2nd November, 2020 | | 0

বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ ও ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

239 Views

Spread the love

‘যখন উপড়ে নিলো তোমার দু’চোখ ওরা সেই কারাগারে, তখন দুঃখিনী বাংলা ভাষা আর্তনাদ করেছিল গুলিবিদ্ধ হরিণীর মতো।’

১৯৭১-এ বীর ভাষাসংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রতি পাকিস্তানি হানাদারদের নিষ্ঠুরতার চিত্র এভাবেই বাঙ্ময় হয়েছে ১৯৯৩-এ লেখা শামসুর রাহমানের কবিতায়।

১৮৮৬ সালের ২রা নভেম্বর ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার রামরাইলে জন্ম নেয়া মানুষটি মানুষটি আমৃত্যু জড়িত ছিলেন আইন পেশায় এবং মানবসেবায়। সাতচল্লিশের দেশবিভাগের পূর্ব থেকেই গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় ধীরেন দত্ত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত এবং প্রাদেশিক স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন। তবে এসবকিছুই গৌণ পরিচয় হয়ে যায়, যখন বাংলা ভাষার জন্য তাঁর সীমাহীন সংগ্রাম আমরা পাঠ করি ইতিহাসের পাতায় পাতায়। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস-রচয়িতা বদরুদ্দীন উমর বলেন :

‘দেশবিভাগের পর তিনি পাকিস্তান সংবিধান সভার সদস্য হিসেবে করাচীতে অনুষ্ঠিত তার প্রথম অধিবেশনে যোগদান করেন এবং তৎকালীন পূর্ববাংলায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪৭ সালে গঠিত সংবিধান সভা একই সাথে পাকিস্তান গণপরিষদ হিসেবেও কাজ করে। গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন করাচীতে অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তান গণপরিষদের এই অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই পূর্ববাংলায় বাংলাকে অফিস-আদালতের ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম করার জন্য ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনেরই প্রতিফলন ঘটে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কর্তৃক উত্থাপিত ভাষা বিষয়ক একটি প্রস্তাবের মধ্যে। এই প্রস্তাবটিতে তিনি বলেন যে, উর্দু ও ইংরেজির সাথে বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহারের অধিকার থাকতে হবে।’

( সূত্র : আনিসুজ্জামান ও অন্যান্য সম্পাদিত শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মারকগ্রন্থ, ১৯৯৪)

ভাষা আন্দেলনের আদিপর্বে সেই ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান গণপরিষদের সরকারি ভাষা হিসবে ইংরেজি ও উর্দুকে প্রস্তাব করা হলে ধীরেন দত্ত একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং প্রস্তাবের পক্ষে ঐতিহাসিক বক্তৃতায় বলেন :

“একটা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হওয়ার নীতি কি হওয়া সঙ্গত? একটা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হবে সেই রাষ্ট্রের অধিবাসীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যে ভাষা বলে সেই ভাষা। আর সে কারণেই আমি মনে করি আমাদের রাষ্ট্রের ‘লিংগুয়া ফ্রাংকা’ বা প্রকাশের মাধ্যম হচ্ছে বাংলা। “

পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের এই প্রস্তাব অগ্রাহ্য হয় কিন্তু ছাত্রজনতার মধ্যে তৈরি করে প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ যা দাবানল হয়ে দেখা দেয় ১৯৫২ এর ফেব্রুয়ারিতে। আটচল্লিশের পথিকৃৎ ভাষাসংগ্রামীর বায়ান্ন’র ভূমিকা নিয়ে সদ্যপ্রয়াত ভাষাসংগ্রামী আনিসুজ্জামানের মূল্যায়ন :

‘সেদিনও (২১ শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২) গুলি চালনার পর ব্যবস্থাপক পরিষদে প্রথমে আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ও তারপরেই ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বলেন যে, গুলিতে ছাত্রহত্যার পরিপ্রেক্ষিতে পরিষদের কাজে অংশগ্রহণ করা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিরোধী দলের মুলতবী প্রস্তাব অগ্রাহ্য হলে তাঁরা পরিষদ ছেড়ে চলে যান। পরদিন পরিষদ আবার বসলে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রতিবাদ করেন ‘মর্নিং নিউজ’ পত্রিকার মিথ্যাচারের; জানতে চান কারফিউ জারি করা হয়েছে কিনা, শহরের নিয়ন্ত্রণ সামরিক বাহিনীর ওপরে অর্পিত হয়েছে কিনা। তিনি নূরুল আমিনের কোনো কোনো উক্তির প্রতিবাদ করেন এবং গণপরিষদের পূর্ববঙ্গীয় সদস্যদের প্রতি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব তোলার বিষয়ে ম্যানডেট দেওয়ার জন্য মনোরঞ্জন ধরের প্রস্তাব সমর্থন করেন। ১৯৫২ সালের এপ্রিলেও গণপরিষদে তাঁর বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর শোনা গিয়েছিল বাংলার দাবির সমর্থনে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত নিজে যা করেছিলেন,তার চেয়েও বড় কীর্তি আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে দেওয়ায়। সে আগুন সবখানে ছড়িয়ে গিয়েছিল।”

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর ‘আত্মকথা’য় (আনিসুজ্জামান, রশীদ হায়দার ও মিনার মনসুর সম্পাদিত, ১২৫-তম জন্মদিনে ‘জার্নিম্যান বুকস’ কর্তৃক পুনঃপ্রকাশিত) বাংলা ভাষার জন্য তাঁর সংগ্রামের বিষয়ে বিশেষ কিছু বলেননি, কারণ মাতৃভাষার প্রতি একে তাঁর ‘অবশ্যকর্তব্য’ মনে করেছেন সবসময়, তবে তাঁর অবদানের কথা বলতে ভুলেননি বঙ্গবন্ধু। ১৯৭১ এর ১৫ই ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির একুশের অনুষ্ঠানমালা উদ্বোধন করতে গিয়ে তাঁর ভাষণের শুরুতেই বলেন :

‘একমাত্র কুমিল্লার শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তই উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রতিবাদ করেন এবং উর্দুর সাথে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবী জানান।’

বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেয়েছে আর আটচিল্লিশ-বায়ান্নের দৃপ্তকণ্ঠ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে যেন সে কারণেই পাকিস্তানি হানাদাররা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। প্রিয় শহর কুমিল্লার বাড়ি থেকে পুত্র দিলীপ দত্তসহ ২৯ শে মার্চ, ১৯৭১ কুমিল্লা সেনানিবাসে ধরে নিয়ে ধারাবাহিক নির্মম নির্যাতন চালালে সেবছরের এপ্রিলে শহিদ হন তিনি। তাঁকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার বিধুর মুহূর্তটি বর্ণিত হয়েছে ১লা ফেব্রয়ারি, ১৯৯২ দৈনিক ভোরের কাগজ-এ প্রকাশিত মিঠুন মুনতাসিরের লেখায় :

‘১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ। কুমিল্লা শহরে কারফিউ। ভয়ংকর নিস্তব্ধতা চারদিকে। থেকে থেকে ফৌজি গাড়ির আওয়াজ আর কুকুরের ডাক। পঁচাশি বছর বয়সের এক বৃদ্ধকে খুব শান্ত দেখাচ্ছিল তখন। সন্ধ্যার সময় মাথা ধুলেন। নাতনীকে ডেকে বললেন একটি গ্রন্থ (গীতা) আনতে। লাল পেন্সিল দিয়ে দাগ দিয়ে শোনালেন ওই গ্রন্থ থেকে ‘দেশের জন্যে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিলে সে মরে না, সে শহীদ হয়, সে অবিনশ্বর, তাঁর আত্মা অমর।’

বাংলা ভাষার সেই বীর সংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাদেশের জন্য শহীদ হয়েছেন। কিন্তু তাঁর নাতনি আরমা দত্তের মতো আমাদেরও আক্ষেপ দূর করাচির গণপরিষদে ১৯৪৮ সালে যে মানুষটা বাংলার পক্ষে নির্ভীক কণ্ঠ উচ্চারণ করলেন, তাঁর নামে বাংলা ও বাঙালির স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী আর ভাষা আন্দোলনের সত্তর বছরের প্রাক্কালেও আমরা কোনো স্মারক খুঁজে পাই না। আসাদ চৌধুরীর ‘স্মরণের মীঢ়ে ধীরেন’

কবিতাতে হয়তো খুঁজে পাব গ্লানিময় আমাদের কিছুটা :

‘তাঁর জন্যে যতো শ্রদ্ধা, নিজেদের প্রতি ততো ঘৃণা,
কারাগার তাঁকে চেনে
ঘাতক বুলেট তাঁকে চেনে

শুধু অকৃতজ্ঞ আমরা চিনি না।’


পিয়াস মজিদ

জন্ম ২১ ডিসেম্বর,১৯৮৪; চট্টগ্রাম। স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর
ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
নাচপ্রতিমার লাশ [২০০৯]
মারবেল ফলের মওসুম [২০১১]
গোধূলিগুচ্ছ [২০১৩]
কুয়াশা ক্যাফে [২০১৫]
নিঝুম মল্লার [২০১৬]
প্রেমপিয়ানো [২০১৯]
ক্ষুধা ও রেস্তোরাঁর প্রতিবেশী [২০১৯]
নির্ঘুম নক্ষত্রের নিশ্বাস [২০১৯]
দুপুরের মতো দীর্ঘ কবিতা [২০২০]
গোলাপের নহবত [২০২০]
বসন্ত, কোকিলের কর্তব্য [২০২০]

ই-মেইল : piasmajid@yahoo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *