অসংখ্য মৃত রোদ ঘাড়ে

143 Views

Spread the love

 


জ তে জুতা


 

‘জ তে জুতা
জুতা পায়ে যুদ্ধে যায় অযোদ্ধার রাজা।’

 

—এই সহজপাঠ শিখেছিলেন কয়েকজন যোদ্ধা দেবদূতের রূপকথা থেকে।

 

এখন যুদ্ধকাল।
কাছেই অথবা দূরে—শিশুদের চোখ ফসকে সকাল উড়ে যাচ্ছে—হয়তো ধুম্রজালের মতো।

 

সেসব মিশমিশে কালো শোকাচ্ছন্নতার উপর—মর্ত্যে—অনবরত হেঁটে বেড়াচ্ছে বেশুমার জুতা। সেসব জুতা পায়ে দৌড় শিখছে প্রতিবেশী ছায়ারা, যারা কাঠের বন্দুক নিয়ে তাড়া করছে—আমাদের মাটির পুতুলদের।

 

কখনো সখনো যুদ্ধফেরত প্রতিবেশী ছায়াদের চোখে তাকালে—রক্তের বিস্রুততা দেখি!

 

এত-এত লাল চোখ নিয়ে মানুষ কী করে ঘুমায়!

 


ছুরিকাল


 

কাঠবাদামের সারি
কাছেই অথবা দূরে,
কাঠঠোকরার ডানা
ক্ষিপ্রগতির উড়ে—

 

কাঠবাদামের ডালে
বিভ্রমে তির ছোড়ে!

 

বিত্রপ এক ভুল
ঠোকরে ঠোকরে ফুল
ত্রস্তে ঝরে লাল,

 

কাঠবাদামও জানে
পঞ্জিতে ছুরিকাল!

 


প্রেম


 

দরজায় প্রহরী কুকুর—বিশ্বাসে নত,
—আমি, অনাথ হৃদয় সে তো!

 


ভাঙা ছায়ার স্মৃতি


 

প্রথম সাক্ষাতের পর—মা মাছ আঁকতে গিয়ে বাবার বক্ষ আর বাবা মেঘ আঁকতে গিয়ে মায়ের চক্ষু আঁকেন।

 

প্রথম সাক্ষাতের মতো—প্রথম ভুল থেকে—কান্নারত একজন গড়িয়ে পড়ে পৃথিবীতে—নীলাভ মার্বেলের মতো।

 

বহুদিন রঙ আর বৃষ্টির ঘোরে হাঁটতে হাঁটতে—একদিন পরিচিত পুরুষ ও রমণীদের স্কেচ আঁকতে বসলে—ক্যানভাসের শিরা বেয়ে উপচে পড়ে অসংখ্য মেঘ আর মাছের—ভাঙা ছায়ার স্মৃতি!

 


হারানোলিপি


 

শৈশবের ধানক্ষেত উড়ে আসছে
জামগাছ উড়ে আসছে…

 

আঙুল ফসকে হারিয়ে যাওয়া
লাল ঘুড়ির কথা ভাবছি।

 

বেহালাবাদকের মতো দাঁড়ানো আকাশ
আঙুলে ভেঙে পড়ছে।

 

মন্টু কাকার কালো চশমা
আমাকে লাল ঘুড়ি ভেবে জড়িয়ে ধরছে।

 

শরীরে ধানক্ষেতের ঘ্রাণ,
তাজা জামের দাগসমতে ঘরে এলে

বুকের ভেতর উড়াউড়ি করে
পেতে পেতেই
খসে যাওয়া বিকেলের হাওয়া।

 


বিত্রস্ত


 

স্বপ্ন রক্তচক্ষুর ভেতরে—হাঁটতে
বিশ্বাস পাচ্ছে না,

 

বিশ্বাস ফুঁড়ে সড়সড় করে ঢুকে পড়ছে
আদিম সাপ,
মিথ্যের ছোবলে কাতর
হরিৎ ফুসফুস,
মগজ;

 

রক্তে দৌড়াচ্ছে মোহ
যেন অন্ধ অশ্বারোহী!

 

মৃত্যুর পদচ্ছাপ কুড়িয়ে পরিচিত প্রেম
ঘনিষ্ঠ হচ্ছে
সমূহ বেদনার সঙ্গে,

 

পিঙ্গল-পাপ মদিরায় ডুবতে ডুবতে
শাসকেরা দেখছে—
হরিৎ ফুসফুস
মগজের পতন!

 


পরিভ্রমণ


 

অসংখ্য মৃত রোদ ঘাড়ে—
হাঁটছি, আদিম অন্ধকারে!

 


শাণকার


 

পুরাতন রক্ত মদিরা থেকে ভেসে আসছে ভাঙা ভাঙা চিৎকার—

 

‘শাণ দেবে শাণ,
গোপন ছুরির ঘ্রাণ।’

 

শোকার্ত প্রান্তর হাঁটতে হাঁটতে ঘড়ির রোদ মুছে
আদিম পাথরে ঘষে যে শাণাচ্ছে ছুরিসমূহ।

 

সেসব ছুরির শৌর্য থেকে
ইতিহাসের পর খসে পড়া প্রাগিতিহাসে আচ্ছন্ন
সহস্র বছরের ত্রস্ত সমূহ অঞ্চল।

 

একদিন ছুরিবিদ্ধ নক্ষত্র গুনতে গুনতে
খুন হয়ে পড়ে থাকে বেওয়ারিশ পৃথিবী,

 

তার মুখে এখনো লেগে আছে
মধ্যযুগীয় ছুরির হাসি।

 

হাসি দেখে তার
মনে পড়ে প্রস্তরকাল, যেখানকার—
প্রতিটি হাসি ছিল—প্রতিটি চুমুর জন্য অভিজ্ঞ শাণকার।

 


সার্কাস


 

লোকটি সার্কাস দেখিয়ে রয়ালিটির চেয়ে বেশি হাততালি পেয়েছিল। হাততালি নিয়ে সে প্রতিদিন ঘরে ফিরতো আর ডানহাতটা দিনদিন ছোটো হয়ে যেতো। ছোটোখাটো হাতে সার্কাস দেখাতে গিয়ে একদিন সে হাততালি কম পেলে ঘরে ফিরতে ভুলে যায়। মানুষের সাজঘর সার্চ করলে পাওয়া যায় সার্কাস দেখানো ছুরিগুলো—যেগুলোর জন্য সে বেশি বেশি হাততালি পেতো।

 


 

রেজাউল ইসলাম হাসু

 

জন্ম রংপরে, ১৯৮৭ সালে। হিসাববিজ্ঞানে সরকারি বাঙলা কলেজ, ঢাকা থেকে স্নাতকোত্তর অর্জন করেছেন। পেশাজীবন শুরু করেন সহ-সম্পাদক হিসেবে। বর্তমানে একটা বেসরকারি সংস্থায় উন্নয়ন-কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। বাংলা ভাষার সৃজনে অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা বেলাভূমি সম্পাদনা করেন।

 

rejaulislamhashu1987@gmail.com

 

প্রকাশিত বই তিনটা

এক. একটি ছুরি অথবা কুড়িটা ঘুমের পিল [২০২১–গল্পগ্রন্থ, বেহুলাবাংলা]
এক. ওকাবোকা তেলাপোকা [২০১৬-শিশুতোষ, প্রিয়মুখ]
দুই. এলিয়েনের দেশ পেরিয়ে [২০১৭-শিশুতোষ, প্রিয়মুখ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *