মায়া-মফস্বলের ছেলেমেয়ে

256 Views

Spread the love

বলছি সেই মায়া-মফস্বলের কথা—যা অনতিদূরের, আবার সুদূরের। দেশের আর দশটা মফস্বল টাউনের মতোই সে জায়গাটা, তবে কিছু রোদ যেমন নেহায়েত রোদ আর কিছু রোদ হেঁটে গেলে যেমন তার ছায়া ছড়িয়ে যায়, সে-ই মফস্বলটা ছিল তা-ই৷ সেখানের পথঘাটে শত মালিন্য, ভাঙাচোরা, তবু দিগন্তের বাগিচাজুড়ে ঝিম ধরা তারার গন্ধ আর চারপাশ গাছগাছালির আলোয় সবুজ৷ এখন একেবারে বদলে যাওয়া মহানগরটা দেখে বোঝার উপায়ই নেই যে—একদা এখানে ভর করেছিল অনন্ত! আজকাল সেখানে কত দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদ আর মানুষের মনের ভেতরও যেন ঢুকে গেছে মর্গ। আর তখন ছিমছাম, চুপচাপ, টুংটাং রিকশার শব্দশীল শহরটা যেন ছিল এক অমর অরণ্য। আমরা বলতে বসেছি সে-ই বিগত শহরেরই ছেলেমেয়ের গল্প। মায়া-মফস্বলের ছেলেমেয়ে।

থাকতো সে মাটিতে, প্রুফ দেখতো মেঘেদের৷ নিজের ভেতর জমাট কান্নার কারেকশন করতে করতে সে প্রায়শই রাস্তায় হোঁচট খেতো। এমনই এক হোঁচট খেতে গিয়ে দেখা তাকে৷

সংগীতের সঙ্গী যেমন নৃত্য, মেয়েটা ছিল তেমনি সুন্দরের সঙ্গী৷ কিছু সৌন্দর্যের যথাব্যাখ্যা দিতে অভিধান অপারগ; অনুভবের অতলেই হয় তাদের সঠিক সংজ্ঞায়ন—মেয়েটি ছিল তেমনই। আর ছেলেটা? উদভ্রান্তির আভায় মাখা। থাকতো সে মাটিতে, প্রুফ দেখতো মেঘেদের৷ নিজের ভেতর জমাট কান্নার কারেকশন করতে করতে সে প্রায়শই রাস্তায় হোঁচট খেতো। এমনই এক হোঁচট খেতে গিয়ে দেখা তাকে৷

ঋভা তার নাম; দেখা হলো তারও অভিনুর সঙ্গে। অভিনু; যার সদ্য সঙ্গী বুদ্ধদেব বসুর ‘তিথিডোর’। ঋভা; যে তখন উড়ছে তার উড়নারও অধিক। কারণ আবহাওয়াটাও যেন তার সঙ্গ কামনা করতো। সে ধাক্কা খেলো অভিনুর সঙ্গে, যার মনের মাঠে তখন ‘তিথিডোর’ কেবল—

‘প্রথম সিঁড়ি : প্রথম শ্রাবণ’,
‘করুণ রঙিন পথ’,
‘ যবনিকা কম্পমান’।

কোনো কোনো মৃত্যুবৃক্ষের মগডালে উঠলে পাওয়া যায় মধুজন্মের দেখা৷ কোনো কোনো নরকের পথে চলে যেতে যেতে ঠিক পৌঁছে যাওয়া যায় স্বর্গের সমীপে। কোনো কোনো ঘুটঘুট্টি অন্ধকারে প্রব্রজ্যা মানুষের ব্যাগ ভরে দেয় আলোস্বাদ অরেঞ্জে। তারপর সেই ফল খেতে খেতে সে ভাবে, আরে, সব সোজাসাপ্টা চললে তো পাওয়া যেতো না এমন যত অভিরূপ বিভ্রম। অনুধাবনে আসতো না যে—জীবন এক মধুর মাদক। স্বপ্নের ভেতর রাহাজানি না ঘটলে মানুষের জীবন তো ভরে যেতো বাস্তবের নিরঞ্জনে৷ তাই সোজা সড়কে চলে গন্তব্যে পৌঁছুনোর চেয়ে মাঝেমধ্যে হোঁচট খাওয়া ভালো।

‘তিথিডোর’ এ স্বাতীকে নিয়ে সত্যেনের ঘুরতে বেড়াবার একটা উপলক্ষ ছিল—রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু আর এই গল্পে ঢুকে আমরা দেখি অভিনুর মনের মৃত্যু।

বিজ্ঞাপনে বলে, ‘দাগ থেকে নতুন কিছু হয়’ আর অভিনু মনে মনে ভাবে, হোঁচট থেকে যদি খারাপ কিছু হয়, তবে হোঁচটই ভালো। সে তো বরাবর চেয়েছিল, সাংঘাতিক কিছু একটা হোক এই জীবনে। একটা ঝড় আসুক। হু হু—শোঁ শোঁ। ঝড় এল। সে—হৃৎ-প্রান্তরে; অভিনু নিজেকে ভাবতে লাগল ‘তিথিডোর’ এর সত্যেন-রূপে। আর ঋভা-কে স্বাতী৷ স্বাতী নক্ষত্র ঝরে পড়লে নাকি আকাশ বিষণ্ন হয়। ঋভা-নক্ষত্রের উদয়ে অভিনুর আকাশ আনন্দে করে উঠল ঝলমল; যদিও ঋভার ভাবনাটা ছিল ঠিক উল্টো। ঋভার ভালোই লাগতো অভিনুকে। পড়াশোনায় ভালো, মার্জিত পড়ুয়াও কিন্তু তাকে ঠিক প্রেমিক হিসেবে কল্পনা করা যায় না। একটুআধটু গল্প করা, বই বিনিময় করা, আরও দশটা বন্ধুর একজন হিসেবেই ভাবা যায় বড়জোর৷ কিন্ত অভিনু চেয়েছিল দশের বাইরে একজন হতে৷ চেষ্টাচরিত্র করলে হয়তো হতেও পারতো। কারণ দেখেছে তো চারপাশে এই লেগে থেকে নিজ প্রেম প্রতিষ্ঠিত করছে বহু বন্ধু৷ কিন্তু অভিনুর ধাঁতটাই আলাদা। প্রেমকে ঠিকাদারির বস্তু ভাবতে পারে নি কখনও। ভেবেছে এমনি এমনিই হয়ে যাবে। ঋভার সঙ্গে। কী হবে? কিছু একটা।

অভিনু পড়ে৷ অভিনু পোড়ে। ছাই হয় না। পাথর হয়। পাথরের পাষাণ-সরোবর মরে মরে কোমল কুসুম হয়৷

‘তিথিডোর’ পড়েছে আর ভেবেছে সত্যেনের মতো ঋভাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াবে সারা শহর কিন্তু সে মফস্বল তো ছিল না স্বাতীদের কলকাতা। ‘তিথিডোর’ এ স্বাতীকে নিয়ে সত্যেনের ঘুরতে বেড়াবার একটা উপলক্ষ ছিল—রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু আর এই গল্পে ঢুকে আমরা দেখি অভিনুর মনের মৃত্যু। অভিনু কী বলে ঋভার কাছ থেকে চাইবে শুভ্র সকাল, দুরন্ত দুপুর কিংবা সন্ধ্যার অন্ধকার! না বাবা, এইরকম হতচ্ছাড়া, হতভাগা প্রেমিকের জন্য বসে নেই ঋভা৷ তার উমেদার কত কত হবু ডাক্তার, উদীয়মান ইঞ্জিনিয়ার, প্রবীণ সাংস্কৃতিক ফড়িয়া থেকে শুরু করে নবিশ আবৃত্তিকারও। এতসব উজ্জ্বলের ভিড়ে অভিনুর মতো জলের সাথে একা একা কথা-বলা ছেলে কী আর পারে? পারে—ঋভার জন্মদিনে ওরিয়ানা ফাল্লাচির ‘হাত বাড়িয়ে দাও’ বইটা গিফট দিতে৷ বাংলা অনুবাদটা দামে সাশ্রয়ী কিন্তু মর্মে গভীর। একটা অনাগত কন্যাশিশুর উদ্দেশে এক মায়াময় মায়ের চিঠি। অভিনুর তো সাধ্য নেই ঋভার জন্মদিনে জমকালো জামা কিংবা নজরকাড়া কোনো গিফট দেওয়ার। সেরকম গিফট দেওয়ার মানুষ তো অনেক আছে, যারা ঋভার দৃষ্টিপ্রত্যাশী। কিন্তু ঋভা তো অভিনুর মনের মধ্যিখানে বাস করা ‘তিথিডোর’ এর স্বাতী৷ সে নিশ্চয়ই বুঝবে ‘হাত বাড়িয়ে দাও’ এর মর্ম। হায়! দিলো তো অভিনু গিফটটা। নিলো; ঋভা। পরদিন চিরকুট এল।

“আমার দিকে হাত-টাত বাড়িয়ে দিতে এসো না। তোমার প্রত্যাশা পূরণ হওয়ার না৷ অবশ্য হতে পারে, যদি পৃথিবীর নাম হয় ‘পাগলখানা’।”

অভিনু পড়ে৷ অভিনু পোড়ে। ছাই হয় না। পাথর হয়। পাথরের পাষাণ-সরোবর মরে মরে কোমল কুসুম হয়৷ সেই কুসুমের নাম তবু ঋভা রয়।

হয়তো বইয়ের শিরোনাম অসংকোচে তার বার্তা পৌঁছে দেবে। তুমি ফিরিয়ে দিয়েছিলে। করোনার দূরত্ব-রক্ষার যুদ্ধে এখন তো বেঁচে থাকার জন্য সবাইকে দূরে থাকতে হয়।

২.
পৃথিবীটা হঠাৎ একদিন বদলে যায়৷ দিগন্ত থেকে পাতাল-করোনায় ছারখার৷ অভিনুর পাথরের ফুল ঋভা ওড়ে ওড়ে কবে চলে গেছে দূর পরবাসে! মার্কিন মুল্লুকে। নিশ্চয়ই সুখ তাকে ঘিরেই পাপড়ি মেলে থাকে৷ কিন্তু এখন তো নিউইয়র্ক রোজ জ্বালায় মৃত্যুর মোম। পরিচিত নানাজনের কাছে অভিনু খোঁজ নেয়৷ না, ঋভার কোনো খোঁজ নেই কোথাও।

৩.
অভিনু হয়তো সচেতনভাবেই একদিন ঋভা তোমায় দিয়েছিল ওরিয়ানা ফাল্লাচির বই ‘হাত বাড়িয়ে দাও।’ সরাসরি কিছু বলতে পারার মতো ছেলে তো সে ছিল না কখনও। ভেবেছিল—হয়তো বইয়ের শিরোনাম অসংকোচে তার বার্তা পৌঁছে দেবে। তুমি ফিরিয়ে দিয়েছিলে। করোনার দূরত্ব-রক্ষার যুদ্ধে এখন তো বেঁচে থাকার জন্য সবাইকে দূরে থাকতে হয়। প্রিয়-পানে হাত বাড়ানো নিষেধ। ঋভা, তুমি ফিরে এসো। এলে এবার কিন্তু অভিনু আর দ্বিধান্বিত হবে না; সরাসরি বলবে সে, ‘ হাত বাড়িয়ে দিও না। বেঁচে থাকো বরং…’


পিয়াস মজিদ

জন্ম ২১ ডিসেম্বর, ১৯৮৪; চট্টগ্রাম। স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর
ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি।
প্রকাশিত বই :
কবিতা—
নাচপ্রতিমার লাশ [২০০৯]
মারবেল ফলের মওসুম [২০১১]
গোধূলিগুচ্ছ [২০১৩]
কুয়াশা ক্যাফে [২০১৫]
নিঝুম মল্লার [২০১৬]
প্রেমপিয়ানো [২০১৯]
ক্ষুধা ও রেস্তোরাঁর প্রতিবেশী [২০১৯]
নির্ঘুম নক্ষত্রের নিশ্বাস [২০১৯]
দুপুরের মতো দীর্ঘ কবিতা [২০২০]
গোলাপের নহবত [২০২০]
বসন্ত, কোকিলের কর্তব্য [২০২০]
ই-মেইল : piasmajid@yahoo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *