স্যামুয়েল গ্রিনবার্গের কবিতা

458 Views

Spread the love

আমেরিকান সাহিত্যে আধুনিকতাবাদের দ্বিতীয় স্বর হলেন স্যামুয়েল গ্রিনবার্গ। তিনি অস্ট্রিয়ানআমেরিকান ইহুদি কবি এবং শিল্পী ছিলেন। ১৩ ডিসেম্বর, ১৮৯৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে জন্মগ্রহণ করেন এবং দারিদ্র্যে বড় হন। জীবনের শেষদিনগুলো দাতব্য চিকিৎসালয়ে কাটান। ১৬ আগস্ট, ১৯১৭ সালে মাত্র তেইশ বছর বয়সে ওয়ার্ডস আইল্যান্ডের ম্যানহাটন স্টেট হাসপাতালে যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

আমেরিকান সাহিত্যে আধুনিকতাবাদের দ্বিতীয় স্বর হলেন স্যামুয়েল গ্রিনবার্গ। তিনি অস্ট্রিয়ান-আমেরিকান ইহুদি কবি এবং শিল্পী ছিলেন। ১৩ ডিসেম্বর, ১৮৯৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে জন্মগ্রহণ করেন এবং দারিদ্র্যে বড় হন। জীবনের শেষদিনগুলো দাতব্য চিকিৎসালয়ে কাটান। ১৬ আগস্ট, ১৯১৭ সালে মাত্র তেইশ বছর বয়সে ওয়ার্ডস আইল্যান্ডের ম্যানহাটন স্টেট হাসপাতালে যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

মৃত্যুর একুশ বছর পর তার মরণোত্তর সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ১৯৩৯ সালে ‘গ্রিনবার্গের পাণ্ডুলিপি থেকে : নির্বাচিত কবিতা’ শিরোনামে জেমস লাফলিনের সম্পাদনায় প্রকাশ হয় সেই সংস্করণটা।

গ্রিনবার্গ এর আগে বাংলাদেশে অনূদিত হয়েছে বলে সেরকম কোনো ডকুমেন্ট বা তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সেমতে, এবারই প্রথম বাংলাভাষায় স্যামুয়েল গ্রিনবার্গ পঠিত হবেন বাঙালি পাঠকের কাছে। এছাড়া, কাকতালীয়ভাবে দারিদ্যে কাজী নজরুল ইসলাম, গ্রন্থ-প্রকাশে জীবনানন্দ দাশ আর মৃত্যুতে সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো তিন বাঙালি কবিকে স্পর্শ করেছেন তিনি।

 

লাফলিন গ্রিনবার্গের ডায়েরিগুলো থেকে যত্নের সঙ্গে কবিতা সংগ্রহ করে সম্পাদনা করেন। লাফলিন “দিকনির্দেশ” এর একটা প্রতিলিপি হোলোগ্রাফ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন উক্ত বইয়ে। তিনি গ্রিনবার্গের শিল্পকর্মকে ‘বিশুদ্ধ কবিতা’ বলে আখ্যায়িত করেন—

“গ্রিনবার্গের কবিতা দুর্দান্ত কবিতা নয়, এমনকি সামান্য কবিতাও নয়… এবং আদতে সেগুলো কবিতা। সেগুলো অন্যান্য কবিদের ব্যাপ্তির সমান বিশুদ্ধ কবিতা। ”

২০১০ সালের কথা, লরিজ ফাগিনের সাল মিমিওর নবম সংখ্যায় গ্রিনবার্গের নির্বাচিত কবিতাগুলোর কিছুংখ্যক প্রকাশ করা হয়। ফাগিনের মতে—

আমি অনেকদিন আগে, গ্রীনবার্গের কয়েকটি কবিতা সংগ্রহ করি, যা ১৯৫৪ সালে ফ্র্যাঙ্কফুর্টের একটি মার্কিন সামরিক গ্রন্থাগার ঘুরতে গিয়ে স্পিয়ারহেডের বার্ষিকনিউ ডিরেকশনসথেকে পাই। লাফলিন মূল বানান এবং রূপগুলি অক্ষুণ্ন রেখেছিলো। অনেকের ধারণা, আমি জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড় সংস্করণে নিরাশ হয়েছি এবং সাধারণত এড়াতে পেরেছি।

স্পিয়ারহেডে গ্রীনবার্গ পাণ্ডুলিপি থেকে নয় বছর আগের কবিতার প্রায় একই নির্ভুল প্রতিলিপি রয়েছে। লাফলিনের সংস্করণগুলো অনুসরণ করে ফাগিনের প্রকাশিত কবিতাগুলো থেকে কিছুসংখ্যক এখানে অনুবাদ করা হলো।

স্যামুয়েল গ্রিনবার্গের কবিতা

প্রিয় ড্যানিয়েলকে

মৃত্যুর আছে কোলাহল জানি
যেখানে শুয়েছি—আমি;
জীবনের আছে কোলাহল, সে তো
দূর-বহুদূরগামী!

নাতিদীর্ঘ সে ভ্রমণ থেকে
আমি কি এসেছি উড়ে;
নাতিদীর্ঘ সে অভিমান থেকে
আমি তো উঠেছি ফুঁড়ে!

এখন কীসব বিষয়-আশয়
তোমার-আমার মাঝে?
এখন সেসব বিষয়-আশয়
কার বেহালায় বাজে?

আবারো এসেছে বিবর্ণময়
তুমুল অন্ধকার;
আবারো বইছে রঙের ঝর্ণা
রাঙাতে শাড়ির পাড়।

ফ্যাকাশে ফলক

রূপোলি মাতম করা
সে ধূসর।
নিবিষ্ট ঘন-সবুজের
বায়োগ্রাফি,
শিলা ও কাদা-মাটির
ফ্যাকাশে চড়ুই;
সুস্বাদুময় উত্তেজনার—
সে তো এক কটিবন্ধন,
যেমন—
ফুলের দীর্ঘশ্বাস ফেটে
অশ্রুঝর্ণা ঝরে
যে—কোনো উপায়ে,
নগ্ন শ্লেষ
সবকিছু রাখে ধ’রে।

উত্তর উঁচু সপ্তক কোনো
পুরনো বেহালা-ব্যঞ্জনা যেন
মূর্ছা যাওয়া প্যালেটগুলি
ভাষার জোয়ার-ধূলি
ঘুরে-ফিরে
সুন্দরে সন্ধানময়
ভোজন-বিলাসী সময়,
অন্তরভ্রুকুটি
ফ্যাকাশে উত্তাপ,
জমাট রক্তক্ষরণ
দৃশত এমন।
হীনতা যাপন-ধ্যান
যেন সে রঙের
অপস্রিয়মাণ।
তবু দেখানোর
হয় না সাহস—
কেবল একটা
ভ্যাম্পায়ারের রথ
তুমি কি
সেসব ধ্বংসস্তূপ
ভুলে যেতে পারো—
অবমুক্ত কি
আছে সেই—
ভষ্ম-পালকপথ?
অদৃশ্য হাওয়া,
ময়লাটে—
মুষ্টিবদ্ধ
একটা গোলাপ
মসৃণ ছায়া
ভয়দ কায়া
হিংসুটে চোখ
মায়াময় পোক
দুর্লভ প্রোটিন
আরোগ্যময়
আলো-অন্তরীণ
ক্ষয়িষ্ণু চাঁদ
এবং এখানে,
অ্যাশট্রে স্ফীতময়
ছাইদিন…

দুই.

সাদা হয়ে গেলো নীল,
পৃথিবী দিয়েছে যা—
বালজমাইজড সত্য,
আবরণ এক
তবু সে নগ্ন-বিভায় দীপ্ত
প্রেমের যোনিপথ
শিলার তাড়নে কাঁপে
কোঁকড়ানো ধাতু
ত্বকের তরঙ্গে
অদ্ভত ভাষা আর
কণ্টকময় দাগ
ফণিমনসার ঝাড়
কাঁচা রঙ্গক
শূকরশাবক
ডিসপোজেবল
শিৎকার,
শ্যাওলার আবরণে
মর্মরে যাপনে
আমি—
যেন আলকাতরাতুল্য,
যেন হিলিয়াম যুগন্ধর
অপ্রতিম ও বেগানা,
রূপের মাঝারে
ভিন-বন্দর
নৈরাশ্য আছে,
তারই ভেতর
কামনা-তৃষ্ণা
জলাঙ্গীর ঢেউ সে
যেন সোনার হাঁসুলি-বাঁধা
আরণ্যক করোটি,
অধৈর্যশীল—
হলুদাভ ধ্বনি
চেতনার মন্থন,
সুনসান পর্বতে
এক সোনালি মরণ
তার ক্রীতদাস—
ঈশ্বর, এখনও
তারই রাত্রির শ্বাস…

তিন.

লোহার উত্তাপে
ডুবে গেছে ক্লোভার,
ডাকাতি হয়েছে
ফ্যাকাশে পদ্ম,
সোনালি পাপড়ি
ভূতুরে শবযান,
যেখানে কালো
ঘোর-অরণ্য—
ভঙ্গুর প্রবাহ।
নির্জন-কাঙ্ক্ষায়
বিমূর্ত বোধে
ফ্যাকাসে জীবন,
এলোমেলো বিচ্ছেদ
আরণ্যক ব্যঞ্জনা,
টিস্যু-মুক্ত
প্রলক্ষণ—
পুনর্জীবন,
নিরীহ বৃক্ষ;
ম্রিয়মান—
বরফখণ্ড,
বাঁকানো ছিদ্রপথে
বসে কোন কবি?
হয়তো সে—
আলোকিত,
পরিমিত,
সৌম সৌষ্ঠব।
সকালের অর্চনাগীতি
রোডস নদীর ঢেউ
বাতির কাহিনি
শয়তান-সমাধিতে,
নন্দনমঠে
বনিয়াদি রাষ্ট্র
যাদুর ক্লোভার
তীব্র আতর থেকে
উদ্দীপ্ত, সে আত্মা!

আরোগ্য

সেবিকা, আমার আরোগ্য চাই! আরোগ্য কোনখানে?
আরোগ্য চাই! আরোগ্য আমার জ্ঞান আর অনুধ্যানে।
অসুস্থ বন! সব ছেড়ে আমি—ছুটবো তোমার পানে!
সত্য একটা খেরোখাতা হায়!
সপ্রেমে মহা-যুদ্ধগাঁথায়
সম্মত হতে সম্মোহনের গানে!
সেবিকা, আমার আরোগ্য চাই! আরোগ্য কোনখানে?

সে আমার বাঁয়ে, ঝিমুনি চশমা, আবছায়া! আবছায়া!
দাও আমাকে দূরত্ব ধার, দাও কণ্টকমায়া!
তার চিৎকার—কতো অবহেলা করে যাবো চিরকাল!
সে-ই তো কাঁপালো নাঁড়ী অলক্ষ্যে, কোনো এক আবডাল।
যেন স্যামসন-সমাধিকক্ষ—কখনো মূর্ছা, বিমূর্ত শবকায়া’
সে আমার বাঁয়ে, ঝিমুনি চশমা, আবছায়া! আবছায়া!

আমি তো আদৌ গৌরববোধে আঁধারে বিভার তরি।
দাতব্যগণ হয়তো আমার পোষক করেছে ঘড়ি!
ভাবিতব্যের ক্যানভাসকারী
রুদ্ধ করো না তরঙ্গ তার-ই
হচ্ছে কীসব—অথবা কীসব হতে পারে অতিমারি!
আমি তো আদৌ গৌরববোধে আঁধারে বিভার তরি।

ঈশ্বর

আমি তার পিছু নিয়ে নিঃশব্দে ঝরে গেলাম।
যদি আমাদের সাক্ষাৎ হয়?

প্রতিপালক, আমাকে যেসব দিয়েছে, সেসব তো ক্ষুদ্রঋণ!
সুলভ দ্রব্যসমূহ। পর-জগতের কাছে তুচ্ছ-তাচ্ছল্য।
তিনি গর্ভবতী সমুদ্রের প্রবাল ধরে রাখতে
দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

উখার গুঁড়োর ছায়াগুলো তিনি কেবল পরিবর্তন করেন,

লোগোগুলি বলে, তার অদৃশ্য শিশির
প্রতিপালিত হবে না, যেন খাঁচা থেকে
কাঁচা সুগন্ধযুক্ত তাঁর আবরণ;

কী স্ফীতশীল পর্বতসমূহ,
নোঙরা পৃথিবী আর পচনশীল শরীর?

তারপরেও যদি চেতনা ফেরে। শোষণের ঝর্ণা,
একই চিন্তায় প্রবাহিত হলে, তবে তার শেষ কোথায়…

পুরাতন নদী

এটাই কি সেই পুরাতন নদী—গল্প শুনেছি যার,
যেইখানে ফেরি, পালতোলা তরি আলোড়ন উঠা, আর—
তরঙ্গমালা অন্তর্গত আবছায়া ছুঁয়ে ডুবো—
ভিখারির মতো বাড়িয়ে দুহাত দেহাতে দাঁড়াই তব!

আর দেখে নিই—ঝিকিমিকি ঢেউ—রূপোলি ডানার চিল ,
যে-ই খুলেছিলো উজ্জ্বল সাদা আদিম গুহার-খিল।
ভোর-আবিরের এলোমেলো বাঁকে
কোন সে দহন নিরবধি ডাকে—

কেবলি দেখবে! ড্রিপলিং নদী—গহিনের গভীরতা,
সে তো ফোঁটা ফোঁটা পতঙ্গ আভা, আবছায়া কথকতা।
রুপোলি ঝিলিক ছড়ানোর বাঁকে নৌকাটি নিলে মোড়—
বিমৃর্ত এক ছায়া চলে যায়—অদ্ভুত-লাগা ঘোর!

আর মায়াবত নদী থেকে খুব কমনীয় লোভাতুর,
আর উন্মুখ নৌকার গাদা থেকে শিৎকার-খুর—
পৃথক করে—নেই সেইখানে এমন ছুরিত সুর,
কাচ-কুয়াশায় কামনা কখনো মধুর বা ব্যথাতুর!

কৈফিয়ত

তুমি কি সসীমের ভেতর দেখেছো—কোমল উত্থান?
তবে তোমার সর্বশক্তিমানকে টের পাও, তারপর আমরা খুঁজে বেড়াই,
নিরঙ্কুশ সত্যের ঝিলিক, যা তার ডানার ঝাপটানিতে বাঁধা—
সমস্ত! তবে ফাঁকা বাঁশি, যে তার ক্রন্দনকে আলিঙ্গন করে—অদূরে!
আহ! নিচু পর্বত, টবের মাঝখানে সৌরভ,
মনমরা পরিভ্রণ—আমি তোমাকে ছেড়ে চলে গেছি বারবার!
আমার এইরকম প্রকৃত তাচ্ছল্যর স্মৃতি স্ল্যামবারে
শোধরানোর কোনো পথ নেই! যেহেতু, আমার বিশ্বাস তবে—
একটি অরক্ষিত নীল নক্ষত্র—আমার আত্মার মধ্যে জঘন্য,
ক্লোমবি, তোমার প্রাচীনকে বলো—অনন্তর আগুন-কাহিনি,
আমি মহত্বের সাথে দেখেছিলাম, ওই উৎক্ষিপ্ত ইতিহাস—আমার যৌবনের কাছে

আসে আর ফিসফিস করে উল্লাস! এই তো আশিকের শক্তি!
পরম নম্রতার সঙ্গে নন্দন ফুটে উঠছে, একেই তো বলে—অমরত্ব!


 

রেজাউল ইসলাম হাসু

 

জন্ম ১০ ডিসেম্বর, ১৯৮৭; রংপুর।

শিক্ষা : হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর, সরকারি বাঙলা কলেজ, ঢাকা।

পেশা : চাকরি [একটি বেসরকারি সংস্থায় উন্নয়ন-কর্মী হিসেবে।]

প্রকাশিত বই—
ওকাবোকা তেলাপোকা [ শিশুতোষ, ২০১৬]
এলিয়েনের দেশ পেরিয়ে [শিশুতোষ, ২০১৭]

সম্পাদনা : www.belabhumi.com [ বাংলা ভাষার সৃজনে অনলাইন সাহিত্যপত্রিকা ]

ই-মেইল : rejaulislamhashu1987@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *