9th July, 2020 | | 0

জানালাটা জোনাকি হতে চেয়েছিলো

387 Views

Spread the love

‘আমাদের অফিসে কোনো জানালা নেই।
থাকলেও জানালা খোলার কোনো অনুমোদন নেই।’

 

এলিফ্যান্ট রোডস্থ ধানমণ্ডি সাতাশে ৩২ নম্বর বহুতল ভবনের দোতালার কোনো এক কোর্পরেট অফিসে যোগদানকালেই এরকম এক অদ্ভুত বিজ্ঞপ্তি মারফত জানালার বিষয়-আশয় জানিয়ে দেয়া হলো আমাদের। আমরা অ্যাপোয়েনমেন্ট লেটার হাতে জাপানি রোবটের মতো বসে বসে শুনছিলাম।

আর এভাবেই কোনো এক আমকেঠো জানালা জীবনের উন্মুখতায় পুনঃ প্রবেশ করে কোনো এক জানালাহীন জাদুর বিবরে।

এই যে না পারা বাক্সের ভেতর যাপন প্রণালী—এটা কি ক্রীতদাসের মতো পুঁজিবাদের পায়ে বিনম্রে শির নত করার সামিল নয়?—যাতে আমরা নুয়ে পড়ছি রেনেসাঁসের চাবুক থেকে চাকচিক্যময় এই কর্পোরেট বাক্স অব্দি!

এতসব থাকতে তারা জানালার প্রসঙ্গ টানলো কেনো—তা কোনোভাবেই কদর্য কোলাহলভর্তি এই নিউক্লিয়াজম নিউরনে ঢুকছে না। নেহাৎ—জানালা নেই কেনো?—এই মানতে না পারা বাচক প্রশ্নের প্রবল ঘূর্ণিতে পাক খাচ্ছি অ্যাকুরিয়ামিক ফিশের মতো যোগদান যাবৎ কর্পোরেট বাক্সের ভেতর। অথচ অনুমোদনযোগ্য কোনো শব্দ না থাকার অভিধানে উত্তরের কাঙ্ক্ষায় কারও ব্যক্তিত্বের উপরও প্রশ্নটা ছুড়ে দেয়া যায় নি অদ্যাবধি। এই যে না পারা বাক্সের ভেতর যাপন প্রণালী—এটা কি ক্রীতদাসের মতো পুঁজিবাদের পায়ে বিনম্রে শির নত করার সামিল নয়?—যাতে আমরা নুয়ে পড়ছি রেনেসাঁসের চাবুক থেকে চাকচিক্যময় এই কর্পোরেট বাক্স অব্দি!

এমন কী, বাসা খুঁজে না পাওয়া অব্দি যে সুহৃদের ছায়ায় আশ্রিত কোনো এক আমকেঠো জানালা—অন্তত সেই শাহেদুজ্জামানের মুখোমুখি হয়ে এখনও মুখ ফসকে প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে নি—সেই জানালা নেই কেনো বাচক কর্পোরেট বিহ্যাভ না জানা বিকলাঙ্গ বাক্যটা। কারণ, তার বাসাতেও কোনো জানালা ছিলো না। বস্তুত, সে ছিলো এক দরজা-জানালাহীন কোনো এক বোহেমিয়ান র‌্যাঁবোর ছায়া। কেবল একটা আবদ্ধ ঘরে কেমন যেন ডানা মচকানোর ব্যথা নিয়ে ডারউইনের বিবর্তিত পতঙ্গের সঙ্গে কয়েকরাত কাটানোর দৃশ্যে অভিনয় করা।

শেষমেশ, কয়েকদিনের জানাশোনা জাকির নামের কোনো এক জামকেঠো জানালায় উঁকি দিলে, আস্তে আস্তে খুলে যায় জানালা না থাকা আখ্যানের আবদ্ধ জানালাসমূহ।

এই অফিসের প্রতিটা রুমেই একটা করে সুদীর্ঘ জানালা ছিলো। বলতে পারেন—জানাগুলোই ছিলো অফিসের সমূহ স্বপ্ন ও সৌন্দর্যের চুম্বকচুম্বন। সেসব জানালার পাঁজরের শিক ধরে দাঁড়ালেই কমলালেবুর মতো কাচ ও কংক্রীটের খোসাবৃত শহরের নাভি দেখা যেতো। দেখা যেতো—সেই শহর কাঁধে ছুটে চলা মুখস্ত মানুষদের মিথ ও মন্থন।

আমার একটা একান্ত জানালা ছিলো। যার নাম কোনো এক গ্রামের খড়িমাটি দিয়ে লিখেছিলাম। যাকে আমি ফেলে এসেছি দূরতম কোনো এক বকুলপুরের পুরাণে।

কোনো এক মঙ্গলবারের মেঘলা বিকেলবেলা। বাইশে শ্রাবণের মতো মুষলধারায় ভাসছিলো কমলালেবু শহর-সমেত মুখস্থ মানুষদের মিথ ও মন্থন। বকুল ম্যাডাম তার ক্ষত-বিক্ষত রক্তাভ মেঘ-সমেত—স্বপ্ন ও সৌন্দর্য বিদীর্ণ করে অনন্তর অভিমুখে ঝাপিয়ে পড়লে—সমূহ জানালা বন্ধের বিজ্ঞপ্তি আসে কাচ ও কংক্রীটের কারচুপি দিয়ে। আর সেই থেকে এই অফিসে কোনো জানালা নেই। জানালা থাকলেও জানালা অবমুক্তের কোনো অনুমোদন নেই।

বুকল নামটা শুনলেই আমার বুকলপুরের কথা মনে পড়ে—যাকে আমি ফেলে এসেছি বার বছর আগে কাঁপাকাঁপা কোনো এক ম্যাপলকেঠো জানালায়।

জানালাহীন অফিসের দীর্ঘশ্বাস রক্তমাংসে মেখে সদ্য ভাড়াকৃত রুমে উঠলে দেখি—একটা আবদ্ধ জানালায় জমে আছে বার বছরের হাঁশফাঁশ ও ধূলিবালির অনির্ণীত কুয়াশা। ভাড়া নেবার কালে ভাড়াদাতা বৃদ্ধও—এই আবদ্ধ জানালার জার্নাল আমাকে বলেছিলেন স্থৈর্য গলায়। বলেছিলেন, বার বছর পর এই রুমটা তোমাকে ভাড়া দিলাম। কারণ, তোমার ভেতর শাদাফের ছায়া ফিরে এসেছে। আজ থেকে যে, বার বছর আগে এই স্বচ্ছ জানালা বিদীর্ণ করে ঝাপিয়ে পড়েছিলো, কোনো এক বকুল ফুলের গন্ধে অনন্তর অভিযোজনের কাঙ্ক্ষায়। এর খড়কুটো, ধূলিবালি ও সমূহ অন্তর্জাল আজ থেকে তোমার। ফলত অনেক খড়কুটো, ধূলিবালি ও সমূহ অন্তর্জাল ডিঙেই এই রুমে উঠতে হয়েছে কোনো এক আমকেঠো জানালাকে।

রক্তমাংসের ক্লেদাক্ততা ঝাড়ার আগেই, বার বছরের হাঁশফাঁশ ও ধূলিবালির কুয়াশা ঝেড়েমুছে আবদ্ধ জানালাটা অবমুক্ত করি। কেননা, আমার আবদ্ধ জানালায় দম খাটো হয়ে আসে। আমার কাছে আবদ্ধ জানালা মানে কোনো এক কফিনের ভেতর ঘুমিয়ে থাকার কসরত করা। বস্তুত, জানালা আমার আজন্ম প্রিয় এক অনুষঙ্গের নাম। আমার একটা একান্ত জানালা ছিলো। যার নাম কোনো এক গ্রামের খড়িমাটি দিয়ে লিখেছিলাম। যাকে আমি ফেলে এসেছি দূরতম কোনো এক বকুলপুরের পুরাণে।

শেষমেশ, আবদ্ধতা ভেঙে আমারই অপার শূন্যতার স্পর্শে চড়ুইডানার মতো কপাট দুটো খুলে যায় কোনো এক জীর্ণ জানালার। যার শরীরে রঙের বার্নিশ পড়ে নি হয়তো অনেক দিন—যার হাতে হাত রেখে কেউ কখনও আকাশ দেখতে দেখতে ইমোট সিডলের মতো গেয়ে উঠে নি—

‘আমারও পরাণ যাহা চায়, তুমি তাই, তাই গো’

দুই.

‘নগর-বন্দরে ঢের খুঁজয়াছি আমি
তারপর তোমার এ জানালায় থামি’

 

একটা খোলা জানালা দেখে খুলে যায় আরেক বেগানা জানালা। হঠাৎ করে খুলে যাওয়া কোনো এক জানালা দেখে বার বছর পর থমকে দাঁড়াই। জানালাহীনতার বিবর ভেঙে কোনো এক আমকেঠো জানালা অবমুক্ত হয়। পলকের পালক ছড়ায় সেই বেগানা জানালার বুকে। জনহীন জানালা কেবল তাকিয়ে থাকে বার বছর পর কোনো এক অবমুক্ত জানালার দিকে। যার কোনো নাম লেখা নেই খড়িমাটির অক্ষরে। কেবল তার সুদীর্ঘ রেলিঙের গলি পেরিয়ে বকুলের তীব্র গন্ধ ছুটে আসছে এই পুরাতন জানালার অভিমুখে। বকুলের গন্ধ মানে বকুলপুরে ফেলে আসা বিপুল বিকেল—গোলাপি ওড়নার ফরফর—লাল নীল সবুজ খড়িমাটির খুঁনসুটি।

জানালা হলো মনের মতো উন্মুখ আর কাচের মতো স্বচ্ছ। দৃশ্যত বন্ধ হলেও আদতে সে কখনো বন্ধ হয় না। চাবুক মারলেও তাকে আবদ্ধ রাখা যায় না। সে অবরুদ্ধ অন্ধকারেও জ্বলে উঠে জোনাকির মতো। তার নিভুনিভু বিভার বাঁকে আজন্ম লুকিয়ে থাকে জীবনানন্দের সত্তা।

কলেজে যাতায়াতকালে এরকম এক ম্যাপলকেঠো জানালা থেকে উড়ে এসেছিলো বকুল ফুলের খাম। যার সাহচর্যে নিশুতি রাত ফুড়িয়ে যেতো, তবু কথা ফুরাতো না অফুরন্ত ভার্জিনিয়া উলফের মতো। হাফপ্যান্টবেলায় জীবনের লক্ষ্য জানাতে গিয়ে মাতামহির মুখে কোনো এক অজানা জানালার গল্প শুনেছিলাম আমাদের আমকেঠো জানালার রেলিঙ ধরে। তিনি বলেছিলেন, জানালা হলো মনের মতো উন্মুখ আর কাচের মতো স্বচ্ছ। দৃশ্যত বন্ধ হলেও আদতে সে কখনো বন্ধ হয় না। চাবুক মারলেও তাকে আবদ্ধ রাখা যায় না। সে অবরুদ্ধ অন্ধকারেও জ্বলে উঠে জোনাকির মতো। তার নিভুনিভু বিভার বাঁকে আজন্ম লুকিয়ে থাকে জীবনানন্দের সত্তা। প্রত্যেক জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত—সেই জানালার অনুসন্ধানে অনুধ্যান করা।

কোনো এক নিশুতি রাতের মুষলধারে বাবা মাকে সিনার ভেতর জড়িয়ে ধরে বলতেন, জানালাই হলো আমাদের হৃদয়ের সমূহ অভিব্যক্তি। সেই থেকে মাকে বলতাম—আমার একটা দক্ষিনা জানালা চাই। আমার এমন পাগলামি আবদারের মুখে বাবা একবারই লালচে চোখের রাবার ঘষে বলেছিলন—পুরুষের কোনো জানালা থাকতে নেই, পুরুষ মানেই জানালা। কিন্তু সেদিন বাবার লালচে চোখের রাবারে আবলুশের আচ্ছন্নতা এনে কোনোভাবেই বলবার সাহস হয় নি—পুরুষ কখনও জানালা হতে পারে না, রমণী মানেই পুরুষের জানালা। কেবল মায়ের জোরাজুরিতে ম্যাপলকাঠে নির্মিত একান্ত একটা জানালা পেয়েছিলাম বলেই খুলে গিয়েছিলো আমার সমূহ অন্তর্জানালা।

শহরের সংখ্যাহীন জানালা দেখতে দেখতে প্রায় হাঁপিয়ে উঠেছে কোনো এক আমকেঠো জানালা। যার ঘাম থেকে উড়ে আসে বকুলপুরের সোঁদা ঘ্রান। যার গালে রয়েছে কোনো এক গ্রাম্য মায়ের নিখাদ চুম্বনের চিহ্ন। যে জড়িয়ে আছে—বৃদ্ধ বাবার অপার আকুতিগাঁথা দীর্ঘশ্বাসের আবলুশ। রোজকার জানালাহীন অফিস শেষে—রুমে ফিরে পুরাতন জানালার শিক ধরে নতুন জানালার দিকে তাকালে—ঝরে পড়ে সারাবেলার ক্লাউনক্লান্তি। চোখ ও চুম্বন ছুরির মতো চকচক করে ওঠে। কেবল একটা সুনসান ছায়া হেঁটে যায় সুদীর্ঘ জানালার আড়ালআবডাল জুড়ে। লাল আলোর বায়োগ্রাফি সবুজ পর্দায় পিতপিত করে জ্বলে আর নিভে জোনাকির মতো। অদৃশ্যত কিন্তু পরিচিত গান ও গন্ধ টের পাই সেই জানালা বিদীর্ণ করে আসা তিরতির হাওয়াই শরীরে।

একবার নজরুল জন্মজয়ন্তীতে কোনো এক জানালার ছায়া দেখে অন্তর্গত উন্মাদ পিয়ানো গেয়ে ওঠেছিলো—

‘আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন
দিল ওহি মেরা ফাঁস গায়ি
দিল ওহি মেরা ফাঁস গায়ি…’

সত্যি, সেই খোঁপার বাঁধন থেকে আজো আমার উন্মুখতাকে ছিন্ন করতে পারি নি—পারি নি কোনো এক আমকেঠো জানালাকে অবমুক্ত করতে। মিথ্যে খুনের মামলায় পলাতক কয়েদির মতো কেবল সেই জানালার জাল ও জলাশয় থেকে পালিয়ে এসেছি—এই কাচ ও কংক্রীটের দীর্ঘশ্বাসজাত শহরের কদর্য কোলাহলে।

বার বছর ধরে—কোনো এক জানালা ভাঙার দুঃস্বপ্ন দূরারোগ্যর মতো ছড়িয়ে আছে আমার আজন্ম অস্থিমজ্জায়। কিন্তু জানালা আমি ভাঙতে চাই নি। আমি চেয়েছিলাম—জানালাটা জোনাকি হয়ে যাক। অবরুদ্ধ অন্ধকার-বিবর থেকে নিভুনিভু বিভায় কোনো এক আমকেঠো জানালাকে অবমুক্ত করুক। এইসব দুঃস্বপ্ন ঘুম ও ঘোরের ঘোড়ায় ছুটতে ছুটতে কোনো এক বকুলপুরের বুকে হোঁচট খেলে জেগে ওঠি। মধ্যরাতে—কেবল নিষ্কাম নিশাচরের মতো সিম্ফনি তুলি। আমার উপর চাপিয়ে দেয়া জীর্ণ জানালার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকাই। দৃষ্টি এক জানালা বিদীর্ণ করে ডুবে যায় আরেক জানালায়। শিশ্ন ও শীৎকার ভেসে আসে দূরজানালার অন্তর্জাল থেকে। তীব্র শীতার্ত পশমের ভেতরেও দগদগে দুপুর ঘামতে থাকে, দুলতে থাকে সিংহের কেশর।

তিন.

তবুও সে ম্লান জানালার পাশে উড়ে আসে নীরব সোহাগে
মলিন পাখনা তার খড়ের চালের হিম শিশিরে মাখায়;
তখন এ পৃথিবীতে কোনো পাখি জেগে এসে বসেনি শাখায়;
পৃথিবীও নাই আর; দাঁড়কাক একা-একা সারারাত জাগে;
কিবা হায়, আসে যায়, তারে যদি কোনোদিন না পাই আবার।

 

মাঝেমধ্যে মনে হয়—জানালাটা আমার ছায়াসঙ্গি হোক। আমার ভাঙা ছায়ার সঙ্গে ঠোঁটে ঠোঁট মিলাক। আমার উশকোখুশকো আদলের পাশে টুপ করে রক্তকরবীর মতো স্ফূটিত হোক। জীবনের উদ্ভটতা দেখে আমাকে উন্মাদ ভাবুক। ভাবতে ভাবতে বকুল ফুলের মতো আলতো করে হাসুক। বিব্রত ময়ূরের মতো আমার জানালা নিয়ে অহেতুক প্রশ্নের মেখম মেলুক। কিন্তু সেই মনোকাঙ্ক্ষার যোগফল কোনোদিনও মিলে না এই আমকেঠো জানালার। আর এভাবেই একটা জানালা আরেকটা জানালার দিকে চেয়ে থাকে বিনীতভাবে। চেয়ে থাকতে থাকতে খসে যায় পঞ্জিকার পাতা থেকে ফাগুনের পর ফাগুন—বর্ষার পর বর্ষা। তবু আগুন নেভে না, বর্ষণ থামে না। কোনো এক ফাগুনে জানালা বন্ধের নোটিশ আসে সেই বৃদ্ধের হাত ফসকে। আবদ্ধ জানালা মানে কোনো এক কফিনের ভেতর ঘুমিয়ে থাকার কসরত করার মতো মনে হয় আমার। এজন্য রোডের পর রোড—লেনের পর লেন—ননস্টপ চাকার মতো ঘুরতে ঘুরতে—অবর্ণনীয় ট্রাফিকজ্যাম আর রেড সিগন্যাল পার হয়ে এই দক্ষিনা জানালাময়ী রুমটা ভাড়া নিয়েছিলাম। জানালা থেকেও যদি জানালা খুলতে না পারি, তাহলে রুম দিয়ে কী হবে! যেমন শরীরে যদি মন না থাকে, তাহলে সে শূন্য শরীর দিয়ে মানুষকে দৃশ্যত মাংসল উৎফুল্লতা দেখালেও আদতে সে অন্তরে সুখী নয়। আমাদের এই ভঙ্গিমাই হয়তো শেক্সপিয়রের জীবনী ফসকে গড়ে উঠেছে পৃথিবীর সমূহ নাট্যশালা।

শরীরে যদি মন না থাকে, তাহলে সে শূন্য শরীর দিয়ে মানুষকে দৃশ্যত মাংসল উৎফুল্লতা দেখালেও আদতে সে অন্তরে সুখী নয়। আমাদের এই ভঙ্গিমাই হয়তো শেক্সপিয়রের জীবনী ফসকে গড়ে উঠেছে পৃথিবীর সমূহ নাট্যশালা।

অতএব, আমি রুমটা ছেড়ে দিই একান্ত করে নেয়া জানালাসমেত। জানালার পাশে পাথুরে টবে কাদামাটির গর্ভ ফুঁড়ে উঠা রক্তগোলাপের কেবলই কুঁড়ি ফুটতে শুরু করেছিলো। লাল আর থোকা থোকা। তার লালচে গহিনের গহন থেকে ভেসে আসছে যেন অব্যক্ত আকুতিনামার অস্ফূট আওয়াজসমূহ। অথচ এই রক্তগোলাপটাকেও ছেড়ে যেতে হচ্ছে ভেবে নিদানের কান্না ও করুণায় উপচে পড়ছে আমার ভেতর-বাহির। এমন কী, পরস্পর মুখোমুখি হয়ে বসে থাকা দুটো জানালারও অব্যক্তনামা।

বার বছর পর—বাইশে শ্রাবণের মুষলধারে ভিজতে ভিজতে কোনো এক সুইসাডালের রিপোর্ট করতে গেলে সেই জানালার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। দেখা হয়ে যায় তার ছায়া, গান ও গন্ধের সঙ্গেও। কিন্তু এভাবে আমরা দেখা করতে চাই নি। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে বুকের ভেতর জগদ্দল পাথর চেপে একটা রিপোর্ট প্রস্তুত করি। ‘জানালাটা জোনাকি হতে চেয়েছিলো’—শিরোনামে দৈনিকের ফ্রন্ট পেইজে প্রকাশ হলে আমাকে নিয়ে হইচই পড়ে যায়। একটা জানালাহীন অফিসে চাকরি করে এত জানালার খবর জানলাম কী করে!

‘তারাও কাল জানালার ভিতর দিয়ে
অসংখ্য মৃত আকাশ সঙ্গে ক’রে এনেছে;
যে—রূপসীদের আমি এশিরিয়ায়, মিশরে,
বিদিশায় ম’রে যেতে দেখেছি।’

 


রেজাউল ইসলাম হাসু

জন্ম ১০ ডিসেম্বর, ১৯৮৭; রংপুর।

শিক্ষা : হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর, সরকারি বাঙলা কলেজ, ঢাকা।

পেশা : চাকরি [একটি বেসরকারি সংস্থায় উন্নয়ন-কর্মী হিসেবে।]

প্রকাশিত বই—
ওকাবোকা তেলাপোকা [শিশুতোষ, ২০১৬]
এলিয়েনের দেশ পেরিয়ে [শিশুতোষ, ২০১৭]

সম্পাদনা : বেলাভূমি.কম [বাংলা ভাষার সৃজনে অনলাইন সাহিত্যপত্রিকা]

ই-মেইল : rejaulislamhashu1987@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *