আল-সাদ্দিক আল-রাদ্দির পাঁচটি কবিতা

98 Views

Spread the love

ফরাসিদের কাছে স্বাধীনতা অর্জনের পরও দীর্ঘদিন ধরে তারা গৃহযুদ্ধে আক্রান্ত। তাই তাদের কবিতায় রয়েছে আত্মঘাতের অনল থেকে উত্তোরণের অন্বেষা। ব্যক্তিগত যাপন ও যন্ত্রণার শৃঙ্খল ভেঙে জীবনের অবমুক্তি কামনা। এক নায়কতন্ত্র দাপুটে রাজনীতি দুমড়েমুচড়ে একটা টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নিরন্তর শব্দসমর।

 


ভূমিকা


 

সুদানি সাহিত্যের ইতিহাস গ্রিক বা লাতিন ভাষার মতোই প্রাচীনতম। প্রথমে তারা মেরোইটিক লিপিতে লিখতো। এসব লেখা তারা বিভিন্ন বেলেপাথর কিংবা শিলালিপির উপর লিখে রাখতো। এই মেরোইটিক লিপিতে লেখা এক ধরনের কথাসাহিত্যের নিদর্শন পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকদের ধারণা, ওইসব কথাসাহিত্য ৩০০ খ্রিষ্টাব্দের রচনা। সেইসব কথাসাহিত্য কুশ রাজাদের বা কুশি সংস্কৃতির দেবদেবদতাদের পরিচিতির বাহক মাত্র। খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে নুবিয়ার খ্রিস্টানাইজেশনকালে কুশীয় ভাষা এবং বাইজেন্টাইন গ্রিক, কপটিক এবং ওল্ড নুবিয়ান ভাষা দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। ধর্ম, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা বা ব্যক্তিগত জীবন-চেতনাই ছিল সাহিত্যের উপজীব্য। চৌদ্দ শতকের পর থেকে ধীরে ধীরে আরবি নুবিয়ায় প্রাথমিক ভাষাতে পরিণত হয়। ফলে ইসলাম প্রসারের সাথে সাথে সুদানের বেশিরভাগ অঞ্চলে ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়গুলি সাহিত্য রচনার মূল উপকরণ ও উপজীব্য হয়ে ওঠে। সুদানি সাহিত্যিকরা মনে করেন যে,

 

‘আর্ট সবসময় মানুষের সেবায় নিয়োজিত।’

 

সাহিত্যের পণ্ডিত কনস্ট্যান্স ই বার্কলে বলেছেন যে

 

“সুদানি সাহিত্যের অতীত ও বর্তমান আরবি সাহিত্যের সাথে সংযোগ রয়েছে। একই সাথে এটি তার নিজস্ব ক্ষেত্রেও বৈধ। অন্যান্য আফ্রিকান অথবা আরবি ভাষাভাষীদের মতো সুদানিদেরও কবিতা সবচেয়ে পছন্দের সাহিত্য।”

[ কনস্ট্যান্স ই বার্কলে (১৯৮১), “সুদানের সাহিত্যের সংশ্লেষ”, ১০৯ পৃষ্ঠা]

 

তবে বিশ শতকেই সূচিত হয় সুদানের আধুনিক সাহিত্যের অভিযাত্রা। বিশ শতকের শুরুতে সুদানে বেশ কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জারিদাত আল-সুদান। এটি আরবি ও ইংরেজিতে প্রথম দ্বিপাক্ষিক একটি পত্রিকা। ১৯০৩ সালে প্রথম মুদ্রিত হয়। তবে আল–রয়েড নামক সাহিত্য পত্রিকা সুদানি সাহিত্যে আধুনিকতা বিকাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আরবি ভাষায় প্রকাশিত এই সংবাদপত্রটি ১৯১৪ সালে সুদানের রাজধানী খার্তুমে প্রতিষ্ঠিত হয়। কবিতা ও সাহিত্যের অন্যান্য ধারা প্রবর্তন করে। এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন কবি ও সাংবাদিক আবদুল রহিম গ্লাইলতি।

 

ফরাসিদের কাছে স্বাধীনতা অর্জনের পরও দীর্ঘদিন ধরে তারা গৃহযুদ্ধে আক্রান্ত। তাই তাদের কবিতায় রয়েছে আত্মঘাতের অনল থেকে উত্তোরণের অন্বেষা। ব্যক্তিগত যাপন ও যন্ত্রণার শৃঙ্খল ভেঙে জীবনের অবমুক্তি কামনা। এক নায়কতন্ত্র দাপুটে রাজনীতি দুমড়েমুচড়ে একটা টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নিরন্তর শব্দসমর।

 


 

আল-সাদ্দিক আল-রাদ্দি একজন আরবি ভাষার কবি ও সাংবাদিক। তিনি ১৯৬৯ সালে সুদানের ওমদুরমানে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র পঁনেরো বছর বয়সে দ্য উইন্ড শিরোনামে আল শাওয়া পত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়। ১৯৮৬ সালে তরুণ কবিদের কবিতা প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম পুরষ্কার অর্জন করেন। একই বছর তিনি সুদানি লেখক ইউনিয়নের সর্বকনিষ্ঠ হিসাবে সদস্যপদ লাভ করেন। আলহোরিয়া, আলাদওয়োয়া, আল আইয়াম এর মতো অনেক সুদানি সংবাদপত্রের সাংবাদিক হিসাবে কাজ করেছেন। ২০০৬ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি আল-সুদানি পত্রিকার সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন। ২০১২ সালে ওমর আল-বশিরের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকালীন রাজনৈতিক কারণে তিনি সেই পদ থেকে বরখাস্ত হন ।

 

তাঁর কবিতা সবসময় সুদানের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ভাষাগত বৈচিত্র্য ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ন অভিজ্ঞানের অভিব্যক্তি হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে।

 

তাঁর প্রথম কবিতাবই সংস অব সলিটিউড ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয়। এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৯৯ সালে। এরপর তাঁর আরো দুটি কবিতাবই প্রকাশিত হয়। দ্য সুলতান’স ল্যাবরেথ ১৯৯৬ সালে এবং দ্য ফার রিচেস অফ দ্য স্ক্রিন (১৯৯৯ ও ২০০০) সালে। উক্ত তিন কবিতাবই সাদ্দিক কালেকক্টেড পোয়েমস শিরোনামে এক খণ্ডে ২০০৯ সালে কায়রোতে প্রকাশিত হয়।

 

তিনি তাঁর কবিতায় কল্পনাপ্রসূত দৃষ্টিভঙ্গি এবং পঙক্তির কোমলতা ও অকপট সংবেদনশীলতার জন্য সুদানে বিস্তৃত পাঠ অর্জন করেছেন। তাঁর কবিতা সবসময় সুদানের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ভাষাগত বৈচিত্র্য ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ন অভিজ্ঞানের অভিব্যক্তি হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে। দ্য লন্ডন রিভিউ অব বুকস, পোয়েট্রি রিভিউ এবং দ্য টাইমস লিটারেরি এর মতো সাহিত্যপত্রিকাগুলোয় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।

 

তাঁর কবিতা আরবি থেকে বেশ কয়েকজন ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। তাদের মধ্যে সুদানের কবি হাফিজ খির, ইংরেজ কবি সারাহ মাগুয়ের এবং মার্ক ফোর্ড উল্লেখযোগ্য। এখানে হাফিজ খিরের ব্রেথলেজ, পোয়েম, সামওয়ান, নাথিং ও মার্ক ফোর্ডের রাইটিং কবিতাবলির ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় ভাবানুবাদ করা হলো।

 


আল-সাদ্দিক আল-রাদ্দির পাঁচটি কবিতা


কবিতা


 

আমি দেবদূতকে দেখি,
দেখি গান -পাখিদের,
যাদের মুরগির মতো
জবাই করা হয়েছিল।

 

আমি ঘোড়দৌড় দেখি,
যোদ্ধাদের দেখি,
শোকার্ত মায়েদের দেখি,

 

দেখি মৃত গাছ
এবং অন্যান্য নারীদের;
যারা আর্তনাদ ও হাহাকারে
অনাদিকাল ধরে অভ্যস্ত।

 

আমি স্ট্রিট দেখি,
ঝড়ো হাওয়া দেখি,
স্পোর্টস কার দেখি,
দেখি মুষ্ঠিযুদ্ধ, যুদ্ধজাহাজ,
আর নিরীহ বাচ্চাদের।

 

এই তো অশ্রু দেবতা,
আমাকে বলো :
এসব কীভাবে ঘটে?

 

আমাকে কাদামাটি সম্পর্কে বলো,

 

এইসব জাগতিক
অগ্নিগিরি, ধোঁয়াশা,
আবছায়া আর গন্ধ সম্পর্কে বলো
এবং আমাদের গৃহ সম্পর্কে;

এইসব জানতে চাওয়ার উদ্দেশ্যে
আমার কোনো সন্ত্রস্ততা নেই।

 


লেখা


 

একটা শাদা কাগজের ফাঁদে
সে নিজেই নিজেকে ছুড়ে ফেলেছে।
কোনো এক নারীর জন্য
সেখানে একটি বাড়ি আবিস্কার করে সে
সেখানে তাঁর স্বাধিকারের সামগ্রীতে সাজায়
একটি ব্যক্তিগত পৃথিবী।
এই পৃথিবীতেই সে হাস্যোজ্জ্বল,
অথবা নিষ্প্রোভ
এবং এভাবেই বেঁচে থাকে সে,
যা আদৌ সে কামনা করে না…

 


কেউ


 

প্রচণ্ড আওয়াজ ও আকুলতার পাশে রক্ত ঝরছে
রক্ত ঝরছে অবসাদ ও অধ্যবসায় থেকে,
সমূহ চেনাশোনা ও সীমাবদ্ধতা থেকে
স্থিত সমূহ সীমানা ও কাঁটাতার থেকে
এই জারজ জগতে যেন সবকিছুই বানোয়াট

 

বিভৎসতা থেকে উদগত
আমি বিপুল বেদনার বিভা
এবং ঝরে পড়া স্বপ্নের স্বর্ণাভ সম্ভাবনা
পরিত্যাগ করো
সম্ভাব্য প্রলোভনের পথ

 

আমি গোরখোদক বৈ কিছু নই
মৃতরা পরিত্যক্ত
ওদের কোনো এক মায়াবী ছাদের অন্তরালে
সতর্কভাবে ফেরে ধূসর দৃষ্টিরা
ওরা এখনও মারা যায় নি

 

কোনো এক দুঃস্বপ্ন
হয়তো শেষ হবে
কোনো এক দুঃস্বপ্ন
হয়তো শুরু হবে…

 


মৃত্যু


 

তোমার অন্তর দুম করে আঘাত করে—
যেন সে ইতোমধ্যে
তোমার দরজায় কড়া নেড়েছিল

 

অথবা
যেন সে চায় –
এক দুপুর আকাশ,
জানালায় পৌঁছে যাওয়া
পাখিদের শিস

 

………
এখন ধৈর্যের মওসুম।
ডানা ঝাপ্টানির দিন।

 


শূন্যতা


তোমার পাঠ শুরুর আগে,
কলমটা নামিয়ে রাখো :
বিবেচনা করো কালি,
কীভাবে রক্তপাত উপলব্ধি করবে

 

শেখো
দূর দিগন্ত থেকে
এবং সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে
রক্তাক্ত নিদর্শন
এবং তলোয়ারের বিশ্বাসঘাতকতা থেকে

পাঠের আগে যদি তুমি মারা যাও
অথবা রক্তপাত উপলব্ধির আগে
তবে আমাকে দোষারোপ করো না,
না শূন্যতাকে…

 


উৎস  : পোয়েট্রি ট্রান্সলেশন সেন্টার ও উইকিপিডিয়া।


অনুবাদক

রেজাউল ইসলাম হাসুর জন্ম রংপরে, ১৯৮৭ সালে। হিসাববিজ্ঞানে সরকারি বাঙলা কলেজ, ঢাকা থেকে স্নাতকোত্তর অর্জন করেছেন। পেশাজীবন শুরু করেন সহ-সম্পাদক হিসেবে। বর্তমানে একটা বেসরকারি সংস্থায় উন্নয়ন-কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। বাংলা ভাষার সৃজনে অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা বেলাভূমি সম্পাদনা করেন।

rejaulislamhashu1987@gmail.com

প্রকাশিত বই তিনটা।

এক. একটি ছুরি অথবা কুড়িটা ঘুমের পিল [২০২১–গল্পগ্রন্থ, বেহুলাবাংলা]
এক. ওকাবোকা তেলাপোকা [২০১৬-শিশুতোষ, প্রিয়মুখ]
দুই. এলিয়েনের দেশ পেরিয়ে [২০১৭-শিশুতোষ, প্রিয়মুখ]

 


 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *