শূন্যস্থান

169 Views

Spread the love

ব্যাংকে কাজ ছিল। সাধারণ গৃহিণী। টাকা উত্তোলন বা জমা ছাড়া আমার আর কী কাজ! সেটা সেরে একটা দোকান থেকে বাসার গৃহকর্মী মেয়েটির বাবাকে মাসিক বেতনের টাকা বিকাশ করে দিই। তারপর জ্যাম ঠেলে বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সে ঢুকলাম। মেয়ের জন্য টুকিটাকি কিছু কিনতে হবে। ওর বাবার নাকি ফর্মাল কিছু শার্ট লাগবে। আর ডাইনিং টেবিলের উপরের কিছু ম্যাট কিনতে হবে। সেগুলো খুব চমৎকার হতে হবে। দেখি পাই কি না। বসুন্ধরা শপিং প্লেসটা আমার খুব ভালো লাগে। এক এক ফ্লোর এক এক ধরনের জিনিস দিয়ে সাজানো।

 সকলেই করোনা নামে এক নতুন ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। যাকে বলা হচ্ছে Covid 19

এখানে এলে লিফটে না উঠে চলন্ত সিঁড়ি ব্যবহার করি। তাহলে অনেক লোকজন দেখা যায়। মানুষ দেখা আমার পুরনো অভ্যাস। বিয়ের আগ পর্যন্ত ছোটবোনের সাথে সবসময় মানুষের চেহারা মিলাতাম। সেটা এখনও করি। ওর সাথে আর মেয়ের সাথে। দুজন নারী পাশাপাশি থাকলেই মেলাতে থাকি। সহদরা নাকি মা-মেয়ে। এসব মেলানোর খেলায় নানারকম ছোটছোট ট্রিক্স আছে। তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে চেহারা। আত্মজা সাথে থাকলে ওকে নিয়ে এই খেলা খেলি। সে খুব মজা পায়। সদ্য সে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজের বিশাল প্রাঙ্গণে পা রেখেছে। আদিত্য তো এ নিয়ে আমাকে নানাভাবে চ্যালেঞ্জ দিয়ে প্রশ্নবাণে অতিষ্ঠ করে তোলে।

এখানকার মাথার উপরের গোল ডোমটা দেখতে অদ্ভুত লাগে। বিদেশে গেলে তাদের উন্নত, নান্দনিক স্থাপনাগুলো দেখে বিস্মিত হই। ভালোও লাগে। কিন্তু নিজের দেশের এমন একটা চমৎকার শপিংমল আরো বেশি মুগ্ধ করে। টেবিলের জন্য খুব সুন্দর কিছু ম্যাট পেয়েছি। আর ছয়টা অপূর্ব সুন্দর গ্লাস দেখে ছাড়তে পারলাম না। নিয়ে নিলাম। মেয়ে আর ওর বাবার জন্যও সব কেনাকাটা সেরে বুঝলাম খিদে জানান দিচ্ছে। বাসায় ফেরার তাগিদ অনুভব করলাম। সাথে মেয়ে বা আদিত্য না থাকলে আমি কখনোই ফুডকোর্টে বসি না। একা একা ইচ্ছে করে না। চলন্ত সিঁড়ির দিকে হাঁটতে লাগলাম…

এই উইকএন্ডে আদিত্যের বন্ধুরা বাসায় খাবে। মাঝে মাঝেই খায়। আমার হাতের নারকেলের দুধে হাঁসভুনা নাকি তুলনাহীন। সেজন্যই টেবলম্যাট দরকার ছিল। অবশ্য ওইদিন নতুন গ্লাসসেটটারও উদ্বোধন হয়ে যাবে। আদিত্য একটু খোঁচা দিতে ছাড়বে না। তবে খুশিই হবে। বন্ধুদের ব্যাপারে সে উদার। আমি বলি—দিলদার।

চর্বচোস্যলেহ্যপেয় শেষে সবাই বিদায় নেবার পর সবকিছু পরিস্কার করে গুছিয়ে তুলে শুতে শুতে রাত অনেক হয়ে গেল। ছুটা খালা আছে। সহকর্মী মেয়েটি ছিলই। এছাড়াও এমন দিনগুলোতে আদিত্যও হাত লাগায়। কাল সকালে অবশ্য অফিস নেই। তাতে কী। ছুটির দিনের স্পেশাল নাস্তা হবে। দুপুরে কী হবে মনে মনে একটা ছক কেটে মেয়েটিকে বুঝিয়ে বলে ওকে শুতে পাঠিয়ে নিজেও তড়িঘড়ি শুয়ে পড়লাম। আদিত্য একটু বেড়াল ম্যাওম্যাও করে আবার নিজের থেকেই বলল, আজ খুব খাটুনি গেছে। ঘুমিয়ে পড়। বলে মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেয়।

ঘরে রাতবাতির ম্লান আলো। বাইরে রাস্তার কুকুরগুলো কেমন যেন একঘেয়ে করুণসুরে কাঁদতে থাকল।

সকালে উঠে বাসার সবাই দৌড়ায়। সাথে ঘড়ির কাটা, ড্রাইভার, আর গাড়িও দৌড়ায়। ওরা বাবা-মেয়ে চলে গেলে গান ছেড়ে আমি একটু ইয়োগা সেরে নেই। পেপার খুলে বসি। ধীরে-সুস্থে নাস্তা করি। হাতে নেই মগভর্তি সবুজ চায়ের লিকার অথবা বেশি করে দুধ-চিনিসহ কফি। টিভিটা চলতে থাকে। এই সময়টুকু একান্ত আমার। আয়েশের। বিলাসিতার।

টিভিতে খবর চলছে। গত ৩১ ডিসেম্বর বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা জানতে পারে, চীনের উহান প্রদেশে অজ্ঞাত কারণে মানুষ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। পরে জানা যায়, আসলে সকলেই করোনা নামে এক নতুন ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। যাকে বলা হচ্ছে Covid 19। উহান প্রদেশের অবস্থা নাকি খারাপ।

কিছুক্ষণ ফেসবুক দেখি। কিছু ফোনকল সেরে নেই। এরপর আবার শুরু হয় নিত্য দিনকার একই চিন্তা। দুপুরে কী মেন্যু হবে। রাতে কী হবে। মেয়ে কী পছন্দ করে। ওর বাবা কোনটা খায় না। ধোয়া, মোছা, গোছগোছের সংসার।

পরের দিন। রাতের খাবারের পর আদিত্য অস্থির আঙুলে টিভির চ্যানেল বদলাতে বদলাতে হঠাৎ বলে ওঠল—

—আচ্ছা, ওইদিন শপিংমলে তুমি অনেক কেনাকাটা করেছ? আর কী করেছ?

—আর! আর আবার কী…? আরে হ্যাঁ। সেটাই তো তোমাদেরকে বলতে চাচ্ছি। শোন না মজার…

আমাকে থামিয়ে দিয়ে হঠাৎ আদিত্য টিভি অফ করে হাতের রিমোটটা টেবিলে ঠক করে নামিয়ে রেখে অসহিষ্ণু বলে ওঠে—

—চল চল শুয়ে পড়তে হবে। কাল অফিস আছে। মেয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কোন কথা না বলে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়। মনে হলো দরজা লাগানোর শব্দটা স্বাভাবিক নয়।

বিছানায় আদিত্য কোন কথা বলল না। উল্টোদিকে মুখ ঘুরিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘরে রাতবাতির ম্লান আলো। বাইরে রাস্তার কুকুরগুলো কেমন যেন একঘেয়ে করুণসুরে কাঁদতে থাকল। এবারে ঢাকায় বেশ শীত পড়েছে। অর্ধেক লেপের তলায় আমি সজাগ। পুরো ব্যাপারটাই কেমন যেন বিব্রতকর হয়ে ওঠল। আবার মনে হলো, আমিই এমন বিব্রতকর ভাবছি। আসলে ও ক্লান্ত। আচ্ছা আগামীকাল রাতে ঠিক হয়ে যাবে।

পরদিন রাতে খাবার টেবিলে কেউ কোন কথা বলে না। কেমন যেন একটা অস্বস্তিকর থমথমে পরিবেশ। সেদিনের ঘটনাটা খুলে বলতে গেলেই দেখি দুজনেরই ব্যস্ততা। অনাগ্রহ। থেমে যাই বা থমকে যাই। ক্রমশ, বাসায় আমি যেন হয়ে উঠেছি একজন উহান প্রদেশের করোনা ভাইরাস বহনকারী। আমাকে এড়িয়ে চলছে ওরা। কোনভাবেই ভেবে পাচ্ছি না হলো কী! এভাবে সপ্তাহ শেষে আবার ছুটির দিন আসে। এই গুমোটভাব অসহনীয়। দূর করতে চাই। মুখোমুখি হই আদিত্যর। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করলেও সে এড়িয়ে যেতে চায়। বলে—

—কই, কিছু হয়নি তো। খামোখা জল ঘোলা করছ কেন?

—আমি জল ঘোলা করছি না। তুমি ইতোমধ্যেই তা করে রেখেছ।

তারপর অনেক পীড়াপীড়িতে সে খুলে বলে।

মেয়ের বন্ধুর বাবা জানিয়েছে। শপিংমলের ফুডকোর্টে কার সাথে আমি খেয়েছি। আর হাস্যরসে গল্প করেছি । আমাকে সুন্দর দেখা গেছে।

সংসারের ছেঁড়াফাটা জায়গাগুলোকে ঠিকঠাক রিফু করা দরকার। যেন একদম নতুন দেখা যায়।

নিমিষেই ধোঁয়াশা কেটে সব পরিষ্কার। কিন্তু এতদিন ধরে যে মজার গল্প বলার জন্য মেয়ে-স্বামীকে চেয়েছি, মুহূর্তে তা নিভে যায়। আর চাই না। কত-কী ভেবে রেখেছিলাম। মজা করে ওদেরকে জানাব। বন্ধুকে একদিন বাসায় নেমতন্ন করব…

আমার ভার্সিটির বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছিল। সে থাকে দেশের বাইরে। শপিং শেষে যখন এক্সলেটরে উঠতে যাব, তখনই দেখা। ওর পীড়াপীড়িতে ফুডকোর্টে বসে খাওয়া। খাওয়া তো মুখ্য নয়, মুখ্য ছিল কথা। কুশল বিনিময়। সেটাই মেয়ের বন্ধুর মা দেখে নিজ মেয়ে ও স্বামীকে জানিয়েছে।

ক্রোধে কান, মাথা ঝাঁঝাঁ করতে লাগল। বিবমিষায় মন তিতা হয়ে ওঠল। ইচ্ছে করল কাউকে কিচ্ছু বলব না। তোমরা থাকো তোমাদের ভাবনা নিয়ে। আমার কিচ্ছু যায় আসে না। দুপুরের খাওয়া শেষ হলো গভীরতম নিরবতায়। সমতল নিষ্প্রাণ টেবিল থালা-বাটি বুকে ধারন করল সন্তপর্ণে। মেয়ের মুখ কালো। গম্ভীর।

দিন শেষে সন্ধ্যা এলো। জানুয়ারির বিকেলগুলো দ্রুতই ফুরিয়ে আসে। হিমরেণু নামছে শহরে। হিমের শৈত্য। নরম একফালি রোদ তেরচা হয়ে গড়িয়ে আছে। চারপাশের সব বারান্দায় মরশুমি ফুলের বাহার।

বারান্দার তৃষ্ণার্ত কুঞ্জলতা, ক্যামেলিয়া, অপরাজিতাকে জল দিতে দিতে ক্রোধ ক্রমে বিষাদে রূপ নেয়।

নিজেকে বোঝাই। এই অস্বস্তি আমাকেই দূর করতে হবে। নিরবতা আমাকেই মুখর করতে হবে। বিবমিষা, অরুচিকে দূরে ঠেলে দিয়ে ওর মুখোমুখি হলাম। ওকে সব খুলে বললাম। সে আগে থেকেই আমার এ বন্ধুর কথা জানত। চুপচাপ শুনতে শুনতে ক্ষণে ক্ষণে মুখভাব বদলাতে লাগল। নিমেষেই চাঙ্গা। চোখমুখ উজ্জ্বল করে বলে ওঠল—

—আরে ধুর, বাদ দাও তো! আমি তোমাকে চিনি না! এসব কোন কথা হলো! এই রাজ্জাক সাহেব মানুষটাই আছে কেবল মানুষের কান ভারি করতে। যত্তসব! উঠো তো। যাও। রেডি হও। আজ বাইরে ডিনার হবে। শোন, আজ কিন্তু তুমি শাড়ি পরবে…
ওর উল্লাস আমাকে স্পর্শ করে না, চোখে চোখ রাখি। স্থির, ক্লান্ত…

—প্রথমত, সত্যিই তুমি আমাকে চেনো না। দ্বিতীয়ত, বহু মহলিা রাজ্জাক আছে কান ভারি করার জন্য। কই আমার কান তো ভারি হয় না। এসব রাজ্জাক মার্কা কথাবার্তা আমার বিশ্বাসের দেয়াল টপকে কান অবধি পৌঁছুতেই পারে না। তা আবার ভারি! খুব মৃদুকণ্ঠে বলা শেষে মেয়ের ঘরের দিকে হাঁটতে লাগলাম।

সদ্য পা দেয়া কলেজে ওর মেয়েবন্ধুর পাশাপাশি ছেলেবন্ধুও আছে। আজ থেকে ১০/১৫ বছর পরে কোন ছেলেবন্ধুর সাথে ওর দেখা তো হতেই পারে। সংসারের ছেঁড়াফাটা জায়গাগুলোকে ঠিকঠাক রিফু করা দরকার। যেন একদম নতুন দেখা যায়।

দরজায় টোকা দিই। এখানেও ধূলি পরিষ্কার করার দায়িত্ব আমারই।

 


কাজী লাবণ্য

রংপুর জেলায় জন্ম, ঢাকায় বসবাস।

পড়তে, ঘুরতে আর বাগান করতে ভালোবাসেন।

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ

নাকছাবি [ অক্ষর প্রকাশনী, ২০১৫ ]

জোনাক বনে জোসনা [ প্রিয়মুখ, ২০১৭ ]

যযাতি কন্যা [ বেহুলা বাংলা, ২০১৯ ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *