‘দুপুরের মতো দীর্ঘকবিতা’ পিয়াস মজিদের প্রাতিস্বিক কাব্যস্বর

393 Views

Spread the love

সমকালীন বাংলা কাব্যপরিমণ্ডলে চমকিত একটি নাম পিয়াস মজিদ। চমকিত হওয়ার কারণ, ইতোমধ্যে তিনি শিল্পসম্মত কবিতার স্রষ্টা হিসেবে যুগপৎ পরীক্ষিত, স্বতন্ত্রচিহ্নিত। কবিতার মতো অধরা শিল্পমাধুরীর খোঁজে সদা সন্তরণপ্রয়াসী তিনি। বয়সের বিবেচনায় তার কাব্যযাত্রা সদর্প, সমূহ সম্ভাবনায় উচ্চকিত। শিল্পের নিপুণতা অন্বেষণে ইতোমধ্যে বাহিত হচ্ছে তার ঘোরগ্রস্ত সময়। আমার সমবয়সী হাতেগোনা যেকজন কবিবন্ধু শিল্পসৃজনের অমেয় অনুধ্যান নিয়ে ক্রমশ অগ্রসরমান—পিয়াস মজিদ তাদের একজন। শিল্পযাত্রার নানামত্রিক অঙ্গনে তার অবিচল পরিভ্রমণ আমার মনে ঈর্ষাবৃক্ষের জন্ম দেয়। ভালো লাগে, ভালোবাসি তার এই শিল্পপ্রাণ মনোভঙ্গির স্বতঃস্ফূর্ত অভিযাত্রা।

শিল্পমালঞ্চে কবিতাই বোধকরি পিয়াসের প্রিয়তম ফুল। যাকে ঘিরে তার উদয়াস্ত ব্যতিব্যস্ত অন্তরতম সময় কাটে। কাব্যফুলের সুবাস শুঁকে অন্তহীন আচ্ছন্ন অপেক্ষা যেন। কেবল কবিতার জন্য অন্তর্মুখী হয়ে, সলাজে মুখ লুকিয়ে পিয়াসকে একলা হেঁটে যেতে দেখেছি। কারণ একই বিদ্যাপীঠে কেটেছে আমাদের উন্মথিত শিল্পসময়। কোনো একদিন সেইসব স্মৃতিপথ ঘুরে লিখবো হয়তো শিল্পযাপনের পরস্পর নিঃসঙ্গকালের কথা।

 

পিয়াস মজিদের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ দশটি। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে দীর্ঘকবিতার বই। নাম—‘দুপুরের মতো দীর্ঘকবিতা’ (ফেব্রুয়ারি ২০২০)। এযাবৎ প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে বইটি বিশেষ অভিনিবেশ দাবি করে। এই অভিনিবেশ নিশ্চয় বিষয় ও প্রকরণগত নিরিখনির্ভর। আবেগের চিরন্তন স্তরে নিমগ্ন থেকেও কবিতায় সংহত বোধের উৎসার এই গ্রন্থের বিশেষ লক্ষণীয় দিক। কবিতা ‘শব্দের খেলা’ ( Game of word) হলেও কবিতা যে কেবল সাদামাটা শব্দের সম্মিলন নয়, এমন বোধের ওপর পিয়াস মজিদের দৃঢ়তম আস্থা। ফলে দীর্ঘকবিতার এই গ্রন্থটি পেয়েছে ভিন্নমাত্রা। কবিতাচর্চায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসঞ্জাত কবির পক্ষেই কেবল এমন পারঙ্গমতা প্রদর্শন সম্ভব। কবি হিসেবে পিয়াসের কাব্যভাবনায় তেমন একাগ্রতা লক্ষণীয়—

“কবিতা এক কালোবর্ণ কুহক। বিষয় ও আঙ্গিক জেনে, ভাষার ওপর দখল নিয়েও এ কুহক চূর্ণ করা যায় বলে মনে হয় না। সারা জীবন কবিতা লিখেও এ কুহকের শেষ দেখা যায় না। অধরা মাধুরী যেন। যিনি কবি, তার উপর সেই কবিতাদেবীর জন্ম-জন্মান্তরের দণ্ডাজ্ঞা। এ দণ্ড থেকে, দায় থেকে তার মুক্তি নেই। রক্তাক্ত ও দণ্ডিত হওয়াই তার নিয়তি। আমি কবিতা লিখি; না লিখে পারি না বলে। নিজেকে নিজের কাছে, কাগজের সাদার কাছে প্রকাশের এমন সহজতম, দুরূহতম পদ্ধতি আর নেই। প্রেম-প্রত্যাখ্যান-দেশ-কাল-পুষ্প-বৃক্ষ-বিহঙ্গ সবই আমার কবিতার প্রেক্ষায় থাকে। বলা যায়, এদের প্ররোচনাই জন্ম দেয় এক একটি শব্দের, লাইনের এবং গোটা একটি কবিতার। যেন এক লঘু-ডানা অরণ্যের পরি।”

[কবিতা মূলত সর্বনাশপন্থিদের আখড়া]

‘দুপুরের মতো দীর্ঘকবিতা’—গ্রন্থে ৬টি কবিতা সন্নিবেশিত হয়েছে। ‘সমাধিবিতান’, ‘জীবনান্দ: আমার অসুখ ও আরোগ্য’, ‘অপুষ্পক উদ্ভিদের ছায়া’, ‘গোলাপের অভিঘাত’, ‘কুরুক্ষেত্রের আলোকুয়াশা’ এবং ‘মেঘের মঞ্জিল’। কবিতাগুলোর শিরোনাম অভিনব শব্দবন্ধে উপস্থাপিত হয়েছে। নামগুলো যেন ভাবের বিমূর্ত দেশে চিত্রময় বৃক্ষবীজ উপ্ত করে। ক্রমশ সেই বীজ একটা পরিণত সুশোভিত ভাববৃক্ষের ইঙ্গিত দিয়ে যায়। ছয়টি কবিতা ধারাবাহিক কোনো ভাবের বিস্তারকে ধারণ করেনি। স্বতন্ত্র কন্সেপ্ট নিয়ে কবিতাগুলো পরস্পর বিচ্ছিন্ন। মহৎকবিতা যেমন পাঠকের মনে মুহূর্তে ঘনঘোর মুগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে দেয়। গ্রন্থভূক্ত কবিতাগুলোও তেমন।

দীর্ঘকবিতায় ভাবের ধারাবাহী বিস্তার সবসময় প্রত্যাশিত নয়। থাকে বিচ্ছিন্ন অথচ ঘোরলাগা দীর্ঘভ্রমণ। মৃদু বাতাসে ফুলপাতার যেমন গোপন কানাকানি। দীর্ঘকবিতায়ও তেমন একটা নিঃশব্দ প্রবাহ থাকে।

‘সমাধিবিতান’ কবিতায় ব্যক্তিকবির অন্তর্গত অভিব্যক্তি উন্মোচিত হয়েছে। এই প্রকাশ স্বগতোক্তির আদলে, কখনোবা প্রশ্নমুখর সংলাপে। নিকটজন কিংবা পরিচিত পরিমণ্ডলে থেকেও কবি যেন নেই। সবার গতানুগতিক প্রত্যাশায় পানি ঢেলে কবি যাপন করেন রৌদ্রছায়ার অদেখা জীবন। অনুভব করেন ‘সমাধিবিতান’-এর নিষ্কলুষ আবহ। বোধের এমন বিন্যস্ত বিতান এই গণজনারণ্যে বিস্ময় জাগায় বৈকি। পিয়াস মজিদ এই মর্মে উচ্চারণ করেন অবাককরা পঙক্তি :

‘আমার বন্ধুদের বিস্ময় কী করে আমি এতো সুস্থ স্বাভাবিক
আমার পরিবার স্বজনের দুঃখ আমি ছেলেটা কেমন পাগলধারা!
কী করবো বলুন?
তারাপ্রবাহে ভাসতে গেলে দেখি
দশদিক থেকে আমাকে অন্ধবালারা ডাকছে
হঠাৎ আলোর ঝলকানির চেয়ে এরা হাজারগুণ প্রলুব্ধকর’

এই কবিতায় কবি’র মানসলোকের আভাস পাওয়া যাবে। ‘সমাধিবিতান’ ঘিরে স্বপ্ন-বাস্তবের যে ‘স্মৃতিপ্রসূ মন’। পিয়াস মজিদ সেটা অস্বীকার করতে পারেন না। কারণ তার কাছে—

‘স্মৃতি মানে জড়িবুটি
স্মৃতি মানে গোধূলিসন্ধি
স্মৃতি মানে সোনালি সংগোপন
স্মৃতি মানে পেনাল কলোনি
স্মৃতি মানে বহ্নিজল’

দীর্ঘকবিতায় ভাবের ধারাবাহী বিস্তার সবসময় প্রত্যাশিত নয়। থাকে বিচ্ছিন্ন অথচ ঘোরলাগা দীর্ঘভ্রমণ। মৃদু বাতাসে ফুলপাতার যেমন গোপন কানাকানি। দীর্ঘকবিতায়ও তেমন একটা নিঃশব্দ প্রবাহ থাকে। ‘সমাধিবিতান’ কবিতায় ব্যক্তি কবির অন্তঃপুর ছুঁয়ে যাওয়া কিছু পঙক্তি পাঠকের মনে রেখাপাত করবে সন্দেহ নেই।

কবিতার পঙক্তিতে নিবিড় নৈপুণ্যে অঙ্কিত হয়েছে জীবনানন্দসৃষ্ট কবিতার উত্তরাধিকার। অভিব্যক্ত হয়েছে ব্যক্তিকবির অসুখ ও আরোগ্যলাভের প্রেরণাসঞ্চারী অনুভব।

এই কবিতায় পিয়াসের একটি বিশেষ প্রবণতা চোখে পড়ে। কবিতার পঙক্তিতে প্রাসঙ্গিকভাবেই এনেছেন বিভিন্ন কবি-সাহিত্যক-শিল্পীর নাম। এসেছে গ্রন্থনাম এবং স্মরণযোগ্য শব্দবন্ধ। যেমন :

* ‘দশদিক থেকে আমাকে অন্ধবালারা ডাকছে
হঠাৎ আলোর ঝলকানি’র চেয়ে এরা হাজারগুণ প্রলুব্ধকর’
—এখানে ‘হঠাৎ আলোর ঝলকানি’ বুদ্ধদেব বসুর একটি কাব্যগ্রন্থের নাম।

* ‘তাই জাল স্বপ্ন ও স্বপ্নের জাল ধরা পড়েই
কৈশোর-যৌবন অতিবাহন’
—এখানে ‘জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল’ আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একটি গল্পগ্রন্থের নাম।

* ‘কখনো সখনো পালাবার চেষ্টাও করি
যাই জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কাছে।’
—এখানে ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ শহীদুল জহিরের গুরুত্বপূর্ণ একটি উপন্যাসের নাম।

এমনি করে ‘হোর্হে লুই বোর্হেস’, ‘অনুর পাঠশালা’, ‘মাল্যবান’, ‘উৎপল বসু’, ‘সিলভিয়া প্লাথ’,-এর মতো লেখকদের নামও গৌরবের সঙ্গে পঙক্তিতে উৎকীর্ণ হয়েছে। এসব প্রসঙ্গ প্রয়োগের ক্ষেত্রে পিয়াসের মুন্সিয়ানার ছাপ স্পষ্ট। অনুভূতিরঞ্জিত কাব্যময়তার ভেতর দিয়ে প্রসঙ্গগুলো কবিতায় আলোময় হয়ে ওঠেছে।

পিয়াসের কবিতায় ‘… বরিশাল, বগুড়া রোডের অবশিষ্ট থাম; বেলস পার্ক, অক্সফোর্ড মিশন, রক্তমুখী গির্জা’ যেমন আছে—তেমনি আছে ‘রমানাথ মজুমদার স্ট্রিট, মেসবাড়ি রাসবিহারীর মোড়, শম্ভুনাথ হাসপাতাল’। আছে ‘হোগলা-হরীতকী-হিজলের বন’, আছে ‘উৎপলা, মাল্যবান, কবিতার কথা, কট্টর সমালোচক সজনীকান্তের ‘উৎপাত’।

আধুনিক বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ দাশ উপচে পড়া এক নদীর নাম। যাঁর ব্যতিক্রমী কাব্যবৈভবে প্লাবিত হয়েছে বাংলা কবিতার বিস্তৃত প্রান্তর। ‘জীবনান্দ : আমার অসুখ ও আরোগ্য’, শীর্ষক কবিতায় পিয়াস মজিদ যেন জীবনানন্দের পোর্টেট এঁকেছেন অনুপম ভাষামাধুর্যে। কবিতার পঙক্তিতে নিবিড় নৈপুণ্যে অঙ্কিত হয়েছে জীবনানন্দসৃষ্ট কবিতার উত্তরাধিকার। অভিব্যক্ত হয়েছে ব্যক্তিকবির অসুখ ও আরোগ্যলাভের প্রেরণাসঞ্চারী অনুভব। শিল্পঋণ স্বীকারের পাশাপাশি কবি জীবনানন্দের প্রতি নিবেদিত হয়েছে একনিষ্ঠ শ্রদ্ধা। কবিতাটি পাঠান্তে পাঠক নিজেকে আবিষ্কার করবেন জীবনানন্দের শিল্পবারান্দায়। সংহত কাব্যভাষায় এসেছে জীবনবাবুর দুঃখভারাতুর জীবনালেখ্য। সমকালে সর্বত্র উপেক্ষিত কবি জীবনানন্দ দাশ। অন্তর্গত অভিমান ও বেদনায় ট্রাংকে আবদ্ধ রেখেছেন পাণ্ডুলিপি। হতাশায় আচ্ছন্ন কবিজীবন ট্রামলাইনে সঁপে চিরদিনের জন্য থামিয়ে দিয়েছেন জীবনপ্রবাহ। কবিতাটি শুরু হয়েছে এমন অন্তর্ভেদী হাহাকার নিয়ে :

‘ঘাসের ঘণ্টা; বেজে গেছে সময়সবুজ।
জীবন মানে ট্রাঙ্ক আর ট্রাম
ট্রাঙ্কভর্তি অবহেলিত গদ্য
আর ট্রামের তলায়
কাটাপড়া কবিতা, প্রার্থিত রক্তজ্ঞান।’

জীবদ্দশায় জীবনানন্দ দাশ কবিতার পাশাপাশি লিখেছেন গল্প, উপন্যাস এবং প্রবন্ধ। সেসবের অধিকাংশই অপ্রকাশিত থেকে গিয়েছিল। অথচ উত্তরকালে সেসব লেখা হয়েছে পাঠকনন্দিত। তাঁর কবিতা-গল্প-উপন্যাসের বেশকিছু চরিত্র পাঠকসমাজে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছে। স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো এখন আমাদের সত্তায় উজ্জ্বল। পিয়াস তার কবিতায় সেসবের উল্লেখ করেছেন। ব্যক্তি জীবনানন্দ এবং তাঁর সৃষ্ট শিল্পানুসঙ্গসমেত এই কবিতায় আছে দারুণ ভ্রমণ। কবিতাটি পাঠকালে একজন পাঠক জীবনানন্দের সাথে নিবিড়ভাবে পরিচিত হবেন। পিয়াসের কবিতায় ‘… বরিশাল, বগুড়া রোডের অবশিষ্ট থাম; বেলস পার্ক, অক্সফোর্ড মিশন, রক্তমুখী গির্জা’ যেমন আছে—তেমনি আছে ‘রমানাথ মজুমদার স্ট্রিট, মেসবাড়ি রাসবিহারীর মোড়, শম্ভুনাথ হাসপাতাল’। আছে ‘হোগলা-হরীতকী-হিজলের বন’, আছে ‘উৎপলা, মাল্যবান, কবিতার কথা, কট্টর সমালোচক সজনীকান্তের ‘উৎপাত’। কয়েকটি পঙক্তি পড়ে অন্তর যেন বেদনায় নীল হয়।

‘ঘুরে ঘুরে একা কথা বলার কে আছে—
মুদ্রাদোষে আলাদা হওয়া যেখানে এক প্রবল মুদ্রা
তখন কোথায় যাবে কুসুমকুমারীর ছেলে!
লাবণ্য ঢাকার মেয়ে
আইরিশ বিপ্লবের বই পড়ে
দাশের মনের বিপ্লব থেকে যায় অপাঠ্য
বিপ্লবী ভালোবাসে সোনাদানা তার, ব্যাংকের লকার’

নির্দিষ্ট পঙক্তির চেয়ে অখণ্ড কবিতাই বেশি দ্যুতি ছড়ায়।

‘অপুষ্পক উদ্ভিদের ছায়া’ নাট্যগুণ সমৃদ্ধ সংলাপ-সমর্পিত একটি কবিতা। কথোপকথনের ঢঙে দীর্ঘকবিতাটি ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। কবিতায় নারীপুরুষের চিরন্তন জিজ্ঞাসা ও অন্তর্দ্বন্দ্ব দর্শনসত্যে উদ্বোধিত হয়েছে। বোধকরি, পিয়াসের অনন্য কবিতাগুলোর একটি এই ‘অপুষ্পক উদ্ভিদের ছায়া’। নারী প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। পুরুষ সেই সেই জিজ্ঞাসার জবাব দেয়। অনুরূপ পুরুষও প্রশ্ন করে। নারী তার ঈষৎ অভিমানের ক্ষিপ্র উত্তর দেয়। যেমন :

নারী        : পুরুষ নারীকে এমন ভাবে
                                    যেন ল্যাবরেটরি।

পুরুষ     : নারী, আজ এই
                       দুর্ভোগের আদিও তো তুমি

নারী       : বল, শুনি
পুরুষ     : হাওয়া হয়ে আদমেরে
                          করিলে নিষিদ্ধের লোভী

নারী       : হাওয়াও কী হয়নি
                      পতিত আদমের জ্ঞাতি?
…. …. …. …. ….

পুরুষ     : না নারী না।
                         আমার অভীপ্সা তনু-ঊর্ধ্ব
                         কিছু। প্রেম যার নাম।

নারী      : প্রেম।
               টুপটাপ জল।
               জল থেকে তুমি জমেছ
                                পাহাড়; ঘৃণার
                                 অবিরাম অঞ্জলি।

আদতে এই কবিতার অংশবিশেষ উদ্ধৃত করা মানেই কবিতাটির খণ্ডিত উপস্থাপন। কারণ এই কবিতার গাঁথুনি বড়ই আঁটসাঁট। ইমারত থেকে একটি ইট খসে গেলে যেমন দেয়ালের সৌন্দর্যহানি হয়ে ধ্বসে পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়। এই কবিতাটিও তেমন। নির্দিষ্ট পঙক্তির চেয়ে অখণ্ড কবিতাই বেশি দ্যুতি ছড়ায়।

এই গ্রন্থের ‘কুরুক্ষেত্রের আলোকুয়াশা’ শীর্ষক কবিতাও অনুরূপ সংলাপ-সমর্পিত আঙ্গিক পরিদৃষ্ট হয়। ‘কুয়াশা’ এবং ‘আলো’ পরস্পর সমূহ সম্ভাবনা প্রাপ্তির প্রত্যাশায় কথোপকথনরত। যেমন :

‘কুয়াশা— ভাসতে হয় ভাঙা ভেলায়
                               কারণ জল মানে
                               শত শত বেদের কফিন

আলো— থাকো তুমি জলের কিনারে
                              চলি আমি নীলিমাবিশালে

কুয়াশা— দেখো দেখো নীলিমাও মেঘাক্রান্ত
                             চলো যাই পাহাড়বিলাসে’

সর্বোপরি, কবিতা এমন এক শিল্পপ্রকরণ যেখানে পাঠক কখনোই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার অধিকার রাখেন না। পাঠকের রুচিভেদে একই কবিতা বহু অর্থের ব্যঞ্জনা দেয়। মহৎকবিতার সার্থকতা বোধহয় এখানে।

দীর্ঘকবিতা একাধিক বিষয় ও ভাবকে উপজীব্য করে রচিত হয়। উপমা, প্রতীক কিংবা বাকপ্রতিমার পটুত্বের ভেতর দিয়ে কবি পাঠককে মোহাবিষ্ট করে নিয়ে যান কবিতার অন্তিম গন্তব্যে। দীর্ঘকবিতা দীর্ঘ বলে পাঠকের অধৈর্য হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। ফলে মনোযোগ ধরে রাখার জন্য মহৎকবি বেছে নেন দৃশ্যময় ভাষাভঙ্গি। পাঠকের কৌতূহল অটুট রেখে সমান্তরালে উদ্দিষ্ট বক্তব্য ছড়িয়ে দেন। পিয়াস মজিদের দীর্ঘকবিতায় এই প্রবহমানতা আছে। তিনি পাঠকের মনে ক্রমশ আবেশ তৈরি করেন। এই গ্রন্থের ‘গোলাপের অভিঘাত’, এবং ‘মেঘের মঞ্জিল’ শীর্ষক কবিতায় পিয়াসের অনুরূপ ঐকান্তিক প্রয়াস লক্ষণীয়।

কাব্যচর্চার শুরু থেকেই পিয়াস খুঁজে চলেছেন নতুন কাব্যলোক। কবিতার অলৌকিক আনন্দভার প্রকাশে স্বতন্ত্র ভাষা ও বিন্যাসের প্রতি রয়েছে তাঁর সচেতন মনোযোগ। ব্যক্তিগত ধারণা, রবীন্দ্রনাথ এবং জীবনানন্দ দাশের কাব্যভাষাকে আত্মস্থ করার ভেতর দিয়ে পিয়াস নিজের একটা প্রাতিস্বিক কাব্যভাষা তৈরির পথে এগুচ্ছেন। ইতোমধ্যে সমাসগঠিত নবতর কাব্যিক শব্দ সৃজনে একাগ্র প্রয়াস পাঠকের নজর এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়। তার কবিজীবনে আছে সমৃদ্ধ সচল ভ্রমণ। প্রবহমানতা। হয়তো সব কবিতা নয়; তবে কবি পিয়াস মজিদ স্বতন্ত্রভাবে শনাক্ত হওয়ার মতো কবিতা ইতোমধ্যে লিখিত হয়েছে।

পিয়াস মজিদের এই গ্রন্থে দীর্ঘকবিতার আঙ্গিকে কাব্যবোধের স্ফুরণ ঘটেছে। নিজেকে ভেঙে পুনরায় নতুন আঙ্গিকে নতুন কাব্যস্বরের সন্ধানে তার সচেতন মনোভাব লক্ষ করা যায়।

সর্বোপরি, কবিতা এমন এক শিল্পপ্রকরণ যেখানে পাঠক কখনোই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার অধিকার রাখেন না। পাঠকের রুচিভেদে একই কবিতা বহু অর্থের ব্যঞ্জনা দেয়। মহৎকবিতার সার্থকতা বোধহয় এখানে। কখনো কখনো স্বয়ং কবিও সুনিশ্চিত করে কবিতার সারবত্তা প্রকাশে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। কবির ভাবানুগ না হলেও একজন পাঠক কবিতাপাঠান্তে নিজের মতো ব্যাখ্যা হয়তো দিতে পারেন। তবে এই ব্যাখ্যাই চূড়ান্ত সমাধান নয়। শিল্পীমাত্রই প্রতিনিয়ত নবসৃষ্টির অন্তর্গত তাড়নায় বিপর্যস্ত থাকেন। পিয়াস মজিদের এই গ্রন্থে দীর্ঘকবিতার আঙ্গিকে কাব্যবোধের স্ফুরণ ঘটেছে। নিজেকে ভেঙে পুনরায় নতুন আঙ্গিকে নতুন কাব্যস্বরের সন্ধানে তার সচেতন মনোভাব লক্ষ করা যায়। ‘দুপুরের মতো দীর্ঘকবিতা’ বোধকরি পিয়াস মজিদের সৃজনশীলতার অনন্য উদাহরণ হয়ে রইবে। আশাকরি তার কবিতা এভাবেই ক্রমশ বাঁক নেবে প্রসঙ্গ ও প্রকরণে।


 

ফারুক সুমন

কবি ও গবেষক। 

বাংলা লেকচারার, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ রাইফেলস কলেজ। 

faruqsumon11@gmail.com

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *