নাগলিঙ্গম ফুলের কিনারে

278 Views

Spread the love

কী এক অপাংক্তেয় বিষয়ে ঝুলে গেলাম। সকালের বাতাস, সবুজ ঘাস, পাতাদের নড়াচড়া, পাখির কিচিরমিচির—চোখে লেগে থাকা ঘুমের ভেতর সকালের রোদ। স্নায়ুতে সেই কবেকার নথি। পুকুরের সামনে জটলা। শ্রমজীবীদের ঘর। নগরে যে কামলা লাগে। শহর যদি একটা গরু হয়। দুধ যদি এক্সিকিউটিভ হয়। মাছওয়ালা, ঝাড়ুদার, মুচি, পাহারাদার, মেথর, বুয়া, সবজিওয়ালা, ফেরিওয়ালা, ভিখারি—তাহলে?

গুয়ের বর্ণনা, ঘামের বর্ণনা—যা কিছু মিথ্যার সঙ্গে বসবাস। বছরের পর বছর ঘুমে কাটিয়ে দেয়া; সকালে পালক ধোয়া মধুবিলাসী যাদুগুলো হাতছাড়া হয়েছে। মায়ের মেগি হাতার ব্লাউজ। শাড়িতে সস্তা ছাপ মারা হলুদ রঙের তাজাল্লিতে গড়ানো জল কোথায় যায়—তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। রাঁজহাসের ছানা দুটি বড় হচ্ছে পুকুরপাড়ের খোয়ারে। ছাপরার পাশে শহুরে পিচঢালা নদী। নাগরিকেরা হ্রদ বানাবে কোথায়? চাকার ঘর্ষণ। হর্নের দূষণ। লালদিঘির মাছগুলো কোনো এক লালদাড়ির টোপ খাবে কী খাবে না! মায়ের সঙ্গটা আমার, রাজহাঁসের সঙ্গটা আমার, কর্ণফুলির গাঙচিলের কলতান আমার—কোন এক ডাকাতের পকেটে বন্দি।

বছরের প্রথম বৃষ্টি পেঁপের বৃন্ত গড়িয়ে মাটি ছোঁয়। বালিকার চুলের ঘ্রাণ বড় হয়। এত বড় হয় যেন সে নদী। তারও জোয়ার আসে।

পুকুরে চোবানো থাকে শোলমাছ, গজার, টাকি, তেলাপিয়া, ঢোঁড়া সাপ। শীতে সাপও রোদ পোহায়। রাজহাঁস সবুজ ঘাস খুটে খায়। মা কেন জানি ইয়াবড় ডিম ফোটা দেখতে দিল না। তাড়িয়ে দিল। মুখস্থ করতে বলল, কালো অক্ষরের স্বরাজ। আবারও সেই পুকুর, কবর, আমগাছের ছায়া, তেঁতুলের টক, বালিকার ঘ্রাণ, ছাই দিয়ে দাঁত মাজা। পোয়াতির দুধগালা দুপুরের গোসল। পৈঠায় ইয়াবড় কাজি পেয়ারা। লবণের গুঁড়া। মরিচের গুঁড়া। চুল ধোয়া বিহানে সালোয়ার কামিজ। বাঁশঝাড়ের মড়মড়। শুকনো পাতার ছড়িয়ে পড়া। বছরের প্রথম বৃষ্টি পেঁপের বৃন্ত গড়িয়ে মাটি ছোঁয়। বালিকার চুলের ঘ্রাণ বড় হয়। এত বড় হয় যেন সে নদী। তারও জোয়ার আসে। ভেঙে গেলে সকালের হাট—কামারের বলিষ্ঠ হাত ছুরিতে শাণ দেয়। বটিতে শাণ দেয়। তারা স্বামী-স্ত্রী আগুনেরও ফুল হয়। চেরাগের শিখাটি ঠিক যেন তাই।

ঝিনুককে হত্যা করেই তার মুক্তা নিতে হয়।

হারিকেনের তাপগন্ধী রাতটা মাঝরাতে জেগে ওঠে। জেগে ওঠে ছুরি। ডেকে তুলে বটি। কালসাপ নাচে। তারারা বাড়িয়ে দেয় মিটমিট। চাঁদ থাকে ঘুমে। ঘুমের রেণু দিয়ে বোনা প্রশান্তির চাদর। পকেটে টাকা থাকলেই খরিদ করা যায় না। কস্তুরি হরিণ হত্যা করে ঘ্রাণ হরণ করা যায়। ঠিকই সমগ্র পাওয়া যায়। পাথর বিষ্ফোরিত হলে ঝর্ণার কী আসে যায়!

ওইদিকে বগলের তুলতুলে মাংসপাখির শরীর। আগুন নিয়ে যাও মাখনের নগরে। ঘিয়ের বাতিতে জ্বালো তোমার সলতে। মেকুর চুকচুক করে দুধবাটি খেয়ে যায়। দরজার পেছনে লুকানো থাকে বোঁটাঘষা মসলিন। ঝিনুককে হত্যা করেই তার মুক্তা নিতে হয়। একটা শুক্রাণু। একটা ডিম্বাণু। একটু অভ্র। একটু আলো। সেই সাপের বিষ নেই। রোদমাখা হলুদ রঙ । মাছ খায়। তার কোনো রূপকথা নেই। ডিম ধারণ করে। উগরে দেয়। মরে যায়। মাটিতে মিশে। আবার জিওল মাছ হয়ে জন্মাও। শিং মাছ হও কিংবা গোল্ডেন ফিশ। স্বীকৃতির কি দরকার? নিজেই নিজের স্বীকৃতি দাও।

দরজার নম্বর কেউ বলছে না।

ঠোঁট রঙ করা যুবতী—হেঁটে হেঁটে তোমার কাছে যাবো। চৈত্রের রোদ পেরিয়ে—সোনারঙা ধান মাড়িয়ে—রাত জেগে পেঁচার চোখ দেখে আরেকটা সকাল। রেলগাড়ি নিলো না আমাকে। আকাবাঁকা পথ, টিলা, পাহাড়, অরণ্য, পেরিয়ে ক্লান্ত এক প্রাণ! দরজার নম্বর কেউ বলছে না। বর্ষায় রাজহাঁস বেশ তেলতেলে। ওরা বাঘের ভয় দেখাল। প্রথমে কী করবে? ঘাড় কামড়ে ধরবে। একটা কামড়ে দেহ থেকে ধর বিচ্ছিন্ন। তারপর মেধাবী আঁচড়ে বুকের ছাটনা খোলবে। ফুসফুসটা আলাদা করে খয়েরি রঙের কলিজায় থাবা বসাবে। তারপর চেটেপুটে বাঘ মহাশয় গোঁফে লেগে থাকে অবশিষ্ট রক্ত। মুণ্ডুটা পড়ে থাকবে কোনো এক প্রতিমাশিল্পীর বাতিল মাল হিসেবে। তারপরেও রক্ষা নেই। তরুণ বাঘ দিন-কয়েক পর আবার আসবে। খুলির ভেতর পচে যাওয়া মগজমদের সন্ধানে। শক্ত থাবায় খুলিকে ফার্মের ডিম বানিয়ে নিপুণ কৌশলে নেশা পান করবে। রক্তপচা গন্ধ তাড়াতে তাড়াতে বাঘটা মিশে যাবে তার স্বাভাবিকতায়। তার ছানার সঙ্গে খেলবে।

সে এলে ধ্যান শুধু হয়। এর কোনো বর্ণনা হয় না। উপলব্ধি ঢেলে দিলে কোনো সুতার চিহ্ন নেই। শুধু ঘ্রাণ আর স্পর্শ। একটা কাচের গ্লাসে কেবল ঘূর্ণি। ঘুরে ঘুরে কথা।

একবার না। বেশ কয়েকবার ভেবেছি। মরার স্বাদ জেগেছে। যাবই ওই টিলায়। গাঙচিলের উদগ্র মাংস। ফেনা তুলে ছুটে চলা দিকচিহ্নহীন জাহাজের কম্পাস। কোনো এক দ্বীপে ডাবের পানি। করাল মাছ ভাজা। শসার ফালি। কাঁচা মরিচের ঝাল। সবকিছু তুচ্ছ করে ছুটছি কোনো এক যুবতীর লাল ঠোঁট দেখতে। জঙ্ঘার লোভে। সবুজের সমুদ্র। তবুও চলতে পারছি না। একটু ঝিরিয়ে—ঝর্ণার জলে সজীব হয়ে—নির্জনতার সমারোহ এক আপ্লুত বেদনাসংগীত। যা পুনর্বার উদ্ধার অযোগ্য। সেই টিলায় যেতে হবে। পড়ে থাকি নাগলিঙ্গম ফুলের কিনারে। শ্যামল চায়ের দেশে। বাতাসের আহার্যে। চিংড়ির নরম শরীর বিস্তারে। সেই রাজহাঁসের ডিম ফুটে হৃদপিণ্ডের স্পন্দন। কোনো পুরাতন কূপে নিজের প্রতিধ্বনি বুনো ফুলের গন্ধ মাখে। ভয়ার্ত চিৎকারসংগীত সঙ্গে নিয়ে জোনাকির মিটমিট এক নগরীতে—হাজার বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক প্রত্ননিবাসে প্রবেশ। শিশিরের ফেনা শরবতের গ্লাসে। আলোর উৎস একমাত্র জোনাকি। পোকার গুঞ্জন। অমাবস্যাতেও গোপন সুরভী। সে এলে ধ্যান শুধু হয়। এর কোনো বর্ণনা হয় না। উপলব্ধি ঢেলে দিলে কোনো সুতার চিহ্ন নেই। শুধু ঘ্রাণ আর স্পর্শ। একটা কাচের গ্লাসে কেবল ঘূর্ণি। ঘুরে ঘুরে কথা। রাত ফুরালে সত্যিকারের অন্ধকার; গাঢ় মায়া। প্রথমে লাল রঙ অথবা ইষৎ গোলাপি। ফুটন্ত সূর্যের পর কমলার বাগান। নির্দিষ্ট একটি কমলাকে নির্বাচন করে। খোসাটা ছাড়িয়ে কমলার কোয়া থেকে বিচি ফেলে একটা রোয়া বড় হয়—দিগন্ত বিস্তার করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে…


খালেদ চৌধুরী

জন্ম ৯ নভেম্বর ১৯৮৫, কুমিল্লা।

পেশা চাকরি।

প্রকাশিত বই :

পাস নম্বর ৩৩ [ কবিতা; বেহুলাবাংলা, ২০১৭]

লাল জিহ্বার নিচে [ছোটগল্প; কবি প্রকাশনী, ২০১৯]

 

ই-মেইল : k.chowdhury89@gmail.com

2 responses to “নাগলিঙ্গম ফুলের কিনারে”

  1. রাশেদ says:

    আপনার লিখনির প্যাটার্ণটা আমার খুব ভালো লাগে। প্রতিটা বাক্যে শব্দে সৌন্দর্য। অটুট থাকুক সৌন্দর্য আপনার লিখনিতে।

  2. নূরুদ্দিনজাহাঙ্গীর says:

    ভাষাটা দারুণ সুস্বাদু। মনে হলো নতুন একটা ভাষা। সেলুলয়েড অথবা কিছু স্নেপশট সাজিয়ে রাখা আছে যা একটা গল্পের মালা গেথেছে। বেশ মনে থাকে চিত্রগুলো। নিরীক্ষাটা ভালো লেগেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *