রঞ্জিত কিংবা জয়ের গল্প

85 Views

Spread the love

(১)

সাতদিন ধরে প্যাকিং চলছে। প্রায় শেষের দিকে। আগামীকাল ট্রাকে মালামাল চলে যাবে, আমরা রাতটা কাটিয়ে পরদিন ভোরে গাড়িতে রওনা দেব। ঘর জুড়ে বিষণ্ন বাতাসের ঘূর্ণি। হা করে খোলা স্মৃতিময় সিন্দুকের ডালা, সেখানে চলছে খাণ্ডবদাহন। এ নিয়ে কতবার ঠিকানা বদল হলো! এ-শহর, সে-শহর ঘুরে ঘুরে বেড়ানো বেদুঈন। কোথাও শেকড় নেই। আর শেকড় হলেও টান মেরে তুলে নিয়ে যাই, নতুন মাটিতে আবার বীজ পুঁতি। আবার চারা, কাণ্ড, শাখা, পাতা, ফুল, ফলের হাসিকান্না। এখানে এই বাসায় কোথা দিয়ে কেটে গেল পাঁচটি বছর। এলাকার জন্য, মানুষের জন্য, সর্বোপরি বাসাটির জন্য মন খারাপ হয় প্রতিবার।এবারে সবকিছু ছাপিয়ে অন্য আরো একটি কারণে মন খারাপ।

বাসা থেকে যতবার বেরুচ্ছি নির্দিষ্ট জায়গায় চোখ যাচ্ছে, ফাঁকা। শূন্য আসন, কেউ নেই। তা ছাড়া আমাদের রান্নাঘরের বারান্দা থেকেও জায়গাটা দেখা যায়। আমি সংসারটাকে তা তা করে ভাঁজ করি, গুছাই আর মাঝেমধ্যে তাকাই। বুকের ভেতরে একটা বেদনার বাতাস তিরতির করে। প্রায় একমাসের উপর দেখছি এই শূন্যতা। আমার হাতের সেটে নম্বর আছে। ইচ্ছে করলেই রিং দিয়ে জানতে পারি ঘটনা। রিং দিই না। ইচ্ছে করে দিই না। কেবল কি ইচ্ছে? রিং দিয়ে যদি শুনি ‘দুঃখিত, এই নম্বরটিতে সংযোগ দেয়া সম্ভব নয়’। তাহলে!

এতদিন ভেবেছি আমি চলে যাবার আগেই সে এসে যাবে। দেখা হবে। কিন্তু যাবার দিন ঘনিয়ে এলো, ওর পাত্তা নেই। মনটা অসম্ভব মেদুর হয়ে আছে। তাহলে আমার আশঙ্কাই সত্যি! সে চলেই গেছে।

সত্যিই সে দেশ ছেড়ে চলে গেল! নিজের দেশ, নিজের পা দাপানো মাটি, নিজের শেকড়, এই মায়া, এই ছায়া, এই ধূলিমাটি ত্যাগ করা কী এতই সহজ! আমার এই শহর বদলের মতো! আমি মানতে পারি না। মনকে ঠাওরাই। না, ও দেশ ছেড়ে যায়নি, যেতে পারে না। কোন কাজে আটকে আছে এই এলো বলে। নিজের সাথে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে চুপ করে অপেক্ষা করি। তবু ফোন করি না। ফোন করলেই তো খেলাটা, চ্যালেঞ্জটা খতম। এসপার ওসপার।

মেঝেতে থ্যাবড়ে বসে ছবির ফ্রেম মুছি। ছেলে এসে পেছন থেকে গলা জড়িয়ে, পিঠে ঝুলতে ঝুলতে আদুরে গলায় বলে, মা আমার সাইকেলটা নিয়ে যাব না? না মা এটার কথা বলছি না। আগেরটা, যেটার হ্যান্ডেল ভেঙে গেছে।

ওমা! নতুনটা, আগেরটা দুটোই নিয়ে যাব, ঠিকাছে! হেসে ফেলি। মায়া! মায়া! জগৎসংসার মায়ার মায়াজাল।

 

(২)

রমজান মাস। কিছুটা অন্যরকম থাকে পরিবেশ। বিশেষত শেষ বিকেলটা। মানুষ ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে থাকে বাড়িমুখে। রাস্তাঘাট দ্রুত ফাঁকা হতে থাকে। মানুষ বাড়ি ফেরে পরিবারের সদস্যদের সাথে ইফতারি করবে বলে। পদ্যের বাবাও বাইরে ইফতারি করতে পারে না। যা কিছুই হোক, সে বাসায় ফিরবেই। আমরা একসাথে ইফতারি করি।

যাবার বা ফেরার সময় প্রতিদিন দেখি মসজিদের কোণায় লোকটি মাথা নিচু করে জুতা স্যান্ডেল সেলাই করে। প্রতিটি মানুষ ছুটলেও তার কোন তাড়া নেই। ধ্যানী। স্ট্যাচু।

ছেলেমেয়েও বাবা অন্তপ্রাণ। আমি যখন রান্নাঘরে কাজ করি আমার ছোট্ট মেয়েটা শরবত বানায়। সে ওখান থেকে হাঁক পারে—
—মা, আজ আম নাকি বেলের শরবত হবে?
—দেখ, কি করবা? তোমার কি খেতে ইচ্ছে করছে?
—বাবা তো আম, বেল দুটোই খাবে।
—ঠিকাছে দুটোই কর।
—মা, বাবার তো লেবুর শরবত ছাড়া হয় না।
—আচ্ছা, বানাও।
—আর ইসবগুলের ভুষি? হ্যাঁ, সেটাও কর।
—আচ্ছা মা।
পাশ থেকে গদ্য বলে ওঠে
—তাহলে বাবার প্লেটের সামনে কয়টা গ্লাস থাকবে? বলে নিজেই আবার আঙ্গুলে গুণতে থাকে নাম্বার ওয়ান আম, নাম্বার টু বেল, থ্রি লেবু, ফোর ইসবগুল। আমিও কিন্তু চারটা মগ নেব।
—কেন তুমি চারটা নেবে? তুমি তো রোজা থাকো না!
—আমি চারটাই নেব। সে জোর দিয়ে বলতে থাকে।
—না, তোমার কেবল আমের শরবত। তুমি তো খাও না। খালি নষ্ট কর।
—না, আমি খাব।
—না, তুমি পাবে না।
—মা! এবারে সে আমাকে সালিশ মানে। প্রতিদিন দু-ভাইবোনে এমন চলতে থাকে। বাবা না ফেরা পর্যন্ত তাদের খুঁনসুটি চলে। কোন কোনদিন গদ্য না পেরে শেষে ভ্যা করে কেঁদে দেয়। বাবা এসে দুটোকে দুবগলে নিয়ে বসলে ওদের শান্তি।

রমজান মাসে বাজারে ভীষণ ভিড় থাকে। তা ছাড়া দাম হয় আকাশচুম্বী। এই মাসেই ব্যবসায়ীরা যা লাভ করার করে নেয়। সারা বছরের লাভ তারা এই একমাসেই করে। তাই আমি রোজার আগে থেকেই ঈদের কেনাকাটা করতে থাকি। কিন্তু যতই করি না কেন, কেনাকাটা আর শেষ হয় না।

এবারে আরো বেশি, কারণ আমার ননদ আফরিন আসছে বিদেশ থেকে। বিয়ের পর এটাই ওর প্রথম আসা। ওর জন্য, ওর জামাইয়ের জন্য কেনাকাটা করছি। প্রতিদিন ইফতারের আগে আগে সাধ, সাধ্য আর বাজেটের ধারাপাত মিলিয়ে হয়রান হয়ে, তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ফিরি। যাবার বা ফেরার সময় প্রতিদিন দেখি মসজিদের কোণায় লোকটি মাথা নিচু করে জুতা স্যান্ডেল সেলাই করে। প্রতিটি মানুষ ছুটলেও তার কোন তাড়া নেই। ধ্যানী। স্ট্যাচু। বাসায় এসেই সবার ইফতারির থালা সাজাই। নিচের সিকিউরিটির লোকদেরকে থালা সাজিয়ে পাঠাই। তাদেরকে ইফতারি দেয়ার কোন কথা নয়। ইচ্ছে করে দিই। ওদেরকে বলে দিয়েছি—কোন পথচারী যদি ইফতারি করতে আসে, বাসা থেকে যেন নিয়ে যায়। আমার মায়ের মতো বহু পদের ইফতারি বানাতে, অনেকগুলি থালা সাজাতে আমার খুব ভালো লাগে। সাজাতে সাজাতে কেবল মনে হয় সবাই ইফতারি করলেও ঐ লোকটা নিচু মাথায় কেবল কাজই করে যায়। পরদিন ওকে ডেকে পাঠালাম।

নামধাম জিজ্ঞেস করে পরিচয় জানার পর প্রশ্ন করলাম, আমাদের ইফতারি খেতে কি তোমার কোন সমস্যা আছে? বলল, ‘নেই’।
—আচ্ছা, কাল থেকে নিচে এসে সবার সাথে ইফতারি করবা। সে মাথা নিচু করে চুপ রইল।
—কি ব্যাপার?

আড়ালে কাঁদে, লম্বা শ্বাস টানে। তারপর ভেজা চোখে স্বামীর সাথে ইমিগ্রেশনের ওপারে চলে যায়।

—আফা, নি গিয়ে আমি আমার জাগায় বসে খাবানে। বুঝলাম নিচের সিকিউরিটির লোকেরা এই বিজাতীয় মানুষকে ইফতারিতে সাথে নেবে না। আমি দ্রুত বললাম, আচ্ছা, আচ্ছা ঠিকাছে। পরদিন ২০/২৫টা বড় সাইজের প্লাস্টিকের বাটি কিনে আনলাম। বাসার সহকারী মেয়েটিকে বুঝিয়ে বললাম, রোজ প্রতিটি আইটেম দিয়ে বাটি সাজিয়ে ওকে দেয়া হবে। এভাবেই চলল।

প্রতিদিন সে আসে, বাটিটা হাতে নেবার সময় কৃতজ্ঞতায় একেবারে নুয়ে পড়ে। এভাবেই ওর সাথে আমার, আমার পরিবারের পরিচয় হয়। খুব কম কথা বলে। গত পাঁচ বছরে ও আমার বিভিন্ন ছোটখাট কাজে এসেছে, আর বাসা থেকে প্রায় সময় খাবার নিয়ে গেছে। ততদিনে জেনে গেছি ওর দুটো ছেলেমেয়ে। তারা স্কুলে পড়ে। আমি প্রতি ঈদে ওদের জন্য কাপড়-চোপড় কিনে দিই, সে আনন্দের সাথে নিয়ে যায়। ওর বাড়ি যশোরের বর্ডার এলাকায়। এক ঈদের দিনে ওর বউ-মেয়ের সাথে ফোনে কথাও হয়েছে।

আফরিন আমার জন্য বেশ কয়েকটা ব্যাগ এনেছে। একটা ব্যাগের ফিতার ছোটবড় করার ঘর না থাকায় আফরিন কেমন মন খারাপ করে। আমি ওকে বলি মন খারাপের কি আছে, ঠিক করা যাবে।
—কীভাবে? আরে রঞ্জিত আছে না, ও ঠিক করে দেবে।
—রঞ্জিত কে?
—রঞ্জিত হচ্ছে একজন মুচি। ঐ যে মসজিদের কোণে বসে কাজ করে। এরপর ফোন দিলে রঞ্জিত এলো। বুঝিয়ে দিলে সে ব্যাগ নিয়ে চলে গেল। ঠিকঠাক করে দিয়ে যাবে।
—ভাবি, তুমি একটা আজব মানুষ! তোমার মাছের লোক বাঁধা, সবজির লোক বাঁধা, মুরগির, তাই বলে মুচিও! বাড়ি বয়ে এসে কাজ করে দিয়ে যায়! হাসতে হাসতে বলি
—ভালো না বল! কেবল জুতা স্যান্ডেলের কাজ নয়, ঘড়ির ফিতা, আমার সবরকম দুল-চুড়ির কাজ, ব্যাগবক্সের ফিতা ঠিক করা, কালার করা সব তো রঞ্জিত করে।

—তা ও যে তোমার বাসায় আসে, ও কী বিশ্বস্ত!
—কোন সন্দেহ নেই।
ঈদের পরে আফরিন নিজ ঠিকানায় চলে যায়। বুঝতে পারি ওর ভীষণ মন খারাপ। দুদিন আগ থেকেই আড়ালে কাঁদে, লম্বা শ্বাস টানে। তারপর ভেজা চোখে স্বামীর সাথে ইমিগ্রেশনের ওপারে চলে যায়। বুকের ভেতরটা খামচে ধরে। আর কবে আসবে দেশে, কবে দেখবে স্বজনদের মুখ!

যাবার আগে ও রঞ্জিতের হাতে ডলার দিয়ে যায়। আমি অবাক হলে মিটিমিটি হেসে বলে-আরে দেখ, ও ঠিক ভাঙিয়ে নেবে।

বেশ অনেকদিন পরে রঞ্জিত আসে। ওকে দেখে আমি হতভম্ভ হয়ে যাই। শীর্ণ, কৃশকায় হয়ে একেবারে যেন ছোট হয়ে গেছে।

(৩)

এরপর বেশ কিছুদিন রঞ্জিতকে দেখি না। কিছুদিন পর এলে শুনলাম ওর ‘চিকনগুনিয়া’ জ্বর হয়েছিল। অনেকদিন ভুগেছে। এখন সুস্থ কিন্তু হাতে নাকি কী সমস্যা হয়।

মাঝে মাঝেই সে আসে আমাকে বলে, ‘আফা, আমার হাত তো ঠিক হচ্চে না।’
ভাবতে থাকি, ওর জন্য কী করা যায়! আমার একজন আত্মীয় পিজি হাসপাতালে আছে, ওর কাছে ওকে পাঠিয়ে দিই।

সে সবধরনের পরীক্ষা করে বলে যে, ওর হাতে কোন সমস্যা নাই। আমি ওকে ঠিকঠাক খাওয়া-দাওয়া করতে বলি।

বাচ্চাদের পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ততা, আরো নানান কাজে সময় কেটে যায়। বেশ অনেকদিন পরে রঞ্জিত আসে। ওকে দেখে আমি হতভম্ভ হয়ে যাই। শীর্ণ, কৃশকায় হয়ে একেবারে যেন ছোট হয়ে গেছে। জিজ্ঞেস করতেই বলল,
-হাতে এরাম যন্তণা আফা, সইয্য করতি পারিনে। যন্তণার ঠেলায় ইচ্চা করে হাতটা কেটে ফেলাই। ওর হাতে এক তা কাগজ। সেগুলি সব নাকি বিভিন্ন টেস্টের রিপোর্ট। কিছু কিছু দেখলাম। অনেক জায়গায় সে অনেক ডাক্তার দেখিয়েছে। কবিরাজও দেখিয়েছে। ঝাড়ফুঁকও বাদ রাখেনি। এসব করতে গিয়ে জমানো টাকাপয়সা সব শেষ। সামান্য জমি ছিল, তাও বিক্রি করে দিয়েছে।

শুনে অবাক হয়ে গেলাম। আমার বিষ্মিত মুখ দেখে সে আবার বলে ওঠে
—গিরামে জমিজুমা যা ছিল সব বেচেবুচে দিছি। গাচপালা, ছাগল, গরু বেচা টাকায় হাতের ডাক্তার দ্যাকাইচি। হাতের যন্তণায় বিষ খেয়ে মরতি ইচ্চা করে, আফা। সুংসারডা না থাকলি কবেই সব শেষ কইরে দিতাম।

এবারে সে ইন্ডিয়া চলে যাবে বলে ঠিক করেছে। বললাম ‘তুমি ইন্ডিয়ার কোথায় যাবে! তুমি সেখানকার কোন ডাক্তারকে চেন! তা ছাড়া এত টাকাকড়ি কোথায় পাবে?

সে চুপ করে রইল। কি হলো রঞ্জিত?
—আফা, আমি একেবারেই চলি যাতি চাই।
—মানে! আমি একেবারে হতভম্ভ হয়ে যাই! বলে কী! এবারে কিছুটা রেগে বললাম,
‘তোমার হাতে কিচ্ছু হয়নি, সব তোমার মনের ভুল। তোমার মানসিক অসুখ, না হলে এত এত ডাক্তার দেখল, কেউ কিছু বলতে পারল না! তোমার কিচ্ছু হয়নি। খাওয়া-দাওয়া কর, কিছুদিন না হয় বিশ্রাম নাও, দেখ ঠিক হয়ে যাবে। তা ছাড়া, নিজের দেশ ছেড়ে ইন্ডিয়া গেলেই কি সব ঠিক হয়ে যাবে? ইন্ডিয়া যাবার মত কী হয়েছে তোমার! যত্তসব!’

আমার কথায় সে খুব আহত হলো বুঝতে পারলাম। কথা না বাড়িয়ে বললাম, দাঁড়াও, খাবার নিয়ে যাও।

খাবারের বাটি আর কিছু টাকা নিয়ে শেফালি গিয়ে দেখে সে বসে বসে কাঁদছে। এরপর সে চলে যায়। মনটা বিমর্ষ হয়, ওর মনে কী দুঃখ আমি তো জানি না। কোন কারণে সে দেশ ছেড়ে যেতে চাচ্ছে তাও জানি না। চেনা হলেই কী একজন মানুষ জানা হয়! জগতসংসারে কঠিনতম কাজ হচ্ছে মানুষ চেনা।

তারপর থেকে মসজিদের কোণের জায়গাটা ফাঁকা। ওর চটের আসন আর বিছানো হয়নি। ওর কাজের সেই ধ্যানী মূর্তি আর দেখিনি। তাই বলে একটা মানুষ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে চলে যাবে! আমি কিছুতেই মানতে পারি না। এ-নিয়ে আমি প্রায় সময় পদ্যর বাবার সাথে কথা বলি। ও বলে, দেখ ঠিক ফিরে আসবে। মনে মনে বলি ‘তোমার মুখের কথা যেন সত্যি হয়’। মাঝে মাঝে ভাবি, রঞ্জিত চলে গেলে আমার কী সমস্যা! গেলে যাবে। কিন্তু মানতে পারি না।  মনে হয় এ যেন আমার পরাজয়! এ আমার দেশের পরাজয়!

নিজের অজান্তে এক ব্যাকুলতা আমাকে গ্রাস করে। একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা অস্থির করে রাখে। অপেক্ষা খুব তীব্র হয়ে ওঠে…

 

(৪)

কাল সকালে আমরা রওনা দেব। রাতে শোবার আগে বাসাটা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। একবার ছাদে গিয়েও দেখে এসেছি। কিছু ফুলের টব ট্রাকে তুলে দেয়া হয়েছে। জায়গা অসংকুলান হওয়ায় কিছু রয়ে গেছে। পর্তুলিকা, কুঞ্জলতা, অলকানন্দারা অকৃপণভাবে আলো ছড়াচ্ছে। ওদের গায়ে হাত বোলাই। ওরা ফিসফিস করে অনুযোগ জানায়, সাথে নাও! সাথে নাও! ফেলে যেও না! বুকের ভেতর ভার লাগে।বাতাসে কান্নার সুর। জড়িয়ে বসে থাকতে ইচ্ছে করে। আমার চাপে কাত হয়ে যায় রেইন লিলির টব। আকাশে একফালি নতুন চাঁদ।

গাড়ি বাঁক নিতেই বুঝি আদতে কেউ কোথাও থাকে না। অপেক্ষার শেষান্তে থাকে শূন্য আসন। মৌন মরীচিকা।

সকালে উঠে সবাই রেডি। ও তাগিদ দিচ্ছে—কই হলো তোমাদের? চল! চল! আমি শেষবারের মত রান্নাঘরের বারান্দা থেকে ওইদিকে তাকাই, নাহ ফাঁকা। মনটা বিবমিষায় ভরে যায়! নিমতিতা ছড়িয়ে যায় রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এই অশিক্ষিত মানুষরা কিচ্ছু বোঝে না। আরে নিজের দেশ ছেড়ে কেন তুমি অন্য দেশে যাবে! কথায় আছে ‘নিজের দেশের মাটি দপদ পাইয়া হাঁটি’। এসব ফালতু মানুষের জন্য কষ্ট পেয়ে কোন লাভ নাই। এরা ভালোবাসা বোঝে না। এরা স্বদেশ বোঝে না। নিজের উপর বিরক্ত হই। উলুবনে মুক্তো ছড়ানোর কথা মনে পড়ে। যাক! মরুকগে! যাক! ফোনটা বের করে রঞ্জিত নামটা ডিলিট করে দিলাম। কখনও কখনও ক্রোধেও চোখ ফেটে জল আসে বৈকি! ওর বাবা বের হয়ে গেছে। সবাই গাড়িতে উঠতে যাব এমন সময় গদ্য ডেকে ওঠে ‘বাবা!’

ওর বড় বাথরুম পেয়েছে। ‘হাতে আর সময় নাইরে বাবুয়া’ বলতে বলতে সে ছেলেকে টয়লেটে নিয়ে যায়। শেষবারের মতো চারপাশে নজর বুলিয়ে সবাই গাড়িতে ওঠলাম। পরীর মা বিদায় নিল। ও নাকি টবগুলো নিয়ে যাবে। বললাম, তুমি নিলে তো আমি খুশি হব। ওরা যত্ন পাবে।

গাড়ি স্টার্ট নিল, পরিচিত শহর ছেড়ে আবার চলেছি নতুন শহরে, নতুন ঠিকানায়। ছোটরা উচ্ছ্বসিত। নতুন জায়গা কেমন হবে, নতুন বন্ধুরা কেমন হবে এসব নিয়ে বেশ উত্তেজিত তারা। আমার মন অনুভূতিহীন। পাথরের মত ভারি। ও ঠিক টের পায়। গাড়িতে ওঠার সময় গভীর করে পিঠে হাত রাখে। আস্থার হাত, নির্ভরতার ছোঁয়া, ভালোবাসার স্পর্শ।

মসজিদের কোণায় আসামাত্র আমার হৃদকম্প শুরু হলো। কে ওখানে! গ্লাসে মুখ ঠেসে ধরি—“ওই তো সেই চটের আসন, সেই ধ্যানীমূর্তি, হাতে সুঁইসুতা। সামনে নানারকম কৌটা, ব্রাস, কাঁচি, বাটাল”।

আমার বুকটা বাওড়ি বাতাসে, আনন্দে নাকি গরবে দশহাত ফুলে ওঠার আগেই ফুস করে নিভে যায়। চোখদুটো ভিজে যেতে থাকে। গাড়ি বাঁক নিতেই বুঝি আদতে কেউ কোথাও থাকে না। অপেক্ষার শেষান্তে থাকে শূন্য আসন। মৌন মরীচিকা।


কাজী লাবণ্য

রংপুর জেলায় জন্মঢাকায় বসবাস।

পড়তেঘুরতে আর বাগান করতে ভালোবাসেন।

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ

নাকছাবি [ অক্ষর প্রকাশনী২০১৫ ]

জোনাক বনে জোসনা [ প্রিয়মুখ২০১৭ ]

যযাতি কন্যা [ বেহুলা বাংলা২০১৯ ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *