চন্দন চৌধুরীর তিনটি অণুগল্প

4389 Views

Spread the love

 


শেষ নেই


 

একটা পাতা ঝরে পড়তে পড়তে ঈশ্বরকে বলল, পাতা হিসেবে সম্ভবত আমার কার্য সম্পন্ন হয়েছে, এবার আমাকে স্বর্গে নিয়ে চলুন।

ঈশ্বর বললেন, নিশ্চয়ই স্বর্গে যাবে তুমি। সময়ই তোমাকে দেখবে। একেবারে চিন্তা করো না। বলে তিনি চলে গেলেন।

এরপর পাতা গলে পচে মাটি হয়ে গেল। মাটি ঈশ্বরকে বলল, মাটি হিসেবে সম্ভবত আমার কার্য সম্পন্ন হয়েছে, এবার আমাকে স্বর্গে নিয়ে চলুন।

ঈশ্বর বললেন, নিশ্চয়ই স্বর্গে যাবে তুমি। সময়ই তোমাকে দেখবে। একেবারে চিন্তা করো না। বলে তিনি চলে গেলেন।

 

এই যে পাতা থেকে মাটি, মাটি থেকে ইট হচ্ছ… এভাবে প্রতিবারই তুমি স্বর্গে যাচ্ছ। তুমি প্রতিবার স্বর্গের ভেতর দিয়েই নতুনভাবে তৈরি হচ্ছ। এই নতুনের শেষ নেই। এই স্বর্গেরও শেষ নেই।

 

এরপর মাটি পুড়ে ইট হলো। ইট দিয়ে ভবন হলো। ভবনের সেই ইট ঈশ্বরকে বলল, ইট হিসেবে আমার কার্য সম্ভবত সম্পন্ন হয়েছে, এবার আমাকে স্বর্গে নিয়ে চলুন।

ঈশ্বর বললেন, নিশ্চয়ই স্বর্গে যাবে তুমি। সময়ই তোমাকে দেখবে। একেবারে চিন্তা করো না। বলে তিনি চলে গেলেন।

তখন সেই ইট আরেকটা ইটকে বলল, কতবার ঈশ্বরের কাছে স্বর্গে যাওয়ার জন্য আবেদন করলাম। কিন্তু তিনি শুধু বলছেন, নিশ্চয়ই স্বর্গে যাবে তুমি। সময়ই তোমাকে দেখবে। একেবারে চিন্তা করো না। তাহলে এতদিনে তো আমার স্বর্গে থাকার কথা। কিন্তু হচ্ছে কী এসব!

অন্য ইট বলল, ঈশ্বর তো মিথ্যা বলছেন না।

প্রথম ইট বলল, মানে?

তখন দ্বিতীয় ইটটা বলল, এই যে পাতা থেকে মাটি, মাটি থেকে ইট হচ্ছ… এভাবে প্রতিবারই তুমি স্বর্গে যাচ্ছ। তুমি প্রতিবার স্বর্গের ভেতর দিয়েই নতুনভাবে তৈরি হচ্ছ। এই নতুনের শেষ নেই। এই স্বর্গেরও শেষ নেই।

 


মানুষ


 

লোকটা কবরস্থানের সব কবর খুঁটে খুঁটে দেখল। এপিটাফগুলো মনোযোগ সহকারে পড়ল। তারপর একসময় বের হয়ে এল। খুব বিষন্ন মনে হচ্ছিল তাকে। সেসময় সে পথ দিয়ে যাচ্ছিল এক পথিক। লোকটাকে বিষন্ন দেখে পথিক জানতে চাইল, কি হে, তোমার মন এত খারাপ কেন?

লোকটা বলল, সব এপিটাফে আমার নাম লেখা!

 

 এপিটাফের সব নাম আমার নিজের মনে হচ্ছে। আমি অবাক হচ্ছি, মৃত্যুর পর সবাই মানুষ হয়ে যায়!

 

পথিক আশ্চর্য হলো, এটা কী করে সম্ভব! বলে পথিক নিজেই কবরস্থানে ঢুকল। দেখল এপিটাফগুলোতে অনেক নাম। বলল, কই! এখানে তো অনেকের নাম।

লোকটা বলল, অনেকের নামই তো। সব মানুষের নাম।

পথিক বলল, কী বলছ!

তখন লোকটা বলল, আমি অসংখ্য জীবিত মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা আসলে মানুষই না। রূপকথার জীবন কাটিয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর পর এই কবরস্থানে দেখতে পেলাম ওরা সবাই মানুষ হয়ে গেছে। সেইসব মানুষই এখন আমার মনে ঢুকে গেছে। তাই এপিটাফের সব নাম আমার নিজের মনে হচ্ছে। আমি অবাক হচ্ছি, মৃত্যুর পর সবাই মানুষ হয়ে যায়!

 


একা


 

একা থাকার জন্য এক লোক বনে চলে এল। বনের একেবারে মাঝে এসে দেখল একজন সন্ন্যাসী ধ্যান করছে। লোকটি সামনে যেতেই সন্ন্যাসী চোখ খুলে বলল, এই গহিন বনে তুমি কীভাবে এলে?

লোকটি বলল, তুমি যেভাবে এসেছ!

সন্ন্যাসী লোকটির বাঁকা কথা বুঝতে পেরে বলল, তা বটে তা বটে! কিন্তু কী উদ্দেশ্যে আগমন?

লোকটি বলল, একা থাকব বলে এসেছিলাম। কিন্তু তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে একা থাকা হবে না।

সন্ন্যাসী আশ্চর্য হয়ে বলল, আরে, বলো কী! একা থাকার জন্য কেউ বনে আসে না-কি!

লোকটি বলল, জনমানব নেই, এখানেই তো শান্তি!

 

আমি একা থাকতে পারি না। কিন্তু সত্যি বলতে আমি কারো সঙ্গে নিজেকে শেয়ার করতে পারিনি। তাই বনে চলে এসেছি। এখানে আমি যখন চোখ বন্ধ করি, তখন সমস্ত জগৎ জেগে ওঠে আমার ভেতর।

 

সন্ন্যাসী বলল, বনে তো আরও অনেক বেশি বিষয়। গাছ, পাতা, ফুল, ফল, পশুপাখিই না শুধু … এই বনে রয়েছে বিশাল গভীর নির্জনতা… মানুষের চেয়ে বেশি জানান দেয় মনে। এখানে একা থাকা মোটেও সম্ভব না।

লোকটি বলল, একা থাকতে হলে তাহলে কী করতে হবে!

সন্ন্যাসী বলল, মানুষের সঙ্গে বেশি বেশি মিশতে হবে। যত বেশি মানুষের মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারবে ততই তুমি একা হয়ে যাবে। বনে এসে একা হওয়া যায় না।

লোকটি জানতে চাইল, তাহলে তুমি বনে এলে কেন?

সন্ন্যাসী বলল, আমি একা থাকতে পারি না। কিন্তু সত্যি বলতে আমি কারো সঙ্গে নিজেকে শেয়ার করতে পারিনি। তাই বনে চলে এসেছি। এখানে আমি যখন চোখ বন্ধ করি, তখন সমস্ত জগৎ জেগে ওঠে আমার ভেতর।

 


লেখক

চন্দন চৌধুরী
জন্ম ১৩ ডিসেম্বর ১৯৭৫, কুমিল্লা। স্নাতকোত্তর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। প্রকাশক।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
যাবে হে মাঝি, দিকশূন্যপুর [বলাকা, ২০০৩]
লাল কাঁকড়ার নদী [বলাকা, ২০০৭]
কাকের ভাস্কর্য [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ২০১১]
হাসির দেবতা [গদ্যপদ্য, ২০১৩]
অক্সিজেনের গান [গদ্যপদ্য, ২০১৪]
কন্যা কালীদহ [গদ্যপদ্য, ২০১৪]
মা-পাখি ম্যানিয়া [বেহুলাবাংলা, ২০১৫]
পাণ্ডবজন্ম [বেহুলাবাংলা, ২০১৫]
ঢাকা সিরিজ [বলাকা, ২০১৫]

ছোটগল্প—
আয়নাপাথর [কথাপ্রকাশ, ২০০৯]

অণুগল্প—
না-মানুষ [বেহুলাবাংলা, ২০১৭]

উপন্যাসিকা—
নীলতোয়া জোনাকি [বলাকা, ২০০৪]

শিশুতোষ গল্প—
গোল্ডফিশ ও একটি প্রজাপতি [বলাকা, ২০০৪]
শহরজুড়ে বাঘ-ভালুকের মিছিল [বলাকা, ২০০৮]
হ্যালো ফড়িংমিয়া [বলাকা, ২০১০]
দুষ্টুরা দশ মিনিট আগে [কথাপ্রকাশ, ২০১০]
ভূতের বাচ্চাটা ক্লাসে এলে কাঁদে [কথাপ্রকাশ, ২০১৪]
সাত রঙের ভাই বোন [বেহুলাবাংলা, ২০১৫]

শিশুতোষ ছড়া—
লাল ফড়িঙের বৌ [কথাপ্রকাশ, ২০১০]

অনুবাদ—
যাযাবব, মূল : কাহলিল জিবরান [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ২০০৮]
গহীনে গোপনে, মূল : কাহলিল জিবরান (যৌথ) [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ২০১১]
আরব বিশ্বের কবিতা [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ২০১৩]
নতুন ডানার উড়াল, পৃথিবীর তরুণ কবিদের কবিতা [কথাপ্রকাশ, ২০১৩]
অগ্রদূত, মূল কাহলিল জিবরান [বেহুলাবাংলা, ২০১৭]
পৃথিবীর ঈশ্বরের, মূল : কাহলিল জিবরান [বেহুলাবাংলা ২০১৮]

সম্পাদনা—
শূন্য দশকের গল্প [কথাপ্রকাশ, ২০১৩]

জীবনীমূলক—
বীরশ্রেষ্ঠ (ছোটদের) [কথাপ্রকাশ, ২০১০]
মাদার তেরেসা (ছোটদের) [কথাপ্রকাশ, ২০১১]
বিশ্বজয়ী বাংলাদেশি [কথাপ্রকাশ, ২০১৫]

ই-মেইল : chandan.kk75@gmail.com

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *