ঠিকরে পড়া আভা

211 Views

Spread the love

গৌর হাসানের নেশা আভা দেখা। উপচে পড়া আভায় গৌর হাসান খুঁজে পায় প্রশান্তির ঢেউ, সুখের কিনার। মানুষের ইচ্ছে, চাহিদার বিচিত্রতা ব্যাপক। গৌর হাসানের বেলায়ও তাই। আর দশটা পুরুষ-মানুষের মতোই তিনি। তবুও একটু আলাদা। বৈশিষ্ট্য গুণাগুণে তার অবস্থান সোজা কথায় বলা সম্ভব না। স্থিরতা তার ধ্যান। দৃষ্টি-শৈলী তার প্রেষণা। এখানে তিনি সময়ের সীমাবদ্ধতার কাছে নতি স্বীকার করেন না। মুগ্ধ হয়ে দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতে পারেন আভাময় মোহে। পৃথিবীর সবকিছু অগ্রাহ্য করে তিনি এই বৃত্তের চারপাশে আবর্তিত হতে ইচ্ছুক। কারণ, যতটা সম্ভব তিনি আভায় ডুবে থাকতে চান। মাংশ বা রত্নভোগ গুহার চেয়ে আভাই তাকে সবচেয়ে বেশি টানে। সে আভা বাহুর আভা!

সেই সকাল থেকে বুকপকেটে মোলায়েম রুমাল রেখে তিনি সোফায় আরাম করে বসে আছেন। শার্টের প্রতিটি বোতাম অতি যত্নসহকারে শরীরকে শিকলবন্দি করে রেখেছে। বোতামকে শিকল বললে ভুল হবে। তার ইচ্ছে ও মোহের ধরনই সবচেয়ে বড় শিকল। চশমার ওপাশে একজোড়া নিস্পলক চোখ! আশা-আকাঙ্ক্ষায় উদগ্রীব দৃষ্টির পরিসীমা। তৃপ্তির তেষ্টায় কেবল দৃশ্যজলের স্বপ্ন। যেদিকে তাকায় সেদিকেই খোঁজে মায়াবতী ঝর্ণার ঝিরিঝিরি ছন্দ!

কখন আসবে মায়াবতী?

কিছুক্ষণ আগেই ফোনকলে কথা হলো। বলছিল ঠিক সকাল সাড়ে এগারোটায় পৌঁছে যাবে। এখন পৌঁনে বারোটা বাজে। মায়াবতী সঠিক সময়ে না-এলেও গৌর হাসানের মনে বিরক্তি জাগবে না। ব্যাপারটা অন্য কারোর ক্ষেত্রে হলে রেগে ফায়ার হয়ে ওঠতেন। আজকের ছুটিটা তিনি নিয়েছেন মায়াবতীর সাথে সময় কাটানোর জন্য। গৌর হাসানের স্ত্রী এখন অফিসে। মেয়েটা স্কুলে। ওরা কেউ বিকেল চারটের আগে ফিরবে না। এই গোটা সময়টাই গৌর হাসান আপন মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে কাজে লাগাবেন।

কলিং বেল বেজে ওঠলো। ছিদ্রে চোখ রেখে দেখলেন—দরোজার ওপাশে একটি মেয়ে। গৌর হাসানের কাছে এই মেয়েটিই মায়াবতী। আভা মুগ্ধতাময় প্রতিটি মেয়ের বাহুতে এই নেশা। আজকের মেয়েটি দেখতে উজ্জ্বল শ্যামলা। গায়ে কলাপাতা সবুজ রঙের জামা। কপালে সবুজ টিপ। ঠোঁটে সবুজ লিপস্টিক। মুখটা গোলাকার ও লম্বাটে আকারের মাঝামাঝি। দৃষ্টি নন্দিত ছিপছাপ দেহের গড়ন। মায়াবতীর বয়স কত হবে? একুশ-বাইশ হবে নিশ্চয়ই। দরোজা পেরিয়ে মেয়েটি ঘরে আসে। গৌর হাসান দরোজার ইলিংশ লকটা অফ করে সামনে তাকান। চোখ জোড়া আনন্দিত হয়ে ওঠে। সোফায় বসে মুখে হাসি টানেন। হাতব্যাগটা টি-টেবিলে রেখে মেয়েটি সামনের দিকে এগোয়। চমৎকার পারফিউমের ঘ্রাণে ঘর ভরে ওঠে। ওপাশটা ঘুরে মায়াবতী গৌর হাসানের বাম পাশে সোফায় বসে।

নন্দিনী গৌর হাসানের কাছে এসে বগলের নিচ দিয়ে কাঁধে হাত রাখে। অপর হাত মুখের খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে বুলায়। চোখের চশমাটা ধীরে নামিয়ে আনে।

মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে। জানালার ওপাশে থাকা লম্বাটে নারকেল গাছটা কৌতূহলী পাতাদের ফুঁসলিয়ে দিচ্ছে ঘরের ভেতর উঁকি দেবার জন্যে। ওদের কৌতূহলী নজর জানতে চায় কী হচ্ছে ঘরের ভেতর? কী আর হবে? এমন আহামরি কিছু তো গৌর হাসান আর মায়াবতীর মধ্যে হবে না। তবু যা হবে তাই দেখতে চায় বাইরের পথিকেরা। এসবে ভ্রুক্ষেপ নেই গৌর হাসানের। তিনি সোফা থেকে উঠে পাশের কক্ষে এগিয়ে যান। ফ্রিজ থেকে সামান্য মিষ্টি আর একথোকা আঙুর এনে দুটো পিরিচে সাজিয়ে রাখেন।

ধীর স্বরে বলেন, খেয়ে নিন।
মায়াবতী বলে, এক গ্লাস পানি।
গৌর হাসান দ্রুত পানি নিয়ে আসেন। সরি, প্রথমেই পানি দেওয়া উচিত ছিলো।

পানিটুকু গলায় ঢেলে মায়াবতী বলে, ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক। আপনি তো আর ঘরের বউ নন। এতটা খেয়ালি হবেন কেমনে কইরা?

তা ঠিক বলেছেন।
হুম, এখন আরম্ভ করেন। যতটা সম্ভব আগেভাগে যেতে পারলেই আমার জন্যি ভালো।
এত তাড়া কেন? আমরা বিকেল পৌঁনে চারটা অবধি থাকতে পারি। লাঞ্চটা এখানে সেরে নিবেন।

তা পারি। তবে কাজটা আগে শেষ হলে বেলা থাকতে স্নান করে নেওয়া যাবে। তারপর না-হয় বিছানায় শুইয়া তরতাজা শরীরে একটু জড়াজড়ি, ঘষাঘষি, কিসিং করবেন। হাসে মায়াবতী।

না, না। এতসব কিছুর কথা বলছি নে। আপনাকে তো আফজাল ভাই সবকিছু বলে দেওয়ার কথা।

হ্যাঁ, হ্যাঁ, সবই বলে দিয়েছেন। তারপরও আপনার এত সংকোচ কিসের? আসেন, নন্দিনীকে টাকার বিনিময়েই তো পাইলেন। হাতের কাছে পেয়ে ইচ্ছে কেন জমায়া রাখবেন? ঘরের জিনিস তো প্রতিদিন। আজ না হয় বাইরের কিছু।

তোমার নাম নন্দিনী?

হুম। এই তো সহজে আপনি থেকে তুমিতে নাইম্যা আইলেন। এসবে সংকোচ করন মানে অযথা টাইম লস। কোনো জায়গায় লসের কাম করবেন না। তাইলে চরম ধোঁকা লাগবো কপালে। শরম এই কাপড় থাকা পর্যন্তই। তারপরে সব বানের জলের লাহান ভাইস্যা যাইবো। এহন কাছে আসেন তো..

নন্দিনী গৌর হাসানের কাছে এসে বগলের নিচ দিয়ে কাঁধে হাত রাখে। অপর হাত মুখের খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে বুলায়। চোখের চশমাটা ধীরে নামিয়ে আনে।

গৌর হাসান মায়াবতীদের সাথে যোগাযোগ করে একটা বিশেষ উপায়ে। প্রাথমিকভাবে শুরুর মাধ্যম ছিলো সোস্যাল মিডিয়া। ওখানে দেওয়া নম্বরে কল করার পর এসবের দালাল আফজাল শেখের সাথে পরিচয় ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গোপনীয়তার নিরাপত্তা ও বিশ্বস্ততার মাঝে বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে নেশাময় নেশার খেলা। লেনদেন চলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। তারপর আফজাল শেখ গৌর হাসানের চাহিদামতো মায়াবতীদের পাঠিয়ে দেয়। কখনো সুযোগ মিলে গেলে বাসায়। নয়তো ভালো কোনো হোটেলে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা কাটিয়ে তৃপ্তি নিয়ে ফিরেন গৌর হাসান। ইচ্ছের অনন্ত ব্যাধি তাকে এভাবেই বহু বছর ধরে মস্তিষ্কের পরতে পরতে ঘুণপোকার মতো কামড়াচ্ছে আর কামদৃষ্টির দাম্পত্যে সাধ পূরণ করতে বাধ্য করে।

হকচকিয়ে ওঠেন গৌর হাসান। নন্দিনীকে সরিয়ে দিয়ে সোফা ছেড়ে দাঁড়ান।
কী হলো, তুমি কী আনন্দ পাচ্ছো না? নন্দিনী আবারো গৌর হাসানের কাছে এগিয়ে যায়।

মেয়েটির মুখে তুমি সম্বোধনে গৌর হাসানও অনুরূপভাবে বলে, নন্দিনী তুমি জানো না। তোমাকে কেন আমি ডাকিয়ে এনেছি।
ও মা, কয় কী? কী কথারে বাবা। বেশ্যা মেয়েদের মানুষ ঘরে ডাকে কীসের জন্যি। তা বুঝি আমার আজো জানা হইলো না।

না, জানা হয়নি। দেহের এসব ক্ষুধা আমি আমার স্ত্রীর শরীরে প্রতিদিনই পাই। একটা ভিন্ন ক্ষুধা আমাকে তাড়িত করে। তার জন্যই মায়াবতীকে কাছে ডাকি।

তো এই মায়াবতীটা কে?
যাদের কাছে টানি, কাছে ডাকি, যারা আমার পিপাসা মেটায় তারাই মায়াবতী।

ওমা, তওবা, তওবা। এই তবে কাহিনী। অইলো, তো মায়াবতীর কাছে আপনি এহন কী চান শুনি? শরীর ঘষবেন নাকি চুষবেন?
আমি দেখবো, আভা দেখবো।

ওইটা আবার কী জিনিস?
বলছি এখুনি। কাছে এসো।

একটা ভিন্ন ক্ষুধা আমাকে তাড়িত করে

গৌর হাসান চোখে চশমা এঁটে নেন। নন্দিনীকে কাছে টেনে বসান সোফায়। নন্দিনীর বাম হাতটা তুলে ধরেন।
তোমার গায়ের রঙটা দেখেছো কেমন?
কী আর দেখমু। ছাই রঙ। শ্যামলা মেয়ের মার্কেটে দাম কম।
গৌর হাসান নন্দিনীর হাতে আঙুল ছুঁইয়ে দিয়ে বলেন, এই হাতের শ্যামল রঙের ভেতরে ঢাকা পড়েছে আরেকটা মাধুরী শ্যামল। আমার যত ক্ষুধা ঐ রঙের আভার প্রতি।
কী কন? কিছুই তো বুঝতে পারছি না।

দেখবে সে আভা? সূর্যের আঁচ দেহের বাইরে সবখানে এঁকে দিয়েছে আঁধারি প্রলেপ! কিন্তু অন্তরালে বন্দি থাকায় সে আভা শুষে নিতে পারেনি। অতি গোপনে লুকিয়ে রয়েছে আসল রূপরেখা।

গৌর হাসানের কথা শুনে মুগ্ধ হয় নন্দিনী।
আচ্ছা, একটা প্রশ্ন করি?
বলো,
আপনি কি কবি?
না, আমি কবি হতে যাবো কেন? আমি সামান্য ব্যাংকার।

কবিদের মতো সুন্দর করে কথা কইতেছেন তো। তাই মনে হইলো কবি। একবার এক কবির বাসায় দুই দিনের জন্যে গতর খাটতে গেছিলাম। লোকটা পাগলের মতো পায়ে চুমা দিতো আর কবিতা শুনাইতো। পরেরদিন বাসায় তার স্ত্রী আইস্যা হাজির। তারপর আর কী। বিলটা হাতে লইয়া কাইট্টা পড়লাম। আর ঘরের ভেতরে পইড়া রইলো সর্বনাশা আগুন

গৌর হাসান নিজের স্ত্রীর কথা মনে হতেই একবার ঢোক গিললেন। ঘড়িতে সময় দেখলেন। সাড়ে বারোটা বাজে। নন্দিনীর চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, দেখো, আভা দেখো…

কোথায় আভা? কিসের আভা? যতসব আবালের মতো কথা কন…

এদিকে তাকাও। এই রঙটার পরিবর্তন দেখো। একটু একটু উপরের দিকে তাকাও। দেখলে তো কেমন ফর্সাভাব স্পষ্ট হচ্ছে। এই আভা মঞ্চের আলোয় দিগবিদিক ঝলসে চোখ ধাঁধিয়ে বেরিয়ে আসে। আর আমাকে বারবার আহত করে। তোমাদের মাঝে আমি খুঁজি সেই মায়াবতীকে। খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে শান্ত হই। অতৃপ্ত হয়েই তৃপ্ত রই।

নন্দিনীর আপনি-তুমির মিশ্র সম্বোধনের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেন না গৌর হাসান। তিনি নন্দিনীর হাতের কনুইয়ে আঙুল নাচিয়ে বলেন, এদিকে তাকাও। এই রঙটার পরিবর্তন দেখো। একটু একটু উপরের দিকে তাকাও। দেখলে তো কেমন ফর্সাভাব স্পষ্ট হচ্ছে। এই আভা মঞ্চের আলোয় দিগবিদিক ঝলসে চোখ ধাঁধিয়ে বেরিয়ে আসে। আর আমাকে বারবার আহত করে। তোমাদের মাঝে আমি খুঁজি সেই মায়াবতীকে। খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে শান্ত হই। অতৃপ্ত হয়েই তৃপ্ত রই।

গৌর হাসান নন্দিনীর কনুইয়ের কিছুটা উপরে শেমিজের হাতা স্পর্শ করেন। হাতা ধীরে ধীরে কাঁধ পর্যন্ত উপরে তোলে দেন। বগলতলে জমে থাকা পারফিউমের ঘ্রাণ মুক্তি পায়। গৌর হাসানের নাকে ধাক্কা দেয়। নন্দিনীর বাম বাহুর অধিকাংশ বেরিয়ে আসে।

একটু দেখো। হাতের কব্জি থেকে কনুই পর্যন্ত কম উজ্জ্বল শ্যামল রঙ। আর কনুই থেকে কাঁধের রঙরূপ কেমন পাল্টে হয়েছে জ্যোতির্ময়।

নন্দিনী গৌর হাসানের চোখের দিকে তাকিয়ে হাসে। অনেকক্ষণ পর বলে, আরে বোকা বুদ্ধুরাম, এটা শরীরের ময়লার ফাঁদ। ঘরে-বাইরে কাজকর্মের দাগ লাগছে। বাতাসের উইড়া আসা ধূলির বাসা এইটা বুঝলেন? তাই এমুন কাইল্যা ভাব!
গৌর হাসান নন্দিনীর বাম হাতের পেশিতে চুমু খেয়ে বলেন, সব বুঝি আবার কিছুই বুঝি না। এই ফাঁদেই আটকা পড়েছি আমি। আমি খুঁজে বেড়াই আজ থেকে পঁনের বছরের আগের স্মৃতি! এই ফাঁদ ধূলির ফাঁদ নয়। এখানে রহস্য এসে কুঠি গড়েছে আর মায়ার জাল ছড়িয়ে দিয়েছে হৃদয়রন্ধ্রে।

থাক, থাক। এইভাবে কবির মতোন কথা কহনের কাম নাই।

নন্দিনী বুকের ভেতর জাগিয়ে তোলে নিঃশ্বাস তরঙ্গ। পুরুষদের আকৃষ্ট ও সন্তুষ্ট করার জন্য এটা ওর একটা বিশেষ কৌশল।

গৌর হাসান মুগ্ধতায় মাতাল হয়ে আভা দেখেন। আভার বিস্তৃতি খুঁজতে তিনি নন্দিনীর শেমিজ খুলে শরীরে হাত বুলান। পেছনে ফিরতেই চোখ যায় চুনকাম করা নতুন দেয়ালের মতো কিংবা পড়ন্ত বিকেলের খেলার মাঠের মতো মসৃণ উদ্যানময় পিঠে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে গৌর হাসানের মনে হয় পুরো পিঠ একটা দিগন্তজোড়া রহস্যময় আয়না। সে আয়নায় তার নিজের ছবি ফুটে ওঠে। ছবি দেখতে দেখতে নন্দিনীর গ্রীবায় তার চোখ পড়ে। দেখে গলাবৃত্তের চারপাশ থেকে কেশের শেকড় ও গ্রীবা থেকে কানের প্রান্তসীমা জুড়ে শ্যামলের অনুজ্জ্বল প্রলেপ। আর শরীরিক আভার উজ্জ্বল আকাশ কাঁধ থেকে নেমে গেছে স্তন উপত্যকায়। উজ্জ্বলতায় স্তন জোড়া চমক ছিটিয়ে দেয় চারপাশে আর দো-আঁশ রঙের বোঁটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তার সাদৃশ্যের ঐকতান হাতের অনুজ্জ্বল কব্জির সাথে।

সাদা ও কালো পাশাপাশি দেখে সাদার প্রতি আকৃষ্ট হবার ধ্যানে আকুল হয় গৌর হাসান। আর মনে মনে বলেন, সবই ধোঁকার খেলা। মস্তিষ্কের ফাঁকিবাজি। তাঁর স্মৃতির ভেতর রহস্য-প্রজাপতির হাজারো মথ মোচড় দিয়ে উঠে। এদিকে নন্দিনী বুকের ভেতর জাগিয়ে তোলে নিঃশ্বাস তরঙ্গ। পুরুষদের আকৃষ্ট ও সন্তুষ্ট করার জন্য এটা ওর একটা বিশেষ কৌশল। গৌর হাসানকে জাপটে ধরে নন্দিনী। ঠোঁটে ঠোঁট বসাতে গিয়ে প্রত্যাখাত হয়।

গৌর হাসান বলেন, উঁ-হু, ওসব নয়।
কেন নয়? যন্ত্রণা জাগছে যে।
ছুটি দাও, মায়াবতী।

গৌর হাসান ডান হাতের তর্জনী দিয়ে কাল্পনিক রেখা আঁকে স্তনদ্বয়ের চারপাশে। একবার তাকায় হাতের আঙুলের দিকে আবার তাকায় স্তনের ব্যাসে। পলকপ্লাবনে ভাসতে থাকে এদেশ-ওদেশ। তাকানোর তেষ্টা এক অসীম ক্ষুধা। একবার মেটে তো আরেকবার জেগে ওঠে। গৌর হাসান নন্দিনীর শরীরের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস উপেক্ষা করে গায়ে পরিয়ে দেন শেমিজ। ওড়নাটা গলার ডানপাশে লম্বা করে ঝুলিয়ে দেন। সোফায় বসিয়ে আবারো বাম বাহুর হাতা উপরে তুলে দেন কাঁধ পর্যন্ত। একটু দূরে গিয়ে বসেন গৌর হাসান। দু চোখ ভরে দেখতে থাকেন রঙের ব্যবধান-খেলা। যে খেলা দেখতে দেখতে সময় ফুরাতে থাকে। এক সময় নন্দিনী বলে ওঠে, বহুত তো ধ্যান করলেন। পেটে ভীষণ ভুক লাগছে। যদি কোনো খাওন দেন আগে খাইয়া লইমু।
গৌর হাসান বলেন, জাস্ট পাঁচ মিনিট অপক্ষো করো।

ডাইনিং টেবিলে বসে দুজনই দুপুরের খাবার খেয়ে নিলেন। তারপর গৌর হাসান আবার আভা দেখায় মন দেন। আভার খেলা! এ খেলা দেখতে দেখতে তিনি এক সময় ঘেমে উঠেন। পকেট থেকে রুমাল বের করে কপাল মুছেন। গাল বেয়ে নেমে আসা নোনা বিন্দু মুছেন।

গৌর হাসানের এই আভাপ্রেম সেই ভার্সিটি লাইফ থেকে। একটি মঞ্চনাটককে কেন্দ্র করে। ওটা ছিলো রবি ঠাকুরের ‘রথযাত্রা’নাটক। মঞ্চস্থ হয়েছিলো পাবলিক লাইব্রেরিতে। ওখানে দেখতে উজ্জ্বল শ্যামলা রঙের একটি মেয়ে অভিনয় করেছিলো। গ্যালারির ঠিক সামনে বসেছিলেন গৌর হাসান। মেয়েটির জামার শর্টহাতা পেরিয়ে দেখা যেতো ওর বাহুর উজ্জ্বলতা! মায়াময় আভা! যে আভার প্রভাবে গৌর হাসানের ভেতরটা কেঁপে ওঠতো। এভাবেই আরম্ভ আভাপ্রেম। ঐ থিয়েটারের নাম ছিল মেঘনদী। খোঁজ নিয়ে জেনেছিলেন মেয়েটির নাম মায়াবতী।

এই আভা দেখতে পাওয়া যায় খেটে খাওয়া নারীর পিঠে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের বাহুতে।

মেঘনদী থিয়েটারের কোনো নাটক বা সাংস্কৃতিক আয়োজন কখনো গৌর হাসানের চোখ এড়িয়ে যেতো না। যতবার তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দেয়াল-সাঁটানো পোস্টারে দেখতেন ‘মেঘনদী’র কোনো আয়োজন আছে তো গৌর হাসান আকাশ-পাতাল পেরিয়ে ছুটে যেতেন সেখানেই। উদ্দেশ্য মেয়েটির বাহু থেকে উপচে পড়া আভা দেখা। সব আয়োজনে মায়াকে দেখা যেতো না। কখনো কখনো গৌর হাসানের স্বপ্ন পূরণ হতো আর পুরো সময়টা তিনি মঞ্চ থেকে আসা ঐ বাহুর আভা নিয়ে ব্যাকুল থাকতেন। হলে ফিরেও সেই একই দৃশ্য চোখের পরতে ধরে রাখতে চাইতেন। স্বপ্নেও এঁকে যেতেন মিষ্টি বাহুর রূপ-কারিশমা। আভা মায়াজাল, মায়াবতী আভা!

গৌর হাসান মায়াবতীর খোঁজ নিয়েছিলেন। ওদের বাসা ছিলো আজিমপুর। পরিবার খুব দরিদ্র। মায়ার বাবা একটি কলেজের কেরানি পোস্টে সামান্য চাকুরি করত। আর মায়া পড়তো একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে। টিউশনির আয়ে পড়াশোনার খরচ মেটাতো। রোজ মায়াবতী টিউশনি করতো আজিমপুর থেকে জিগাতলা হেঁটে গিয়ে। রোদ-বৃষ্টি, শ্রমে-ঘামে একাকার হয়ে নিত্যদিনের তারিখটা টইটম্বুর করে তুলতো। গৌর হাসান মায়াবতীকে দেখার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতেন ঢাকা কলেজের গেইট কিংবা সাইন্সল্যাব চত্ত্বরে। যতটা সম্ভব—চেয়ে থাকতেন ওর দিকে। বাহু ঠিকরে বেরিয়ে আসা আভা দেখে মেটাতেন অতৃপ্ত ক্ষুধা। তবে মায়াবতীকে কখনো প্রেমের প্রস্তাব দেবার ইচ্ছে জাগেনি গৌর হাসানের। তার মনের ভেতরটা কেবল আকৃষ্ট হতো বাহুর আভায়। কখনো শরীররহস্য উন্মোচনের স্পৃহা তৈরি হয়নি। বাইরের বিচ্ছুরিত এই আভা দেখতে দেখতে গৌর হাসান কাটিয়ে দিয়েছেন অনেকগুলো বছর। হঠাৎ একদিন তার খেয়াল হলো মায়াবতীকে আর দেখা যাচ্ছে না। আজিমপুরে বাসার ঠিকানায় খোঁজ নিয়ে জানলেন, মায়ার বিয়ে হয়েছে এক চাকুরিজীবি পাত্রের সাথে। গৌর হাসানের বুকের ভেতরটা তছনছ হতে থাকে। এক অবাক যন্ত্রণায় কেটে যায় অনেকগুলো দিন। গৌর হাসান নিজেকে প্রবোধ দেন—তাঁর তো প্রেম ছিলো ঐ বিচ্ছুরিত আলোক আভার সাথে। সময় ফুরিয়েছে তাই আভাও বিলীন হয়ে গেছে। রাত ফুরালে চাঁদের আভাও তো বিদায় নেয়। এরপর থেকে গৌর হাসান কেবল আভা খোঁজে বেড়ান। কিন্তু প্রথম দেখা ঐ আভার মতো মোহময় মাধুর্যের সন্ধান তিনি পান না। যা খোঁজে পান তাতেই মুগ্ধ হবার চেষ্টা করেন।

জীবন ও জগতের পথ চলতে চলতে গৌর হাসান আভা নিয়ে মনের ভেতর বয়ে বেড়াচ্ছেন বিচিত্র ভাবনা। নানা প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন হৃদয়ের পার্লামেন্টে। কেন এই আভার উৎপত্তি? সবার দেহের ভাঁজে আভা নেই কেন? তার স্ত্রী ঝর্ণা মিত্র কেন আভা বিহীন? প্রভৃতি প্রশ্ন। আভা গবেষণায় ডুবে থেকে এসব প্রশ্নের যৌক্তিক উত্তরও তিনি তৈরি করেছেন।

গৌর হাসানের মতে, আভা কেবল রোদে পোড়া লালাভ ফর্সা, শ্যামল ও উজ্জ্বল শ্যামল মেয়েদের বাহুতে দেখা যায়। তামাটে মেয়েদের শরীরেও উঁকি দেয় আভা। এই আভা দেখতে পাওয়া যায় খেটে খাওয়া নারীর পিঠে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের বাহুতে। উপরতলার ললনাদের শরীরে আভার দেখা প্রায় নেই বললেই চলে। বিত্তশালী পরিবারের কন্যাদের ফর্সা শরীর আলসেমি ও বিলাসী আভিজাত্য নিয়ে বেড়ে ওঠে। যেমনটা গৌর হাসানের স্ত্রী ঝর্ণা মিত্র। দেখতে ভীষণ সুন্দরী। কিছুটা অহংকারী। ধর্নাঢ্য বাপের মেয়ে। সারাজীবন এসি গাড়িতে চলে বেরিয়েছে। কখনো কষ্টের ছিঁটেফোটা অনুভব করেনি। ঝর্ণা মিত্রের পুরো শরীর ধবধবে ফর্সা হওয়াতে আভার আলাদা অস্তিত্ব নেই। এই ফর্সাভাব যেনো খসখসে সাদা কাগজ। আর জামা অলঙ্কার পরার পর বিলাসী বিজ্ঞাপনে ভরা সকালের পত্রিকার মতো লাগে। যেন মুগ্ধতার যথেষ্ট অভাব। খিটখিটে মেজাজ যেন কটমটে রাজনৈতিক নিউজের মতো। গৌর হাসানের কাছে উপরতলার সুন্দরীদের দেহ-সৌষ্ঠব একঘেয়ে লাগে। কারণ সারা জনম হাতড়েও ওখানে আভা বলে কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না। যা পাওয়া যায় তা হলো কামনার নোনা ঘাম ও রসমঞ্জরী। কামের নেশা কেটে গেলে তা আর কাছে টানে না।

বিকেল পৌঁনে চারটায় মুঠোফোনে অ্যালার্ম বেজে ওঠে। গৌর হাসান সচকিত হয়ে ওঠেন। পাশের রুম থেকে একটা হলুদ খাম নিয়ে এসে নন্দিনীর হাতে তুলে দেন। বলেন, তুমি যা চেয়েছিলে তার চেয়ে এখানে এক হাজার বেশি আছে।

হলুদ খামটা হাতে নেয় নন্দিনী। অস্পষ্ট স্বরে বলে, ধুত্তরি!

কিছু বললে?

না, কিছু না। এখন আমারে বিদায় করেন।

চলো, তোমাকে লিফটে তুলে দিই। গৌর হাসান নন্দিনীকে লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দেন।

নন্দিনী তীব্র রোষে বলে, টেকা দিলেই সব হয় না। একমুখী চাহিদার জীবন কোনো কামের না। দেহের ক্ষুধা দেহে পইড়া রইলো আর সাধু আছেন তার ধ্যান লইয়া। জীবনের পরথম দেখলাম এমন আজব খেলোয়ার..

লিফটের দরোজা মিলিয়ে যেতে যেতে শোনা যায়—যত্তসব আজাইরা পাবলিক…


সৌর শাইন

জন্ম ২৫ জানুয়ারি, ১৯৯৫; কাপাসিয়া, গাজীপুর। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক, ঢাকা কলেজ।

ই-মেইল : souroshine@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *