আল মাহমুদ—স্বতন্ত্রধারার কবি

214 Views

Spread the love


এজরা পাউন্ড সততার সিদ্ধ শব্দকে খুঁজে পেয়েছিলেন মধ্য ইউরোপের লোককাহিনীর মধ্যে। রোমাঞ্চ যুগের থ্রবাদুরদের প্রাচীন গাথাকাব্যে। আর জীবনানন্দ পরবর্তী বাংলা কবিতায় আল মাহমুদ সেই ভাষাকে পেয়েছিলেন গ্রামীণ বাংলার লোকসমাজে


এখানে কবি হতে আসবে অনেকেই; কিন্তু কবিতা লিখবে কিছু মানুষ—পরবর্তীতে আমরা যাদের কবি বলে জানবো। তাঁরা মেঘের আঁচল ধরে হাঁটতে হাঁটতে অস্থিত্ব স্থাপন করেন ঊষার দুয়ারে; নিজেকে নির্মাণে-বিনির্মাণে করে তুলেন প্রতিসরণ। সেখানে উত্তরপ্রজন্ম নিজেকে পায় অভিনবত্বে। তাঁর আলো-বাতাসে পৃথিবী, সমাজ নিজেকে সাজাতে পারে নতুন আবহে। নতুন মৃত্তিকায় সুগম হয় তাদের পথচলা। এই পৃথিবী, মনুষ্য পৃথিবী ছাড়িয়ে কবিরাই রচনা করে থাকেন নিজস্ব মননশীল প্রতিপৃথিবী। তাদের জল, বাতাস ও মৃত্তিকা তাদের মনে, বাইরেও। এর কার্যকারিতা ঘটে সৃজনশীলতার মাধ্যমে। এই নির্মাণ কবির জন্য তখনই হয়ে উঠে—যখন সত্যিকার অর্থে প্রায় প্রতিদিনের ভাষাকে ভিন্ন স্বরে অনুভব করতে পারেন। যা বির্বতনের পায়ে গতিশীল। আর বির্বতনকে বর্জন করা কারুর পক্ষে সম্ভব নয়, কেননা সময়ের চাকায় পৃথিবী বদলাচ্ছে। এবং নৈসর্গিক চেতনাই সকল চেতনার উৎসারক। কারণ এখানেই লুকিয়ে আছে সকল চেতনা। নিসর্গের পালাবর্তনে ধমনিত নতুনতর কণ্ঠধ্বনি উচ্চারণ করেন, এমন কবির সংখ্যা সীমিত।

যারা পারেন, তাঁরা শব্দকে অনুসন্ধান করে অভিনবত্বে উচ্চারণ করেন নগরজীবনে অথবা পল্লীবাংলায়। যার কারণে এজরা পাউন্ড সততার সিদ্ধ শব্দকে খুঁজে পেয়েছিলেন মধ্য ইউরোপের লোককাহিনীর মধ্যে। রোমাঞ্চ যুগের থ্রবাদুরদের প্রাচীন গাথাকাব্যে। আর জীবনানন্দ পরবর্তী বাংলা কবিতায় আল মাহমুদ সেই ভাষাকে পেয়েছিলেন গ্রামীণ বাংলার লোকসমাজে এবং তাদের ইসলামগন্ধী জীবনাচারে। কিন্তু দুঃখজনক কথা হলো ঊনবিংশ শতাব্দিতে আমাদের বাংলা কবিতা নগরবন্দি হয়ে পড়ে।

মধ্যযুগের শেষ প্রান্তের কবি ভারতচন্দ্রও নাগরিক কবি ছিলেন। যার কারণে প্রমথ চৌধুরী তাঁর নাম দিয়েছিলেন কৃষ্ণ নাগরিক। এর পরেও ভারতচন্দ্র মানুষের আর্তিকে বোঝতে সক্ষম হয়েছিলেন। ভারতচন্দ্রের পর ঈশ্বরগুপ্ত নাগরিককৌশল, কৌতূহল এবং বিদ্রুপ নিয়ে উপস্থিত হলেন। এরপর এলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি কবিতার বিশিষ্ট একটি শিল্পপ্রকরণ গড়ে তুললেন। তাঁর সময়েই বাংলা কবিতা প্রবলভাবে নাগরিক চেতনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নগরজীবনের ভেতর খুঁজে পান গ্রামবাংলাকে। মূলত এই নগরাশ্রিত কবিরাই ছিল আধুনিক কবিতার সূচক। কিন্তু জীবনানন্দ দাশ তার রূপসী বাংলায় তুলে এনেছেন যে গ্রামীণ বাংলার চিত্র এবং কবি জসীম উদ্দীন তার কবিতায় পল্লী বাংলার যেই রূপ-রেখা এঁকেছিলেন। কবি আল মাহমুদ তাদের ধারাবাহিকতায় গ্রামবাংলার ভিতর হাঁটতে হাঁটতে নিজেকে এককভাবে তুলে এনেছেন জীবনানন্দ পরবর্তী উত্তরআধুনিক কবিতায়। কবি আল মাহমুদের সময়টাতে বাংলা কবিতা তৎসম-তদ্ভব ও নাগরিক কাব্যভাষার অক্টোপাসে সংকীর্ণ হয়ে আসছিল। যে—কথাটি পূর্বে এক প্রবন্ধে বলেছিলাম। কবি জসীম উদ্দীন মূলত প্রেমের ভেতর, গ্রামীণ বাংলার লোকাচারের ভেতর এবং গ্রাম্য সমাজের প্রাচীন সংস্কৃতির ভেতর পল্লী বাংলাকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁর দেখাটা জীবনঘনিষ্ঠ চিত্রমাত্র। তাঁর কাহিনী-কাব্য নকশী কাঁথার মাঠে তা পর্যবসিত হয়েছে। সেখানে পুরো একটি গ্রামীণ জীবন ও তাদের সভ্যতাকে তিঁনি ফুটিয়ে তুলেছেন কবিতায়। গ্রামীণ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, যার মাধ্যমে তারা পুরো বাংলায় অন্ন যোগান দিয়ে থাকেন। খরায় পোড়খাওয়া সেই কৃষিজীবী মানুষের কথা কবি বলেছেন—

চৈত্র গেল ভীষণ খরায়, বোশেখ রোদে ফাটে
এক ফোঁটা জল মেঘ চোঁয়ায়ে নামল না গাঁর বাটে।
ডোলের বেছন ডোলের চাষীর, বয়না গরু হালে,
লাঙল জোয়াল ধূলায় লুটায় র্মচা ধরে ফালে।

(নকশী কাঁথার মাঠ—জসীম উদ্দীন)

একদম শিশুকাল থেকেই গ্রামের ধূলিবালির সাথে মিশে আছে আমার বয়সের প্রতিটি সীমা-পরিসীমা। গ্রামের ছেলে না হলে নকশী কাঁথার মাঠ কেবল জসীম উদ্দীনের কাব্যের ভেতরই দেখতে পেতাম। গ্রামীণ সত্যতা পেতাম শুধু তাঁর ভেতর। কিন্তু গ্রামীণ সজীবতা আমাকে তার থেকে বেশি কিছু দিয়েছে। তখন বয়স আমার সাত কিবা আট হবে। সে বছর আমাদের গ্রামে খরা নেমে এলো। শেফালি, সনিয়া এবং গাঁয়ের গুটিকয়েক মেয়ে প্রতিটা কৃষকের বাড়ি যেয়ে গান ধরে—“আল্লাহ মেঘ দে পানি দে ছায়া দে রে আল্লাহ মেঘ দে…” গানের সুরে তাল মিলিয়ে নাচ করে মারুফ। তার পরনে একটি জালের পরিচ্ছেদ। তারা যে বাড়িতেই যায় সে বাড়ির জলকল বা পুকুর থেকে পনি এনে মারুফের উপর ঢালে। আমাদের গাঁয়ে একে বলা হয়ে থাকে ব্যাঙের বিয়ে। এই দৃশ্য এখন লুপ্ত। কবি জসীম উদ্দীন এটিকে বদনা-বিয়ে বলে উদ্ধৃত করেছেন—

এমন সময় ওই গাঁ হতে বদনা-বিয়ের গানে,
গুটিকয়েক আসল মেয়ে এই না গাঁয়ের পানে।
আগে পিছে পাঁচটি মেয়ে—পাঁচটি রঙের ফুল,
মাঝের মেয়ে সোনার হরিণ, নাই কোথা তার তুল।

মাথায় তাহার কুলোর উপর বদনা-ভরা জল,
তেল- হলুদে কানায় কানায় করছে টলমল।
মেয়ের দলে বেড়িয়ে তারে চিকন সুরের গানে,
গাঁয়ের পথে যায় যে বলে বদনা-বিয়ের মানে।

(নকশী কাঁথার মাঠ—জসীম উদ্দীন)


কবিতার সামাজিক আবহে ইসলামের কোনো গন্ধ নাই। মূল ধারাত ইসলাম বলতে যা বলা হয় তার দিকে লক্ষ্য করেন নাই কবি জসীম উদ্দীন। তার এই অপূর্ণতা নিয়ে নানান বিতর্ক হতে পারে। এই যে ইসলামের ঘরে ঢুকিয়ে দিলেন কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই। এই বিচারের সমাধান করতেই যেন লোকায়ত জীবনে আবির্ভাব হন কবি আল মাহমুদ।




প্রতিটা কৃষক পরিবারের পক্ষ থেকে চাল-ডাল পেয়ে তা দিয়ে সিন্নি করে বিতরন করা হতো; যা কবিতায় উল্লেখ আছে। কারণ তাদের ধারণা ছিল এতে খরা কেটে যেতে পারে, এটি মূলত পল্লী সমাজের প্রাচীন সংস্কৃতি। কবি জসীম উদ্দীন পল্লীজীবন এবং সংস্কৃতির ভেতর শুধু নয় পল্লী বাংলার তরুণ-তরুণীর প্রেমের মাধ্যমেও তিনি গ্রামীণ আত্মাকে ছুঁয়েছেন। যার কারণে ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ কবিতায় দেখা যায়; রুপাই এবং সাজু নামের প্রেমিক-প্রেমিকাকে। তারাই পুরো কবিতার প্রধান চরিত্র। সেই প্রেম পরিণত হয় বিয়েতে—

নতুন চাষা ও নতুন চাষাণী পাতিল নতুন ঘর,
বাবুই পাখিরা নীড় বাঁধে যথা তালের গাছের পর।
মাঠের কাজেতে ব্যস্ত রূপাই, নয়া বউ গেহ-কাজে,
দুইখান হতে দুটি সুর যেন এ উহারে ডেকে বাজে।

(নকশী কাঁথার মাঠ—জসীম উদ্দীন)

এই কবিতায় কবি গ্রামীণ বাংলার সর্বদিক তুলে এনেছেন। যার কারণে প্রথম কবি তিনিই; যার কবিতাই গ্রামের লড়াই উঠে এসেছে। এবং গ্রাম ছেড়ে শহরে যাওয়া সেই যুবকের পথ চেয়ে রয়েছে গ্রামীণ বধূর অর্থাৎ সাজুর অপেক্ষার চিত্র। কতোজনে কতো কথার রটনা করেছে তবু বিশ্বাস ভাঙেনি সাজুর। তার বিশ্বাস ছিল রুপাই ফিরবে এবং ফিরেছেও বটে; সেই রুপাইকে কবিতার শেষে পাওয়া যায় সাজুর কবরে। গ্রামীণ বধূর অপেক্ষাতেই শেষ হয়েছে কবিতাটি একটি গহীন প্রেমের ভেতর; যেখানে রুপাই এর দেখা পায়নি সাজু। তবে আপত্তিকর বিষয় হলো জসীম উদ্দীন মূলত হিন্দু নায়ক-নায়িকার চরিত্র ধারণ করেছিলেন। আবার কবিতার শেষে বলছেন সাজুর কবরের কথা। কবিতার সামাজিক আবহে ইসলামের কোনো গন্ধ নাই। মূল ধারাত ইসলাম বলতে যা বলা হয় তার দিকে লক্ষ্য করেন নাই কবি জসীম উদ্দীন। তার এই অপূর্ণতা নিয়ে নানান বিতর্ক হতে পারে। এই যে ইসলামের ঘরে ঢুকিয়ে দিলেন কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই। এই বিচারের সমাধান করতেই যেন লোকায়ত জীবনে আবির্ভাব হন কবি আল মাহমুদ।

 


দুই


 


কিন্তু জীবনানন্দ দাশ গ্রামীণ বাংলাকে এঁকেছেন ভিন্ন আঙ্গিকে। তাঁর বিশ্বাসগত দিক থেকে ধর্মের অনুকূলে। জীবনানন্দ দাশ শুধু নয় বুদ্ধদেব বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই দৃষ্টিকোণ থেকেই সমাজ ও সময়কে পর্যবেক্ষণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কঠিন করে বলা যায়; তিনি ব্রাহ্মধর্ম ও হিন্দুবাদিতায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তার মনের জমি গড়ে দিয়েছিল উপনিষদ। অনেকেই নজরুল ইসলামকে সাম্প্রদায়িকতার তকমা দিয়ে ইসলামিক হিসেবে দাঁড় করাতে চান। কিন্তু মূলত নজরুল ইসলাম সাম্যের কবি—

অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ
কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পণ।
হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কান্ডারী বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।


ত্রিশের কবিদের মাঝে ইউরোপীয় ভাবকল্পে যে নতুনত্ব ধরা দিলো—তা বাস্তবায়ন এবং বাংলা কবিতার নতুন ধারায় নিজেকে সূচনা করতে, নতুন স্বরে উপস্থাপন করতে, পদ্মপুরাণের অংকন নিয়ে হাজির হলেন জীবনানন্দ দাশ।




কাজী নজরুল ইসলাম হিন্দুসমাজ এবং মুসলিমসমাজ উভয় দিক দিয়েই বাংলাকে প্রকটিত করেছেন। নজরুল ইসলামের সমসাময়িক কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলাকে এমনভাবে দেখলেন, যা তখনকার কবিদের শ্রবণে ছিল কিন্তু ধ্যানে ছিল না। এবং ত্রিশের কবিদের মাঝে ইউরোপীয় ভাবকল্পে যে নতুনত্ব ধরা দিলো—তা বাস্তবায়ন এবং বাংলা কবিতার নতুন ধারায় নিজেকে সূচনা করতে, নতুন স্বরে উপস্থাপন করতে, পদ্মপুরাণের অংকন নিয়ে হাজির হলেন জীবনানন্দ দাশ। তিনি গ্রামীণ বাংলায় যে জীবন দেখলেন তা মূলত চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল, পদ্মপুরাণের পুরনো কাহিনীর সমর্থনে পেয়েছিলেন। সৈয়দ আলী আহসান তাঁর একটি প্রবন্ধে বলেছিলেন;

 

“জীবনানন্দ গৃহগত সৌন্দর্যে লালিত যে—সব রমণীকে দেখেছেন তাদের পরিচয় রূপসী বাংলার মধ্যে ফুটিয়ে তোলেছেন। চাল ধোয়া স্নিগ্ধ হাত যে বধূটির তার সিঁথির উজ্জল সিঁদুর আমরা দেখি এবং নিস্তরঙ্গে ডোবার পাশেই কলমিলতার ঝোপের আড়ালে পাখিদের গুঞ্জন শুনি”

 

আমারে দিয়েছে তৃপ্তি; কোনোদিন রূপহীন প্রবাসের পথে
বাংলার মুখ ভুলে খাঁচার ভিতরে নষ্ট শুকের মতন
কাটাই নি দিন মাস, লহনার খুল্লনার মধুর জগতে
তাদের পায়ের ধুলো-মাখা পথে আমি যে বিকায়ে দিছি মন
বাঙালি নারীর কাছে—চালধোয়া—স্নিগ্ধ হাত, ধানমাখা চুল,
হাতে তার শাড়িটির কস্তা পাড়—ডাঁশা আম, কামরাঙা ফুল।

(যেদিন সরিয়া যাব—জীবনানন্দ দাশ)

অথবা

দেখিব মেয়েলি হাত সকরুণ- শাদা শাঁখা ধূসর বাতাসে
শঙ্খের মতো কাঁদে; সন্ধ্যায় দাঁড়ালো সে পুকুরের ধারে

(তোমার যেখানে সাধ চলে যাও—জীবনানন্দ দাশ)

অথবা

সাজায়ে রেখেছো চিতা; বাংলার শ্রাবণের বিষ্মিত আকাশ
চেয়ে রবে; ভিজে পেঁচা শান্ত-স্নিগ্ধ চোখ মেলে কদমের বনে
শোনাবে লক্ষ্মীর গল্প—ভাসানের গান নদী শোনাবে নির্জনে;
চারিদিকে বাংলার ধানী শাড়ী—শাদা শাঁখা—বাংলার ঘাস
আকন্দ বাসকলতা ঘেরা এক নীল মঠ—আপনার মনে
ভাঙিতেছে ধীরে ধীরে—চারিদিকে এইসব আশ্চর্য উচ্ছ্বাস

(একদিন জলসিঁড়ি নদীটির—জীবনানন্দ দাশ)

 


সেই তিমিরতীর্থেই মাহমুদের হাঁটতে শেখা নতুন গন্তব্যের দিকে। তাঁর অনুসন্ধানী চোখ খুঁজেছে কোথায় সেই গন্তব্য। সে গন্তব্যের খোঁজেই ডুব দিয়েছেন মধ্যযুগের সাহিত্য পাঠে। সেখানেও নিজেকে খুঁজে পাননি আল মাহমুদ। এবার হারিয়ে গেলেন অন্য কোথাও, কবিতার অন্য কোনোখানে। যার কারণে দেখা যায় রুশো সাহিত্যে নিমগ্ন আল মাহমুদ বের হয়ে এলেন মার্ক্সীয় দর্শন নিয়ে। এখানেও পেলেন না তার উদ্দিষ্ট গন্তব্য, যেনবা এক শূন্যের ভেতর দৌড়াচ্ছেন অবিরত।




‘জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় যে—সকল রমণীকে জাগিয়ে তুলেছেন তারা চণ্ডীমঙ্গল ও পদ্মপুরাণের নিম্নবিত্ত রমণীকুল। তারা ধর্ম বিশ্বাসের মধ্যে হিন্দু আচারনিষ্ঠা ও গৃহগত মমতার বন্ধনের মধ্যে একসঙ্গে বাস করতো। পল্লী বাংলার এই পর্যবেক্ষণে জীবনানন্দ দাশের চিত্তের সম্পূর্ণতার জন্যেই আল মাহমুদের প্রয়োজন ছিল’ সৈয়দ আলী আহসানের এই বক্তব্যের প্রমাণ হলো—জীবনানন্দ পরবর্তী কবি আল মাহমুদ পল্লীজীবনের মমতাময় অঙ্গণে যে—সকল মুসলিম বাস করে তাঁরা; জীবনানন্দ পরবর্তী কবিদের শ্রবনে ছিল কিন্তু ধ্যানে ছিল না। তিনিই প্রথম তা পর্যবেক্ষণ করেন। এই অনুসন্ধান ছিল মূলত বাংলা কবিতাকে নতুন একটি বাঁকে ফিরানো—তাই ‘প্রত্যাবর্তনের লজ্জা’ কবিতায় শেষ ট্রেন হারিয়ে বাড়ি ফেরার প্রাক্কালে জলার ধারে উড়ে যাওয়া বকের চিত্রকল্পে এঁকেছেন মুসলিম সমাজের ভোরের চিত্র, যেখানে তাঁর পিতাকে কোরআন পড়তে দেখা যায়—

কুয়াশার শাদা পর্দা দোলাতে দোলাতে আবার আমি ঘরে ফিরবো।
শিশিরে আমার পাজামা ভিজে যাবে। চোখের পাতায়
শীতের বিন্দু জমতে জমতে নির্লজ্জের মতোন হাঠাৎ
লাল সূর্য উঠে আসবে। পরাজিতের মতো আমার মুখের ওপর রোদ
নামলে, সামনে দেখবো পরিচিত নদী। ছড়ানো ছিটানো
ঘরবাড়ি, গ্রাম। জলার দিকে বকের ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে। তারপর
দারুণ ভয়ের মাতো ভেসে উঠবে আমাদের আটচালা।
কলার ছোট বাগান।
দীর্ঘ পাতাগুলো না না করে কাঁপছে। বৈঠকখানা থেকে আব্বা
একবার আমাকে দেখে নিয়ে মুখ নিচু করে পড়তে থাকবেন
ফাবি আইয়ে আলা ই-রাব্বিকুমা তুকাজ্বিবান…!

(প্রত্যাবর্তনের লজ্জা—আল মাহমুদ)

শুধু মুসলিম সমাজ নয়, হিন্দু সমাজকেও আল মাহমুদ তাঁর কবিতায় মহিম অবস্থান দিয়েছেন। মূলত আল মাহমুদের সূচনা এই সমন্বয় বিন্দু থেকে—

একদিন হেঁটে হেঁটে সেই ব্রতচারী
চলে এলো অন্ধকার মন্দির
এ-রাতে অধিষ্ঠত্রী পাথরের নারী
যেখানে বেদির পারে আদিম তিমির

(তিমিরতীর্থে—আল মাহমুদ)

সেই তিমিরতীর্থেই মাহমুদের হাঁটতে শেখা নতুন গন্তব্যের দিকে। তাঁর অনুসন্ধানী চোখ খুঁজেছে কোথায় সেই গন্তব্য। সে গন্তব্যের খোঁজেই ডুব দিয়েছেন মধ্যযুগের সাহিত্য পাঠে। সেখানেও নিজেকে খুঁজে পাননি আল মাহমুদ। এবার হারিয়ে গেলেন অন্য কোথাও, কবিতার অন্য কোনোখানে। যার কারণে দেখা যায় রুশো সাহিত্যে নিমগ্ন আল মাহমুদ বের হয়ে এলেন মার্ক্সীয় দর্শন নিয়ে। এখানেও পেলেন না তার উদ্দিষ্ট গন্তব্য, যেনবা এক শূন্যের ভেতর দৌড়াচ্ছেন অবিরত। প্রথম থেকেই কবির দৃষ্টি বাংলার দিকে, তাকালেন তিতাসের জলে; যে তিতাস নিজেই গোসল করে নিজের ভেতর। দেখলেন তাঁর মানুষকে, তাদের জীবনাচারে পেলেন নিজেকে। একটি চিরস্থায়ীত্বে প্রতিবিম্ব কবি পেলেন তাঁর সংস্কৃতির ভেতর যা তিতাসের মানুষ পালন করে করে আসছে বহুকাল ধর্মের মানদণ্ডে—

বধূবরণের নামে দাঁড়িয়েছে মহামাতৃকুল
গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল, কবুল।

(সোনালী কাবিন—আল মাহমুদ)

মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রবাসজীবন বেছে নিলেও বাংলাকে ভুলতে পারেননি। ভুলতে পারেননি বাংলাদেশের মানুষকে, তার জল, বায়ু, প্রকৃতিকে। তাই বঙ্গভূমির প্রতি কবিতায় তিনি দেশকে মা অর্থাৎ দেবী হিসেবে প্রার্থনা করেছেন, দেশমাতার মনের মন্দিরে স্মৃতি হয়ে থাকতে। পদ্ম হয়ে ফোটে থাকতে চেয়েছেন ভালোবাসায়—

রেখো মা দাসেরে মনে, এ মিনতি করি
পদে সধিতে মনের সাধ,
ঘটে যদি পরমাদ,
মধুহীন করো না গো তব মনঃকোকনদে।

(বঙ্গভূমির প্রতি—মাইকেল মধুসূদন দত্ত)

কিন্তু জীবনানন্দ দাশ দেশের প্রতি ভালোবাসা দেখাতে যেয়ে যেমন বলেছেন—“বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর” তেমন পুনর্জন্মের মাধ্যমে তাঁর বিশ্বাসগত দিক থেকে মমতা দেখিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন বাংলার প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা। তাই ‘আবার আসিব ফিরে’ কাবিতায় তিনি পুনর্জন্ম চেয়েছেন। এখানে আল মাহমুদ ভিন্ন স্বরে ভিন্ন পর্যবেক্ষণে বাংলাকে দেখেছেন তাঁর ‘নোলক’ কাবিতায়। তিনি দেশকে মা এবং দেশের স্বকীয় সত্তা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে নোলকে রূপ দিয়ে খুঁজতে গিয়েছেন নদীর কাছে, বনের কাছে, পাখির কাছে, ফুলের কাছে, ফলের কাছে, পাহাড়ের কাছে—

আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে
হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশ।
নদীর কাছে গিয়েছিলাম, আছে তোমার কাছে?
—হাত দিওনা আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে।
বললো কেঁদে তিতাস নদী হরিণবেড়ের বাঁকে
শাদা পালক বকরা যেথায় পথ ছড়িয়ে থাকে।
জল ছাড়িয়ে দল হারিয়ে গেলাম বনের দিক
সবুজ বনের হরিৎ টিয়ে করে রে ঝিকঝিক
বনের কাছে এই মিনতি, ফিরিয়ে দেবে ভাই,
আমার মায়ের গয়না নিয়ে ঘরকে যেতে চাই।
কোথায় পাবো তোমার মায়ের হারিয়ে যাওয়া ধন
আমরা তো সব পাখপাখালি বনের সাধারণ।
সবুজ চুলের ফুল পিন্দেছি নোলক পরি না তো!
ফুলের গন্ধ চাও যদি নাও হাত পাতো হাত পাতো—
বলে পাহাড় দেখায় তাহার আহার ভরা বুক।
হাজার হরিণ পাতার ফাঁকে বাঁকিয়ে রাখে মুখ।
এলিয়ে খোপা রাত্রি এলেন, ফের বাড়ালাম পা
আমার মায়ের গয়না ছাড়া ঘরকে যাব না।

(নালক—আল মাহমুদ)

 


তিন


 


এই প্রবন্ধে ধর্মের দ্বন্দ্বে কবিদের পর্যালোচনা করা আমার বিষয় নয়, বরং আল মাহমুদ কীভাবে স্বতন্ত্রধারার কবি তা উপস্থাপন করা। আলোচনায় মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বুদ্ধদেব, জীবনানন্দ দাশ এলেও আল মাহমুদ প্রধানত জীবনানন্দ দাশের সাথেই আলোচিত হবে। কেননা মাইকেল, রবি ঠাকুর, নজরুল, বুদ্ধদেব আলাদা স্বর নিয়ে আসলেও জীবনানন্দ দাশ মূলত আধুনিকোত্তর কবি এবং তার পরবর্তী কবি হিসেবে উত্তরআধুনিকতায় পরিগণিত হন আল মাহমুদ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, নজরুল ও আল মাহমুদ ধর্মের ব্যাপারে তারা একে অন্যের পরিপূরক।

 


সত্যিকার অর্থে ইংরেজি সাহিত্যের আসল জন্ম জিওফ্রে চসারের (১৩৪০-১৪০০) সাল থেকে। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যার প্রজ্ঞাময় লিখনীতে এংগলো-সেক্স যুগের বিশেষ মৌখিক সাহিত্য লিখিত সাহিত্যে রূপ লাভ করে। জিওফ্রে চসারের যুগ অতিক্রান্ত হয় রেনেসাঁ বা পুনর্জাগরণের (১৫০০-১৬০০ খৃস্টাব্দ) পটভূমি রচনাতে।




একজন কবির সাহিত্য চর্চা তাঁর সংস্কৃতির সাহিত্যের বাহিরে নয়; অর্থাৎ কবির বিশ্বাসগত সাহিত্যই তাঁর সংস্কৃতি। খৃষ্টপূর্ব ৫৫ অব্দ পর্যন্ত সাহিত্যে রূপ ছিল; Oral art বা বাকশিল্পের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ। সে সময়টা ছিল তখন রোম সম্রাট জুলিয়াস সিজারের রাজ্বত্ব কাল। তখন আকাশ-বতাস, নদ-নদী, পহাড়-জঙ্গল ও নানাধরনের প্রাণীকুলের পরিবেশ-প্রতিবেশে বসবাস করে, মানুষ চেতনায় অনুভব করে নিজের জীবনের অস্তিত্ব; এবং এর প্রতি অনুরাগ-বীতরাগের অনুভূতিরাজি। সেকালে মানুষ অসহায়ত্ব বোধ করতো সীমাহীন সাগর দেখে, দৈত্যাকার গগণস্পর্শী পাহাড়-পর্বতের অবয়ব, অনন্ত মহাশূন্যে বিরাজমান সূর্য ও চন্দ্র-তারকাখচিত নীল আকাশের দিগন্তবিস্তৃত বিস্ময়কর ও বিমূঢ়কারক রূপ দেখে। ভয়ংকরাকৃতির জীব-জন্তু-সরীসৃপও তাদের হৃদয়ে জাগাতো ভয় ও তীব্র মৃত্যুশঙ্কা। এসব থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য অদিবাসীরা কাল্পনিক দেবদেবীর প্রতিকৃতি নির্মাণসহ পূজা-পার্বনের জন্ম দেয়, জন্ম দেয় পাহাড়, পর্বত, পাথর, বৃক্ষ ইত্যাদির পূজা। যার কারণে সে সময় দেবতা এবং রাক্ষসের যুদ্ধে বিবরণ পাওয়া যায় তাদের বাকশিল্পে। সত্যিকার অর্থে ইংরেজি সাহিত্যের আসল জন্ম জিওফ্রে চসারের (১৩৪০-১৪০০) সাল থেকে। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যার প্রজ্ঞাময় লিখনীতে এংগলো-সেক্স যুগের বিশেষ মৌখিক সাহিত্য লিখিত সাহিত্যে রূপ লাভ করে। জিওফ্রে চসারের যুগ অতিক্রান্ত হয় রেনেসাঁ বা পুনর্জাগরণের (১৫০০-১৬০০ খৃস্টাব্দ) পটভূমি রচনাতে।

 


বিবর্তনকে বর্জন কারুর পক্ষে সম্ভব নয়। বিশ্বের গতিশীল ভাষাসমূহে সাহিত্য নির্মাণে বহুকাল পরে আসে অবিস্মরণীয় বিবর্তন। তেমনি জীবনানন্দ থেকে আল মাহমুদ পর্যন্ত খুব বিলম্ব ছাড়াই বাংলা কাব্যভাষা বিবর্তিত হয়েছে এবং ঊনবিংশ শতাব্দির পর; বিংশ শতাব্দিতে নতুন একটি কবিতার বৈচিত্রময় ব-দ্বীপ রচিত হয়েছে। যার নাম আল মহমুদ।




Renaissance বা রেনেসাঁর যুগকে The age of Humanism বা মানবতার যুগও বলা হয়। গ্রিস ও রোম-এর যুগ্ম লোকাচারের সাথে খৃস্টধর্মের সংমিশ্রণে এ যুগের মানুষের ব্যক্তি ও সমাজজীবন নবতররূপে গড়ে উঠে। গ্রিকদর্শনে দেশপ্রেম, বীর পূজা, স্বাস্থ্য এবং বলিষ্ঠ ও মজবুত করার নিমিত্তে স্বাস্থ্যবান নারী-পুরুষের অবাধ যৌন-মিলনে সন্তান উৎপাদনের দর্শন প্রচার করা হয়। এ ধরনের দর্শন প্রচারের পরিণামে পরিদৃষ্ট হয় বিশ্বাস-ভিত্তিক স্রষ্টার অনুগ্রহ ও সাহায্য অপেক্ষা ধর্মবিবর্জিত বাস্তবতার প্রতি প্রত্যয়শীল হওয়ার প্রবণতা। অর্থাৎ প্রচীনকালে চসারের যুগে ধর্মভিত্তিক যে জীবন ও সমাজের প্রাণশক্তি বিজ্ঞান ও যুক্তির অধীনস্থ না হয়ে খৃষ্টধর্ম তথা বাইবেলে ঠাঁই পেয়ে ঈশ্বরের করুণার পাত্র হিসেবে বিকশিত ছিল, তা ক্রমান্বয়ে বিজ্ঞান ও যুক্তির অক্টোপাশে আবদ্ধ হয়ে বস্তুতান্ত্রিকতার উন্মেষ ঘটাতে থাকে। অর্থাৎ জড় পৃথিবী ও এর ধন-সম্পদের উপর মানুষের ক্রমবর্ধিষ্ণু প্রতাপ ও কর্তৃত্ব হচ্ছে নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক সত্ত্বার অবমানসহ অভূতপূর্ব প্রগতির এক কাহিনী। ঈশ্বর কর্তৃক প্রেরিত ঐশী বাইবেলের মানব ইতিহাস অপেক্ষা ডারইউনের Descent of man এর আবেদন এ যুগের মানুষের কাছে অধিকতর বিশ্বাসযোগ্য ও স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে সমাদৃত হয়।

এ তো গেল ইংরেজি সাহিত্যের পরিক্রমা। বাংলা সাহিত্যের আদি নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ চর্যাপদ ধর্মের বাহিরে নয়, তার ধর্মের দিক নিয়ে সর্বপ্রথম ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষায় আলোচনা করেন। ইন্দ্রজাল থেকে বার হয়ে আসা বাংলা কাবিতা তখনো পর্যন্ত কাটিয়ে উঠতে পারেনি সংস্কৃতের প্রভাব। কিন্তু মধ্যযুগের পর নগরজীবন একপাশে রেখে পল্লীজীবনে ঢুকে যাওয়াটা ছিল জীবনানন্দের অভিনবত্ব এবং বাংলা কবিতার বিপ্লব। যার ফলে বাংলা কবিতা যেই ধারা পেয়েছিল, তা জীবনানন্দ পরবর্তী কবিদের বহু ব্যবহারে এবং ক্লীশে অনুবৃত্তিতে র্জীণতা পেতে থাকে। তৎসম-তদ্ভব ও নাগরিক কাব্যভাষার সঞ্চালনে কবিতা ভাষা সংকীর্ণ হয়ে আসছিল। তখন প্রয়োজন পড়ে নতুন একটি কাব্যভাষার। এবং সেই প্রয়োজন মিটাতে সক্ষম হন আল মাহমুদ। তিনি ভাষাকে খুঁড়িয়ে আনেন চিরায়ত বাংলার লোকায়ত জীবন থেকে। নদীলগ্ন জীবন, কৃষিমগ্ন জীবন এবং আধুনিকতার অভিঘাতে নগর-স্পৃষ্ট জীবন তাকে দিয়েছিল এমন শব্দের সম্ভান। যার ব্যবহার বৈদগ্ধে গুটা বাংলা কবিতায় একটি চনমনে, স্পর্শী, গীতল ও আনকরা অনুভব ছড়িয়ে দেয়। তাঁর সততার সিদ্ধ ভাষাকে প্রণীত করেন গ্রামীণ বাংলায়; সেখানে তাঁর প্রয়োজনকে পূর্ণতা দেয় বাংলার মুসলিম সমাজ, এখানেই খুজেঁ পান আল মহমুদীয় কণ্ঠস্বর বাংলা কবিতার নতুন মোহনা।

বাঙালি জীবন বিকাশের অতল স্পর্শী সমগ্রতাকে স্পর্শ করে মুসলিম চেতনার সংমিশ্রণে কবিতার ভাব ও তত্বে যে পরিবর্তন আল মাহমুদ এনেছেন এটাই তাকে নতুনধারার কবি বলে মার্জিত অবয়ব দান করে। কোমল ও মমতা স্নিগ্ধ শব্দকে অনুসন্ধান করে গ্রামীণ জনবাসে উচ্চারণ করতে পেরেছেন বলে তিনি আলাদা স্বাদের আধার হয়ে উঠেন। যেমনটা ছিল জীবনানন্দ দাশের কবিতার তত্বে পদ্মপুরাণ, মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল এবং হিন্দু সমাজ। তাই বলে কি কবিরা সাম্প্রদায়িক কিম্বা আর্দশচ্যুত? কবিরা তো দেশকে ভালোবেসেছেন তাঁর বিশ্বাসগত ও চেতনাগত দিক দিয়ে এবং তাঁরা তাদের ধর্মের পবিত্রতায় দেশকে ব্যাখ্যা করেছেন। আল মাহমুদ বলেছেন ‘আমাদের ধর্ম ফসলের সুষম বণ্টন”। মূলত তাঁরা ধর্মের মতোই পবিত্র জেনেছেন জন্মভূমির মাটি ও মানুষকে। তাঁরা এর মাঝেই বাংলা কবিতার বির্বতন দেখেছেন এবং তা হয়েছে। আর বিবর্তনকে বর্জন কারুর পক্ষে সম্ভব নয়। বিশ্বের গতিশীল ভাষাসমূহে সাহিত্য নির্মাণে বহুকাল পরে আসে অবিস্মরণীয় বিবর্তন। তেমনি জীবনানন্দ থেকে আল মাহমুদ পর্যন্ত খুব বিলম্ব ছাড়াই বাংলা কাব্যভাষা বিবর্তিত হয়েছে এবং ঊনবিংশ শতাব্দির পর; বিংশ শতাব্দিতে নতুন একটি কবিতার বৈচিত্রময় ব-দ্বীপ রচিত হয়েছে। যার নাম আল মহমুদ।

 


লেখক

জাকারিয়া প্রীণন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *