স্বজনেরা
• ঘুম
• খাদ
• আহত জীবন
• আকাশ ভরা
• দুই রমণী
• নারী : বিদ্রোহী
• সবুজ পশমি চাদর
• ব্যবহ্নতা
• আয়নার বন্দী
• নখ
• সন্দেহ
• ঘুমন্ত খেলোয়াড়
• রূপালী স্রোত
• চেমনআরার বাড়ি

কাব্যগ্রন্থ

• কিছু কি পুড়ে যাচ্ছে কোথাও
• তুমি আগে যাবে, না আমি
• স্বপ্নের ভেতর
• তুমি এক অলৌকিক বাড়িঅলা
• কাল খুব কষ্টে ছিলাম
• আমার শয্যায় এক বালিশ-সতীন

প্রবন্ধ
• নারীর কিছু কথা আছে
• কিশোর-কিশোরীর মন ও তার সমস্যা
• যেমন আমাদের জীবন
• ক্ষুব্ধ সংলাপ (২০১১)
• মেয়ে হয়েছি বেশ করেছি (২০১২)
• তোমার কথা
• পিকাসোর নারীরা

শিশুসাহিত্য
• ছানার নানার বাড়ি (১৯৭৭)
• বাবার সাথে ছানা (১৯৮৬)
• ছানা এবং মুক্তিযুদ্ধ (১৯৮৭)
• পথের মানুষ ছানা
• একজন মুক্তিযোদ্ধার ছেলে
• আমাদের মুক্তিযোদ্ধা দাদাভাই
• মন্টির বাবা
• তোমাদের জন্য এগারোটি
• উল্টো পায়ের ভূত
• আমি ম্যাও ভয় পাই
• আমি বাবাকে ভালোবাসি
• হানাদার বাহিনী জব্দ
• মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ছড়া
• ছোটখেলের বীর
• যেমন আমাদের জীবন
• সর্পরাজের যাদু
• আমার মা সবচেয়ে ভালো (২০০৮)
• তুমি এখন বড় হচ্ছো
• টুটুলের মা-গাছ
• উদাসী বালক
• তপনের মুক্তিযুদ্ধ
• কাঠের পা
• আগুনের চমক
• দশ রঙের ছড়া
• মুক্তিযুদ্ধের পাঁচটি উপন্যাস

অনুবাদ

• ল্যু সালোমে : সাহিত্যভুবনের অগ্নিশিখা (২০১২)

স্মৃতিকথা

• অবরুদ্ধ

ভ্রমণকাহিনী

• উড়ে যাই দূরে যাই

পুরস্কার ও সম্মাননা

• ভাষা ও সাহিত্যে একুশে পদক-২০১৯
• উপন্যাস শাখায় নৃ প্রকাশনী থেকে ছানা ও নানুজান-এর জন্য পাঞ্জেরী ছোটকাকু আনন্দ আলো শিশুসাহিত্য পুরস্কার-২০১৯
• উপন্যাসে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০১০
• কবীর চৌধুরী শিশুসাহিত্য পুরস্কার-২০০৭
• ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০০৬
• অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার
• মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার
• শিশু একাডেমি পুরস্কার


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *