আমার বাবা আমার যিশু-০৬

116 Views

Spread the love

আট

মাঝে মাঝে বাবার হাতে একটিও পয়সা থাকতো না। আবার কীভাবে যেন পয়সা এসে যেতো। বাবার ভাগে দাদার রেখে যাওয়া তিনটে ছোট বসতবাড়ি গড়েছিল। সারাটা বছর সেইবাড়ি ভাড়া থাকতো। একেকটি বাড়ির মাসিক ভাড়া ছিল পাঁচ টাকা। সেদিনের হিসাবে কম টাকা নয়! সে টাকাতেও বাবার কুলাতো না। বাবার হাতে যখন অনেক টাকা থাকতো, বাবার কাজ ছিল মানুষের ছেলেমেয়েদের বিয়ে দেওয়া। বিশেষ করে মেয়েদের। কত মেয়ের যে বাবা বিয়ে দিয়েছেন তার কোনো হিসাব নেই। বাবাকে বাইরের লোকজন খুব ভালোবাসতো। আবার ভয়ও করতো। বাবাকে তারা ডাকতো মেজোভাই বলে। যেহেতু বাবা ভাইদের ভেতরে দুই নম্বর ছিলেন।

একবার যশোরে একজন গণ্যমান্য ব্যক্তির মেয়ের বিয়ে হবে। বাবাকে তিনি মেয়ের বিয়েতে নিমন্ত্রণ করেছেন। কিন্তু বাবা যাবেন কী করে! বাবার হাতে এমন পয়সা নেই যা দিয়ে তিনি নবদম্পতির জন্যে উপহার কিনে নিয়ে যাবেন। ফলে মন তার খারাপ। কারণ, যে ব্যক্তির মেয়ের বিয়ে তিনি বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। একদিন সকালবেলা দেখি—বাবা রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে মায়ের সঙ্গে বলাবলি করছেন—তাইতো রে, আমি তো ভীষণ এক ঝামেলায় পড়ে গেলাম, বুলুর মা। হাতে একটা পয়সা নেই যে কিছু কিনে উপহার দেবো। আমার উচিৎ তো মেয়েকে সোনার গহনা উপহার দেওয়া। অথচ তার উপায় নেই। সামান্য কোনো উপহার যদি দিই তাহলে বিয়ের উপহার যখন খুলবে তখন সকলে হাসাহাসি করবে না? আমার সম্মান তখন কোথায় থাকবে? মা বাবার কথার উত্তরে বললেন, সেটা তো ঠিক কথা বলেছো। আমি সেইসময় কলের পাড়ে দাঁড়িয়েছিলাম। খুব সম্ভব দাঁত মাজছিলাম বা অন্যকিছু। বাবামায়ের কথার ভেতরে আমার কোনো স্থান নেই। শুধু নীরবে শুনে যাওয়া ছাড়া। আমি তখন ক্লাস সেভেন বা এইটে পড়ি।

বাবার কথা শুনে আমি ফস্ করে বলে ফেললাম—কেন, কোরানশরিফ তো দেওয়া যায়। মাত্র দশ টাকা দাম! আর কোরানশরিফ পেয়ে কেউ নিন্দা করতে পারবে না! আমার কথা শুনে বাবা যেন স্তম্ভিত! মা মুচকি হাসলেন। বাবা আমার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে বাইরে চলে গেলেন। মনে হলো, আমার মাথা থেকে এই বুদ্ধিটা বেরোলো দেখে তিনি অসন্তুষ্ট। এটা তো তাঁর মাথা থেকেই বেরোবার কথা! তবে পবিত্র কোরানশরিফ কেনা হলো এবং লাল ফিনফিনে কাগজ দিয়ে সেটা সুন্দর করে মুড়িয়ে নিয়ে বাবা বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে গিয়ে হাজির হলেন।

আমি মন খারাপ করে আপনমনে বাড়ি ফিরে এলাম এবং জগতের একটি নিষ্ঠুর মিথ্যার সঙ্গে পরিচিত হলাম।

বাবার নামাজ-রোজার প্রতি অতো ভক্তি ছিল না। কেন যেন তাঁর ধারণা ছিল—মানুষ বেসিক্যালি খারাপ। নিজের দোষ ঢাকার জন্যে মানুষের যতসব কায়দাকানুন। সুতরাং মানুষের আপাতনিরীহ মনোভাব তাঁকে আপ্লুত করতে পারতো না যেন কখনোই। মানুষের সাইকোলজি সম্পর্কে তাঁর যেন দিব্যি ধারণা ছিল। একবার আমাদের বাড়িতে একজন কাজের ছেলে কাজ করতে এলো। ছেলেটি দেখতে বেশ ভদ্র। রং ফর্সা। তার ওপর এত ভালো, বিনয়ী এবং শান্ত যে আমরা তাকে বাড়িতে কাজের ছেলে হিসাবে পেয়ে খুবই খুশি হলাম। বিশেষ করে মায়ের খুব বাধ্য ছেলে ছিল সে। অনেকদিন বাদে সংসারে মনের মতো একটি হেলপিং হ্যান্ড পেয়ে আমার মা ভীষণ খুশি। নামটা এতদিনে স্মরণে নেই। খুব সম্ভব গনি বা এই জাতীয় কিছু হবে। এরমধ্যে মাস দুয়েকও হয়নি, আমার বাবার হাতঘড়িটা তাঁর নিজের শোবার ঘর থেকে চুরি হয়ে গেল। দামী হাতঘড়ি। তারওপর বাবার হাতঘড়ি। সুতরাং বাড়ি জুড়ে হৈচৈ শুরু হয়ে গেল। বাবা একটু পরে কাজের ছেলেটিকে ডেকে বললেন—এই ছেলে, আমার ঘড়িটা ফিরিয়ে দে। বাড়িশুদ্ধ মানুষের সামনে তাঁকে এভাবে চার্জ করাতে সে তো হতবাক। ব্যাকুল হয়ে সে বলে উঠল—চাচাজান, আপনার ঘড়ি আমি চোখেও দেখিনি! বাবা বললেন, দেখেছিস কি দেখিসনি, সেটা আমার বিবেচ্য নয়, তুই শুধু আমার ঘড়িটা এনে দে। আমি কিছু বলব না। বাবার এরকম কাঠখোট্টা কথা শুনে আমি প্রতিবাদী হয়ে বললাম—বাবা, গনি তোমার ঘড়ি নেয়নি। ও তো তখন বাজারে গিয়েছিল। বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, চোপ! কিন্তু আমি চোপ করলে কী হয়, রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে মায়ের কাছে এসে বাবার নামে নালিশ দিলাম। বললাম, দেখেছো মা, বাবা কীভাবে গনিকে চোর সাব্যস্ত করেছে। অথচ আমি জানি—গনি চুরি করেনি! মা বললেন, তোর বাবাকে বোঝাবে কে? এতদিন বাদে একটা ভালো কাজের ছেলে পেলাম, তোর বাবাও দেখেছে—তাকে পেয়ে আমি কত খুশি, এখন তার ইচ্ছে ছেলেটাকে বাড়ি থেকে তাড়াবে। আমার সুখ তো তার সহ্য হয় না! আমি আর মা খুবই নিরাশ হয়ে বাবার কর্মকাণ্ড দেখতে লাগলাম।

এদিকে তো গনি একভাবে অস্বীকার করে যাচ্ছে যে সে চুরি করেনি। তার একভাবে অস্বীকার করা দেখতে দেখতে বাবা হঠাৎ তাঁর হাত তুলে গনির মুখে লাগালেন এক থাপ্পড়। এক থাপ্পড়েই গনির ফর্সা মুখ লাল হয়ে উঠল। গালে পাঁচ আঙুলের ছাপ বসে গেল। আমার মনের ভেতরে হাহাকার বয়ে গেল। এতবড় অপমান? গনি চড় খেয়ে চুপ করে থাকল। আবার একটা চড় মারবেন বলে বাবা হাত তুললেন, কিন্তু তার আগেই গনি বলে উঠল, এনে দিচ্ছি! এনে দিচ্ছি? মানে, ঘড়ি এনে দিচ্ছি? আরে গনি ঘড়ি পাবে কোথায়? আমার মুখে তখন মাছি পড়ার জোগাড়। গনি যে চুরি করতে পারে, এ ধারণা আমায় মাথায় কিছুতে ঢোকেনি। এরপর যা হলো, তা ভাষায় বর্ণনা করতে গেলে কৌতুককর বলে মনে হবে। গনি ঘড়ি ফেরত আনার জন্যে আমাদের বাড়ির সদর দরজা দিয়ে বের হলো। আমরা সব ভাইবোন এবং পাড়া প্রতিবেশীরাও গনির পেছন পেছন চললাম। গনি বাড়ি থেকে রাস্তায় বেরিয়ে হাতের ডানদিকে ঘুরল, তারপর আবার হাতের ডানদিকে ঘুরে পেছনের রাস্তায় হেঁটে চলল। আমরাও চললাম। কোথা থেকে ঘড়িটা নিয়ে আসবে গনি? আমি হতবাক হয়ে ভাবতে ভাবতে গনির পেছন পেছন চললাম। গনি এবার আমাদের বিশাল বাড়ির পাঁচিলের সীমানার পুরোটা পার হয়ে বাড়ির পেছনে ঘুরল। আমরাও ঘুরলাম। গনি আমাদের পাঁচিলের দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। আমরা গনির কাণ্ড দেখতে লাগলাম। পাঁচিলের দরজার বাইরেই সামান্য একটু মাটি খুঁড়ে সেখান থেকে ঘড়ি বের করে দিল গনি মিয়া। এরপর গনিমিয়াকে নিয়ে মাথা কামিয়ে চৌরাস্তায় নিতে হবে বলে সকলে একমত হলো। এবং সেও সকলের সঙ্গে শহরের চৌরাস্তার দিকে নীরবে রওনা হলো। আমার মন এত খারাপ হলো যে আমি আর চৌরাস্তায় গেলাম না, বা ততদূর যাওয়া আমার নিষেধ ছিল।

আমি মন খারাপ করে আপনমনে বাড়ি ফিরে এলাম এবং জগতের একটি নিষ্ঠুর মিথ্যার সঙ্গে পরিচিত হলাম। গনির জন্যে তবু আমার মন খারাপ করতে লাগল। বাবাকে যদি বলতে পারতাম—বাবা, এবার গনিকে মাফ করে দাও, ও আর কোনোদিন চুরি করবে না। কিন্তু সেকথা বলতে আমার সাহস হলো না।

আমি যদি বিনা পয়সায় মাদুলিটা দিতাম তো ও সেটা বাড়ি নিয়ে গিয়ে ফেলে রাখতো।

একবার একজন মহিলা, তাঁর বয়স তখন অনেকই কম কিন্তু বিয়ে হয়েছে আরও অল্প বয়সে। বছর পাঁচেক বিয়ে হয়েছে তবু এখনো বাচ্চা হয় না। তাই তার শ্বাশুড়ি আবার ছেলেকে বিয়ে দেবার জন্যে তোড়জোড় করছে। মহিলা এসে বাবার কাছে নিজের শ্বাশুড়িমার নামে নালিশ দিল। বলল, আমার স্বামী ভালো, সে আর বিয়ে করতে চায় না। কিন্তু আমার শ্বাশুড়ি জোর করে আবার তাকে বিয়ে দেবে। আপনার কাছে আমি বিচার চাইতে এসেছি। বাবা সব শুনে নিয়ে বললেন, তোর বাচ্চা হয় না তা আমাকে এতদিন বলিসনি কেন? আমার কাছে ভালো মাদুলি আছে। পয়সা খরচ করে নিতে হবে। এই মাদুলি হাতে পরার পরপরই তোর বাচ্চা হবে, তা জানিস? না এ খবর সে মহিলা জানতো না। জানতে পেরে সে অস্থির হয়ে উঠল। বারবার করে বলতে লাগল—ও চাচাজান, আমারে তা’লি মাদুলিডা দেন দিনি? কত পয়সা লাগবে? বাবা মাথা নেড়ে বললেন, পাঁচশিকে (পাঁচটি সিকি) তো লাগবেই। মহিলা উত্তেজিত হয়ে বলল, তা’লি কবে দেবেন? কাল আসপো? আমার তো পয়সার অভাব নেই! বাবা তার কথা শুনে গম্ভীর মুখে বললেন—না, কাল আ’লি হবে না। ক’দিন সময় লাগবে। এরপর বাবা তাকে কবে আসতে হবে বলে দিলেন। কয়েকদিন বাদে সেই মহিলার আসার আগের দিনে বাবা আমাকে কাছে ডাকলেন। আমার হাতে একটা লম্বা পেতলের মাদুলি দিয়ে বললেন, মঞ্জু, এর খোলের ভেতরটা ভরে আন দিনি। আমি মাদুলি হাতে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী দিয়ে ভরবো বাবা? বাবা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, তোর যা ইচ্ছে তাই দিয়ে। অমি বললাম, মাটি? বাবা বললেন, মাটি, পিঁপড়ে, যা ইচ্ছে। তো আমি তখন মাদুলির ভেতরে মনের খুশিতে মাটি ভরতে লাগলাম। একটা ডেঁয়ো পিপড়ের কপাল খারাপ, সে তখন উঠোন দিয়ে তুরতুর করে হেঁটে যাচ্ছিল, তাকেও কুপোতাৎ করে মাদুলির ভেতরে ভরলাম। তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম, বাবা মাটিতে পাখির শুকনো গু পড়ে আছে, দেবো? বাবা আপনমনে বললেন, দে! বাবার কথা শুনে আমি খুশিমনে সেগুলো বাঁশের চটা দিয়ে তুলে মাদুলির ভেতরে ভরলাম। তারপর বাবার কাছে নিয়ে গেলাম। বাবা আমার হাত থেকে মাদুলি নিয়ে যত্ন করে মোম গলিয়ে তার মুখ বন্ধ করলেন। তারপর মাদুলির ভেতরে কালো সুতো যাকে বলে র্কা, সেই কালো র্কা ভরে মাদুলিটা দেয়ালের পেরেকের গায়ে ঝুলিয়ে রাখলেন।

সাধ্যের অতিরিক্ত ছিল তাঁদের স্বপ্নপ্রবণতা। আর যেজন্যে বাস্তব পৃথিবীতে তাঁরা পদে পদে হোঁচট খেয়েছেন। আর আশ্চর্যের বিষয়, দুজনেরই ছিল শিল্প ও সঙ্গীতের দিকে গোপন ঝোঁক।

পরদিন মহিলা ঠিক পাঁচশিকে পয়সা নিয়ে বাবার কাছে এলো। বাবা তার কাছ থেকে পয়সা নিয়ে গম্ভীর মুখে মাদুলিটা তুলে দিয়ে বললেন, হাতের বাজুতে পরে রাখ। রাতে বালিশের নিচে রেখে ঘুমোবি। ভুল হয় না যেন। সেদিন খুশিমনে সে মহিলা বিদায় হলো। বাবা তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, আমি যদি বিনা পয়সায় মাদুলিটা দিতাম তো ও সেটা বাড়ি নিয়ে গিয়ে ফেলে রাখতো। এখন এত পয়সা দিয়ে কিনে নিয়ে যাচ্ছে, দেখিস ভক্তি করে এটা কাছে রাখবে। তারপর কতদিন চলে গেল, আমিও এসব কথা একসময় ভুলে গেলাম। বছর তিন-চার পরে মনে হয় একদিন আমি গলির ভেতরে বসে আছি, তখন আমি স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ি। হঠাৎ দেখি—একজন মহিলা ছোট দুটি বাচ্চা এবং আরকেটি গর্ভে ধরে নিয়ে আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করছে। বড় বাড়ি ছিল আমাদের। দূর থেকে মহিলাকে দেখে আমি তো অবাক। আরে, এই সেই মহিলা নয়? যার বাচ্চা হয় না বলে শ্বাশুড়ির সঙ্গে মনোমালিন্য? মহিলা বাবাকে সালাম দিয়ে বলল, চাচাজান, সালাম। বাবা বললেন, সালাম। ভালো আছিস? মহিলা বিরক্ত হয়ে বলল, এই দুষ্টগুলোনের জ্বালায় ভালো থাকার উপায় আছে, চাচাজান? তো ভালোই আছি। বাবা বললেন, তাই তো দেখছি। তা তোর শ্বাশুড়িমা ভালো আছে? মহিলা বলল, হ্যাঁ, চাচা। সে তো এখুন বিছানায় পড়ো। তারে দ্যাখে কিডা? এই আমিই দেখি। এত কাজ ফেলে কি কুথাও যাওয়া যায়? বাবা এরপর আর কিছু বললেন না। কখনো মাদুলির প্রসঙ্গও তুললেন না। আমার মা শুধু বাবার দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলেন। মার হাসি দেখে বাবাও হেসে উঠলেন।

মাঝে মাঝেই রায়ট এবং জনগণের ভেতরে পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস। সেই সংকোটকালে এটাও দেখেছি কিছু দালাল এবং ফড়িয়ার হঠাৎ আবির্ভাব। এখন পেছনের দিকে তাকিয়ে মনে হয় পুরো সময়টা ছিল একটা টালমাটাল সময়।

আমার মাবাবার সম্পর্কটা ছিল অদ্ভুত। কোনো একটা সপ্তাহ যেতো না যেদিন তাদের ঝগড়া হতো না। আবার কিছুক্ষণ বাদেই দেখা যেত দুজনে ঘরের ভেতরে এক জায়গায় চুপ করে বসে আছেন। বাবা গোপনে বাইরে গিয়ে মায়ের জন্যে নিমকি, সিঙাড়া বা রসোগোল্লা কিনে আনছেন, সব গোপনে, তারপর চুপচাপ! আবার কখনো, যেটি ছিল বেশিরভাগ সময়, বাবা রাগ করে দরজার পাল্লা দড়াম করে বন্ধ করে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। আমার মনে হয় তাঁরা দুজনে কাছাকাছি বয়সের ছিলেন। শুনেছি ছেলেবেলায় একই গলির মধ্যে তাঁরা পাড়ার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খেলাধূলা করতেন। কীভাবে তারপর তাঁদের ভেতরে সখ্য গড়ে ওঠে সেসব কিছু আমরা জানি না। বরং আমার মা ও বাবা দুজনেই এ ব্যাপারে একেবারে নিশ্চুপ ছিলেন। কখনো আমি যদি কৌতূহলী হয়ে উঠতাম তো ধমক খেতাম মায়ের কাছে। অথচ এখন যেন আমার মনে হয় এ ব্যাপারে আমার আরও মনোযোগী হওয়া দরকার ছিল। কেন? সেটা হলো তাহলে তাঁদের আমি আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে পারতাম। আমার নিজেকে বোঝার জন্যে সেটার দরকার ছিল। কিন্তু সেটা হয়নি। এদিকে আমারও দিন শেষ। তবে এটুকু বলতে পারি—আমার মাবাবা ছিলেন দুজনেই স্বাপ্নিক। ইংরেজিতে যাকে বলে ড্রিমার। সাধ্যের অতিরিক্ত ছিল তাঁদের স্বপ্নপ্রবণতা। আর যেজন্যে বাস্তব পৃথিবীতে তাঁরা পদে পদে হোঁচট খেয়েছেন। আর আশ্চর্যের বিষয়, দুজনেরই ছিল শিল্প ও সঙ্গীতের দিকে গোপন ঝোঁক। যেজন্য আমি বাবাকে দেখেছি আমার মায়ের জন্যে গানের মাস্টার ঠিক করে দিতে। যে মাস্টার প্রতি সপ্তাহে তিনদিন করে এসে আমার মাকে গান শেখাতেন।

‘তুমি কি এখন দেখিছো স্বপন আমারে ,
আমারে, আমারে,’

অথবা

‘মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে,
মাকে মনে পড়ে আমার, মাকে মনে পড়ে’

অথবা

‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ’।

কেউ কেউ বলতো, ইয়ে পাগাল কী তারা কিয়া বাতচিত বোলতা! দেমাগ খারাপ হো গিয়া কিয়া!

মায়ের সেই গানের মাস্টার মশাই এর কাছে আমি আর বুলু বুও গান শিখেছিলাম কতদিন। কিন্তু এসব কোনো কিছুই স্থায়ী হতে পারেনি বেশিদিন। আর তার নানাবিধ সামাজিক এবং পারিপার্শ্বিক কারণও ছিল। প্রথম কারণ—দেশভাগ এবং তার সজোর ধাক্কা। দ্বিতীয় কারণ ছিল—সদ্য ভাগ হওয়া দেশে আর্থিক নিরাপত্তার অভাব। তৃতীয় কারণ ছিল—মাঝে মাঝেই রায়ট এবং জনগণের ভেতরে পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস। সেই সংকোটকালে এটাও দেখেছি কিছু দালাল এবং ফড়িয়ার হঠাৎ আবির্ভাব। এখন পেছনের দিকে তাকিয়ে মনে হয় পুরো সময়টা ছিল একটা টালমাটাল সময়।

আমার বাবা কোলকাতায় গিয়ে মাকে বিয়ে করে এনেছিলেন। কোলকাতার বিখ্যাত নাখোদা মসজিদের ইমাম সেই বিয়ে পড়িয়েছিলেন। বিয়ের পরপরই বাবা মাকে নিয়ে যশোরে ফিরে এসেছিলেন। মায়ের নিজের দেশও যশোর ছিল কিন্তু মামার বাড়ি ছিল কোলকাতা এবং বাবা যেন আমার মাকে বিয়ে করতে না পারেন সেজন্যে আমার নানাভাই মেয়েকে মায়ের মামাবাড়ি বাগবাজারে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হয়নি!

আমার মায়ের একটি আশ্চর্য কঠিন ব্যক্তিত্ব ছিল। কাঁদুন, বা হাতপা ছুঁড়ুন বা যাই করুন না কেন, নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকতেন। সবচেয়ে আতঙ্কের ব্যাপার ছিল যে, বাবা যে মুহূর্তে কোনো অন্যায় কথা বলবেন বা অন্যায় অভিযোগ করবেন, আমার মায়ের সেটা প্রতিবাদ করতে হবে! আর বাবা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতেন। এরকম ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতে উঠতে শুরু হয়ে যেত মারপিট। আমাদের পট্টিতে অন্যান্য যারা আত্মীয়স্বজন ছিলেন, তারা অনেকেই ছিলেন চুপচাপ। বাবার নিজের ফুপাতো ভাই মোস্তফা বড়বাবা ছিলেন মাটির মানুষ। তবে পট্টির এসব ঘরে ঝগড়াঝাঁটি কেউ কখনো খারাপ চোখে দেখতো না, যেন বৃহৎ পরিবারের অশান্তি এবং হৈচৈ হিসাবেই দেখতো। যেমন আনন্দও হতো সকলে মিলে। বাৎসরিক খানা হতো পট্টির সকলকে নিয়ে। প্রতিমাসে পঞ্চায়েত হতো পট্টির সকলকে সঙ্গে নিয়ে। পট্টির ঝগড়াঝাঁটিও ছিল যেন সেরকমই একটি বিষয়। কিন্তু আমি এসব মনে মনে ভীষণ অপছন্দ করতাম। আমাদের পাড়ার কাশেম ভাইয়ের তাঁর স্ত্রীর প্রতি নানাপ্রকারের অযৌক্তিক অভিযোগ ছিল কিন্তু তিনি কাউকে মারধর করতেন না। তিনি শুধু দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে পাড়ার মানুষের কাছে আভিযোগ করতেন! তিনি যুবক বয়সে বাঁশি বাজাতেন। তাঁর চেহারা ছিল ঘোর কালো কিন্তু যেন ইস্পাতে গড়া সুঠাম সুন্দর একটি শরীরের দয়ালু মুখচ্ছবির চেহারা। তিনি বরং নিজের জীবনের বঞ্চণা এবং আভিযোগ নিজের ঘরের দরোজায় দাঁড়িয়ে আপনমনে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে সমস্ত পাড়ার মানুষকে শুনিয়ে বলতেন। পাড়ার সকলে চুপ করে তার অভিযোগ শুনতো, কেউ কিছু বলতো না। সমস্ত পাড়া ভরেই ছিল তো আমাদের আত্মীয়স্বজন। লতায়পাতায় জড়ানো সে সম্পর্ক। এ ওর আজ সম্পর্কে খালা তো নতুন একটি বিবাহ কম্যুউনিটিতে হয়ে গেলে সেই খালা হয়ে যেতেন ফুপু-শ্বাশুড়ি। নিজের জাতের বাইরে কাউকে বিয়ে দেওয়া হতো না। তাহলে সে জাতিচ্যুত হতো। ফলে যে কয়ঘর আত্মীয় আছে যশোর, ফুলবাড়িয়া, কেশবপুর বা বসুন্দিয়া এর ভেতরেই সম্পর্ক যেন অনাদিকাল ধরে ঘোরাফেরা করতো। পাড়ার কাশেম ভাই যেদিন ক্ষেপে উঠে দরজায় দাঁড়িয়ে অভিযোগ করতেন, আমি মন দিয়ে হাঁ করে সেসব শুনতাম। ভয়ে আমার বুক দুরুদুরু করতো। তবু সেইসব অভিযোগের ভেতরে একটি বেদনাতুর কাব্যিক বিষয়বস্তু ঘুরপাক খেতো। লোকজন সেইসব অভিযোগ শুনে আপনমনে হাসতো বটে, কিন্তু আমি হাসতাম না। কেউ কেউ বলতো, ইয়ে পাগাল কী তারা কিয়া বাতচিত বোলতা! দেমাগ খারাপ হো গিয়া কিয়া!

 

নয়

আমি সেই কম্যুনিউটির মেয়ে হয়ে ছিটকে বাইরে চলে যাই এবং সেটি কেবলমাত্র সম্ভব ছিল আমার মায়ের জন্যে। বস্তুত চুড়িপট্টির মতো বদ্ধ একটি জায়গায় বাইরের প্রগতিশীল সমাজ থেকে আগত আমার মা সেই বদ্ধ জলাশয়ের মতো একটি সমাজে নারী শিক্ষার প্রদীপটি জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন নিজের রক্ত এবং ঘামের বিনিময়ে, যে মায়ের আদি নাম ছিল শ্রী প্রতিমা মুখোপাধ্যায়। যিনি ছিলে কুলিন বংশের মেয়ে। তিনি আমার বাবার সংসারে না এলে আমার বাবা তাঁর অন্যান্য ভাইবোনদের মতোই হয়তো আজীবন থেকে যেতেন।

মনে রাখতে হবে, ১৮৫৭-র সিপাহী বিদ্রোহের পর থেকেই বিহার থেকে বিচ্যুত এই কম্যুউনিটির মানুষেরা বাংলায় পা রেখে যুগের পর যুগ ধরে নিজেদের জাতপাত আঁকড়ে ধরে বেঁচে ছিল। ১৮৫৮ ’ র সিপাহী বিদ্রোহে ব্রিটিশরাজের সঙ্গে হেরে গিয়ে এই পলায়ন। অথচ বাংলায় এসে তারা বেঁচে থাকতো বাঙালি পরিবেশের ভেতরেই। তাদের আশেপাশে ছিল বাঙালি-হিন্দু কম্যুউনিটি। উকিল, মোক্তার, সেরেস্তাদার, শিক্ষক, ডাক্তার প্রায় সকলেই শিক্ষিত। কিন্তু এঁদের আবহাওয়া থেকে এই গোত্রের মানুষেরা নিজেদের সযত্নে বাঁচিয়ে চলতো! স্কুল-কলেজের বেশি ধার ধারতো না। প্রায় সকলেই ছিল ব্যবসায়ী। বড় বা ছোট ব্যবসায়ী। গৌরবের অতীত নিয়ে তারা নাড়াচাড়া করতে ভালোবাসতো।

একমাস বা দুমাস পরপরই আমাদের পট্টিতে খানা চড়তো। কোনো একটা উপলক্ষ হলেই গোডাউন থেকে বেরিয়ে আসতো ইয়া মোটা মোটা তামার হাড়ি। যাকে বলা হতো ডেক। চাল আনা হতো বাজার থেকে এক মণ বা সওয়া মণ। খাসি জবাই করা হতো একটা, দুটো বা তিনটে। গরু কদাপি নয়। খোলা মাঠের মতো জায়গায় বা কারও বাড়ির উঠোনে রান্না হতো। যা হতো প্রায়শ আমার দাদাবাড়ির চৌহদ্দির ভেতরে, সেখানে ডেক চড়ানো হতো। তারপর কম্যুউনিটির সকলে মিলে কলাপাতা পেতে সেই খানা খেতে হতো। সে এক এলাহি কাণ্ড! এর ভেতরেই আমাদের ছোটফুপু দিল আঙ্গেজ আমাদের সর্বক্ষণই ভয় দেখাতেন এই বলে যেন কখনো কোনো খানাপিনায় আমরা ভুলেও গোরুর মাংস মুখে না তুলি! তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। কিন্তু কী যে সেই সর্বনাশ আমরা সেটা জীবনেও বুঝতে পারতাম না।

আমার বড় ফুপু নুরজাহান এতসব ঝামেলার ভেতরে নেই। তিনি তাঁর মতো করে জীবন যাপন করতেন। তাঁর নিজস্ব একটি পৃথিবী ছিল। যে পৃথিবীর তিনিই ছিলেন একমাত্র অধিবাসী। আমার দাদির কাছ থেকে বিরাট সম্পত্তির অধিকারী হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেদিকে তাঁর কোনো মন ছিল না। আমাদের ফুপা সেইসব সম্পত্তির দেখভাল করতেন। একটু বেশি বয়স হলে আমার বড়ফুপু তার দালান বাড়ির বিশাল বাগানে একটি ছোট্ট কুঁড়েঘর তৈরী করে সেখানে কিছু হাড়িকলসি নিয়ে বসবাস করতেন। কাজের মেয়ে সেখানেই তাঁকে রান্নাবান্না করে দিতো। তিনি নিজের বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতেন না। সববিষয়েই তাঁর সন্দেহ ছিল। কোনো অদৃশ্য শত্রু তাঁকে নাজেহাল করার জন্যে ষড়যন্ত্র করছে—একথা তিনি বিশ্বাস করতেন এবং আমি ঢাকা থেকে যখন বাড়িতে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যেতাম, তখন তিনি বিস্তারিত আমাকে সেসব শোনাতেন। বড়ফুপুর মেজাজ ছিল সাংঘাতিক। তিনি রাগ করলে সকলে চুপ করে থাকতো। এমনকি আমার বড়ফুপাও আমার ফুপুকে কোনোদিন কিছু বলতেন না।

সেই যে কোন সুদূরকালে তারা রাজা পৃত্থীরাজের বংশধর বলে নিজেদের দাবী করতেন, সেই দাবীর অভিমান তাদের তখন পর্যন্ত যায়নি। গরু সেই বংশে ছিল নিষিদ্ধ, সেই নিষেধ তারা বংশের পর বংশ মেনে চলার চেষ্টা করেছেন, যদিও নিজেরা ছিলেন মুসলমান।

বড়ফুপার একটা বিস্কুট ও রুটির দোকান ছিল। খুব বড় দোকান। অনেক বিক্রিবাটা হতো। আমি কতদিন দোকানের এক কোণে দাঁড়িয়ে রুটি বিস্কুটের বিক্রিবাটা দেখেছি। আমি অবশ্য দাঁড়িয়ে থাকতাম রুটির গন্ধ শুঁকবো বলে! কারণ ছেলেবেলায় আমার অনেক স্বাধীনতা ছিল। সমস্ত শহর আমি টইটই করে ঘুরতাম। কখন যে কোথায় যেতাম তার ঠিক নেই। আমারও মনের ভেতরে একটা রহস্য খুঁজে বেড়াবার যেন তাগিদ ছিল। ফলে চলার পথে যা চোখে দেখতাম, তাকে যদি রহস্যময় বলে মনে হতো তো সেটা আমার নিজস্ব সংগ্রহে স্থান পেতো। এমনি করতে করতে আমার ছোট্ট টিনের বাকসে পথ থেকে কুড়োনো ছেঁড়া পাতা, গাছের কোনো শুকনো ফল বা অদ্ভুত দেখতে কোনো ইট বা পাথর, সব আমার টিনের বাকসে আমি সযত্নে রেখে দিতাম। একদিন রাস্তায় কুড়িয়ে পেলাম একটা ছেঁড়া বইয়ের পাতা। শুধু পাতার মাঝখানে কয়েকটা লাইন। যেমন, এমন সময়—গাছের পাতাখুব বড় দেখে—সোনার পাখি—খুঁজতে হবে—এমন রহস্যময় শব্দের সম্ভার কি আমি ছাড়তে পারি? এখন মনে হয় সেটি ছিল রূপকথার কোনো গল্প, কারণ বড় বড় অক্ষরে ছাপা ছিল। তো পাতাটি আমি যেন আজীবনের জন্যে আমার বাকসে রেখে দিলাম। মনে আছে ক্লাস টেনে যখন পড়ি তখনও সেই ছেঁড়া পাতাটি আমার সঙ্গে ছিল। তারপর হারিয়ে গেল।

ছোটফুপু একদিন আমাদের একটা গল্প বললেন। যদিও সেটা গল্প ছিল, কিন্তু আমার ফুপুর কাছে ছিল সত্যি গল্প। সেটি হলো ফুপু একবার তাঁর জাতের বাইরে এক মুসলিম কম্যুউনিটিতে আমার ছোট ফুপার সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে অনেক নরনারী এসেছিলেন। উৎসব করতে করতে রাত হয়ে গেল। তখন ডিনারের সময় হলো। বাইরে পুরুষেরা ডিনার করছেন আর ভেতরে নারীরা। আমার ফুপুও নারীদের সঙ্গে একই সারিতে বসে খানা খাচ্ছেন। সকল খাবারই তখনকার নিয়ম অনুযায়ী একজন করে করে এসে পরিবেশন করে যাচ্ছেন। আমার ফুপু প্রথমে বেগুন ভাজা, আলু ভাজা, মাছ ভাজা খেয়েছেন। এরপর একজন বালতির ভেতরে করে মাংস নিয়ে এসে মাংস পরিবেশন করে চলে গেলেন। আমার ফুপু অন্যমনস্ক হয়ে মাংসে হাত দিয়েছেন, ওমনি তাঁর মনে হলো যেন কে ধমক দিয়ে ফুপুকে বলে উঠল, খামুশ, রুখ যাও! একথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমার ফুপু খাবার থেকে তাঁর হাত টেনে নিলেন। ওমনি তাঁর চোখের সামনে ইয়া বিশাল এক মূর্তি ভেসে উঠল। যিনি ফুপুকে হাত নেড়ে মানা করছেন মাংস না খেতে। কারণ? কারণ সেই মাংসটি ছিল গরুর! ফুপু এই গল্পটি যখন আমাদের শোনাতেন ভয়ে আমাদের শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠতো। ফুপুও বড় আবেগপ্রবণ হয়ে উঠতেন। সঙ্গে সঙ্গে কল্পনায় নিজেদের বড় মহান এক পরিবারের সদস্য বলে অনুভূত হতো। কারণ আমাদের পরিবারের বাইরে এমন কোনো পরিবার আছে কি যাদেরকে এভাবে চোখে চোখে রাখা হয়েছে যেন তারা জীবনেও গরুর মাংস স্পর্শ না করে? কিন্তু কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে পাইনি। অবশেষে নিজে বড় হয়ে এর উত্তর খুঁজে বের করেছি। সেই যে কোন সুদূরকালে তারা রাজা পৃত্থীরাজের বংশধর বলে নিজেদের দাবী করতেন, সেই দাবীর অভিমান তাদের তখন পর্যন্ত যায়নি। গরু সেই বংশে ছিল নিষিদ্ধ, সেই নিষেধ তারা বংশের পর বংশ মেনে চলার চেষ্টা করেছেন, যদিও নিজেরা ছিলেন মুসলমান। সেই যে দিল্লির দরবেশ সেলিম চিশতির কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে তারা ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন এবং রাজা পৃত্থিরাজের রোষে পড়ার ভয়ে দলবল বেধে দেশ ত্যাগ করেছিলেন কিন্তু নিজের রুটস্ কোনোদিন তারা ভুলতে পারেননি। তারা নামাজ পড়তেন, মসজিদে যেতেন, ধর্মের সব নিয়মকানুন মেনে চলার চেষ্টা করতেন। হজ্জ করে আসতেন কিন্তু গরুর মাংস খেতেন না! কখনো বা কথায় কথায় বলতেন, হামলোগ পৃত্থিরাজকে ওয়ালিদ, ইয়ে বাত মাত্ ভুল্ না!

নিজেদের একপ্রকারের অনিচ্ছা সত্বেও যেন তারা ক্রমে মিশে যাচ্ছিল বৃহত্তর বাঙালি সমাজের সঙ্গে। এবং নিজেদের অজান্তেই তাঁদের মুখের বুলি হয়ে উঠেছিল বাংলা। ১৯৪৮ সালে যখন ভাষা আন্দোলন হয়

দশ

ফলে জাতপাতের অভিমান আমাদের কম্যুউনিটির ভেতরে এতখানি প্রভাব বিস্তার করেছিল যে যুগের পর যুগ পার হয়ে গেলেও আমাদের পূর্বপুরুষেরা নিজেদের পরিবর্তন করার কথা জীবনেও চিন্তা করেননি। অথচ তাদের চারপাশ ঘিরেই ছিল বাঙালি পরিবার। শিক্ষিত, পরিশীলিত , সজ্জন বাঙালি কম্যুউনিটি। যাদের অনেকেই ছিলেন আমার বাবা চাচাদের বিশেষ বন্ধু। কাপুড়িয়া পট্টিতে আমার বাবার এক ডাক্তার বন্ধু ছিলেন। নাম ডাক্তার রমনিশা। তখন সদ্য দেশভাগ। তখনও দু’দেশের মধ্যে পাসপোর্ট চালু হয়নি। ডাক্তার রমনিশা তখনও যশোরে প্র্যাকটিস করছেন। খুব সম্ভব কাপুড়িয়া পট্টিতে তাঁর চেম্বার। তিনি একদিন বাবার কাছে বায়না ধরলেন যে ডিমসেদ্ধ খাবেন! ডিমসেদ্ধ? কথাটা শুনে সকলেই অবাক হবেন। কিন্তু তখনকার দিনে অনেক হিন্দু বাড়িতে কোনো মুরগি বা হাসের মাংস, বা তাদের ডিম খাওয়া একেবারে নিষিদ্ধ ছিল। তাই বন্ধুকে অনুরোধ করলেন, তাঁকে ডিম সেদ্ধ খাওয়াতে। অবশ্যই ডিম মুরগির হবে না, কিন্তু হাঁসের হতে পারে। সুতরাং আমার বাবা মাকে বললেন, রমনিশা ডিম সেদ্ধ খেতে চায়, কবে আসতে বলবো? তবে কেউ যেন টের না পায়। বিশেষ করে ওঁর বাড়ির লোকজন। একথা শুনে আমার মা বললেন, তা তাঁকে ডাকো একদিন। যে—কোনোদিন হতে পারে। বাবা এরপর বাজার থেকে একগাদা হাাঁসের ডিম কিনে আনলেন। ইয়া বড় বড় হালকা লালচে ও হালকা নীল রঙের ডিম। খুব ফ্রেশ। দেখলে যেন চোখ জুড়িয়ে যায়। এদিকে ডিম আমার নিজেরও খুব প্রিয় খাদ্য। আমি মনে মনে খুব খুশি। ডাক্তার রমনিশা কত আর ডিম খাবেন? এক ডজনের বেশি তো আর খেতে পারবেন না! বাড়িতে ডিম এসেছে প্রায় দুই ডজন। আর চোখের সামনে দেখলাম সেই দুই ডজন ডিমের প্রতিটাই মা পানি দিয়ে চুলোয় সেদ্ধ চড়িয়ে দিলেন। মানে চব্বিশটা হাঁসের ডিম। সব ঐ ডাক্তার সাহেবের জন্য! পাগল। রাত হলে চেম্বার বন্ধ করে রমনিশা ডাক্তার আমাদের সেই পুরনো ছোট বাড়িতে ডিম খেতে এলেন। শুধুই ডিম, আর কিছু নয়! আমাদের রাস্তার বাইরের দরজায় কোনো পর্দা ছিল না, যেহেতু ভেতরের দিকে আমরা থাকতাম। সেদিন সেই দরজার গায়ে পর্দা টাঙানো হলো। কারণ কেউ যদি বাহির ঘরের দরজা হঠাৎ টান দিয়ে খুলে ফেলে তো রমনিশা ডাক্তারের ডিম খাওয়া চোখে দেখে ফেলবে! তারপর কী হবে সেটা আল্লা মালুম! হয়তো তাঁর জাত নিয়ে টানাটানি হবে! ডাক্তার এসে বাইরের ঘরের মেঝেয় শতরঞ্চির ওপরে দুপা ক্রস করে বসলেন। বড় একটা গামলার ভেতরে সেদ্ধ ডিম খোসা ছিলে রেখেছিলেন মা। পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে প্যাগোডার সৌন্দর্য ধরে থাকল যেন ডিমগুলো। ছোট একটা বাটিতে দিলেন নুন বা লবন। আরেকটি বাটিতে গোল মরিচের গুঁড়ো। মা পর্দার আড়ালে থাকলেন কিন্তু ডাক্তার রমনিশা মাকে প্রতিমা দি বলে সম্মোধন করতে লাগলেন।
এরপর দু-চারটে কথা হলো। বাবা তাঁকে খেতে অনুরোধ করলেন কিন্তু নিজে খেতে বসলেন না। তার কারণ আমার বাবা হাঁসের ডিম খেতে কোনোদিন পছন্দ করতেন না। তিনি খেতেন মুরগির ডিম। দুটো মুরগির ডিম জোড়া দিলে একটা হাঁসের ডিম হয়, সুতরাং আমি, বুলু বু আর নয়ন জীবনে মুরগির ডিম খেতাম না, তাতে আমাদের লস! আমরা খেতাম হাঁসের ডিম। তাও অর্ধেক করে। কারণ যখন বাবার রোজগার কম থাকতো তখন আমাদের মা একটি হাঁসের ডিমকে দুইভাগ করে খেতে দিতেন। তাতেও আমার অনেক অশান্তি হতো মনে মনে। আর সেটা হলো আমি বারবার করে গোপনে মেপে দেখতাম কোন ভাগটি কাটার সময় একটু বড় আর কোন ভাগটি ছোট হয়েছে! কারণ ছোট ভাগ দিয়ে ভাত খেতে আমার বড়ই আপত্তি ছিল! আমাদের বড়মা তখন অন্য বাড়িতে থাকতেন। বড়মা প্রায় প্রায় বাপের বাড়িতে গিয়ে অনেকদিন ধরে থাকতেন। আমিও মাঝে মাঝে বড়মার কাছে গিয়ে থাকতাম। সেটি ছিল নগর চাপরাইল গ্রাম। বড় গহীন গ্রাম ছিল তখন নগর চাপরাইল। রমনিশা ডাক্তার লবণ আর গোলমরিচের গুঁড়ো মাখিয়ে একটা একটা করে ডিম খেতে লাগলেন। আর বাবার সঙ্গে গল্প করতে লাগলেন। আমিও পর্দার আড়ালে মায়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ডাক্তার বাবুকে লক্ষ্য করতে লাগলাম। ডাক্তার বাবু একটা ডিম খেলেন। তারপর দুটো ডিম খেলেন। তারপর তিনটে ডিম খেলেন। চার নম্বর ডিম যখন খাচ্ছেন আমার ভয় হলো ডাক্তার বাবু কি সবগুলো ডিম খেয়ে শেষ করবেন? হায় ,হায়! তাহলে আমরা কি খাবো? পাঁচ নম্বর ডিমে হাত দিয়ে হাত উঠিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে ডাক্তার রমনিসা বলে উঠলেন, ঘ্যানা দা, আর খেতে পারছি নে। পেট একেবারে ভরে গিয়েছে! এরপর খেলে বদহজম হয়ে যাবে। আর সেকথা শুনে বাবা বললেন, তাহলে থাক। আর মা পর্দার আড়াল থেকে বলে উঠলেন, মাত্র চারটে ডিম? ব্যস, এত সখ করে খেতে চাইলেন!

কিছু হিন্দুস্তানী দোকানদার বহু আগে থেকেই যশোরে ছিল। তারা ছিল মূলত ব্যবসায়ী। চালডালের ব্যবসা করতো। যশোরের মানুষেরা তাদের ডাকতো ভুজোওয়ালা বলে। যশোরে মাড়োয়ারি পট্টি খুব বিখ্যাত ছিল। তারা ছিল সব ব্যবসায়ী। কাপুড়িয়া পট্টির পেছনে ছিল মাড়োয়ারি মন্দির। খুব নামকরা মন্দির। সেখানে প্রতি বছর খুব ধুমধাম করে দূর্গাপূজো হতো। কিন্তু আমার কম্যুউনিটির মানুষদের ভেতরে যেন কোনো জগরণ ছিল না। বা থাকলেও বাইরে থেকে বোঝা যেতো না। আমরা তখনও জাতপাত নিয়ে বড়ই শশব্যস্ত অবস্থায় থাকতাম। আমার ছেলেবেলায় আমার বড়দাদা যখন কম্যুউনিটির প্রধান ছিলেন, যাঁকে আমি ছেলেবেলায় অল্প কিছুদিনের জন্যে দেখেছি, তিনি খুব কড়া ব্যক্তিত্বের মানুষ ছিলেন। তাঁর সময়ে সমাজের কোনো মানুষ কোনো প্রকারের বিধি-নিষেধ যেন লঙ্ঘন করতে সাহস পেতেন না। তিনি মারা যাওয়ার পর এবং পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর একটু একটু করে যেন সবকিছু শিথিল হতে শুরু করে। আমি বড় হতে হতে আরও কিছু পরিবর্তন শুরু হয়।

অবশ্য তার কিছু আগে থেকেই এই মোহাজের বৃহৎ পরিবারের ভেতরে ভাঙনের সুর শোনা যাচ্ছিল। নিজেদের একপ্রকারের অনিচ্ছা সত্বেও যেন তারা ক্রমে মিশে যাচ্ছিল বৃহত্তর বাঙালি সমাজের সঙ্গে। এবং নিজেদের অজান্তেই তাঁদের মুখের বুলি হয়ে উঠেছিল বাংলা। ১৯৪৮ সালে যখন ভাষা আন্দোলন হয়, তখন আমার বাবার ফুপাতো ভাই ইয়াজদাহান চৌধুরী সেই আন্দোলনে যশোরে অংশগ্রহণ করেন। তখন তিনি যশোরের মাইকেল মধুসূদন কলেজের ছাত্র।

(চলবে…)


১৯৪০ সালের ৫ নভেম্বর যশোর জেলার চুড়িপট্টি গ্রামে এক মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা গোলাম রফিকউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন একজন ব্যবসায়ী ও মা আছিয়া খাতুন একজন গৃহিণী। তার বাবা খুবই ধার্মিক মানুষ ছিলেন। তাকে ছোটবেলায় কঠিন পর্দা ও অন্যান্য ইসলামী শরিয়ত মেনে চলতে হতো। তার শৈশব ও কৈশোর কাটে যশোরে।

তার পাঠদানের হাতেখড়ি হয় মায়ের কাছে। চুড়িপট্টির মোহনগঞ্জ প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। মধুসূদন তারাপ্রসন্ন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক ও ১৯৫৮ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত স্কুল ও কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। কলেজ গ্রন্থাগারে প্রচুর বই থাকলেও তিনি তা অধ্যয়নের সুযোগ পান নি। সে সময়ে শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবই পড়ারই সুযোগ পেত। তাই মাঝে মাঝে উপন্যাস, ম্যাগাজিন ও অন্যান্য সাহিত্য পেলে তারা নিজেদের ধন্য মনে করত। ১৯৫৯ সালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। তিনি ইংরেজি সাহিত্যে পড়তে চাইলেও তার বাবার আগ্রহে তাকে মেডিকেলে ভর্তি হতে হয়। ১৯৬৫ সালে তিনি এমবিবিএস পাস করেন। পরে ১৯৭৩ সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য লন্ডনে যান। তিনি সেখান থেকে ১৯৮২ সালে মনোবিজ্ঞানে এমআরসি ডিগ্রী লাভ করে দেশে ফিরে আসেন।

এমবিবিএস পাস করার পর তিনি তৎকালীন পাকিস্তান বিমান বাহিনী মেডিকেল কোরে লেফটেন্যান্ট পদে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালে মক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সম্পূর্ন নয় মাস তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। ঢাকা এয়ারবেসের মেডিক্যাল সেন্টারে তিনি চিকিৎসা করেছেন সৈনিকদের এবং তাদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের। ১৯৭৩ সালে তিনি বিমানবাহিনীর চাকরি থেকে ইস্তেফা দিয়ে লন্ডন চলে যান এবং সেখানে কয়েকটি হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। লন্ডন থেকে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে দেশে এসে ১৯৮৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে মনোরোগ বিভাগে সহকারী প্রভাষক হিসাবে যোগ দেন। ১৯৮৯ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৯৩ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন ঢাকার মানসিক স্বাস্থ ইন্সটিটিউটের পরিচালক ও প্রভাষক। ১৯৯৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে অবসর নেন। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্য ও স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন হাসপাতালে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সাল থেকে তিনি ঢাকার বারডেম হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের প্রভাষক ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত আছেন।

তার প্রথম ছোটগল্প পরিবর্তন ১৯৫৪ সালে দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত হয়। ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তিনি নিয়মিত দৈনিক ইত্তেফাকের কচি কাঁচার আসরে লিখতেন। মাইকেল মধুসূদন কলেজে পড়াকালীন দৈনিক আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী ও গুলিস্তা পত্রিকায় তার লেখা গল্প, কবিতা প্রকাশিত হতো। গুলিস্তা পত্রিকায় লিখে তিনি পুরষ্কৃতও হয়েছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াকালীন লেখালেখির পাশাপাশি তিনি কলেজের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িয়ে পড়েন। এই সময়ে ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম শ্রেণীর পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন মেডিকেল জার্নালে তার লেখা ছাপা হতো। তার প্রথম উপন্যাস ১৯৬৮ সালে সচিত্র সন্ধানীতে প্রকাশিত হয়। তার সেই প্রেম সেই সময় ও বাজিকর উপন্যাসে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা বর্ণিত হয়েছে। নরক ও ফুলের কাহিনী উপন্যাসে লিখেছেন তার ছেলেবেলার কথা। বাড়ি ও বণিতা উপন্যাসে চিত্রায়িত হয়েছে মধ্যবিত্ত পরিবারের সামাজিক সমস্যা। উপন্যাস ছাড়া তিনি শিশুদের জন্য সাহিত্য রচনা করেছেন। ১৯৭৭ সালে ছানার নানার বাড়ি, বাবার সাথে ছানা (১৯৮৬), ছানা এবং মুক্তিযুদ্ধ (১৯৮৭), ১৯৯০ সালে তৃপ্তি, আবেদ হোসেনের জোৎস্না দেখা, ১৯৯২ সালে হাতছানি, আগুনের চমক এবং মুক্তিযোদ্ধার মা নামক শিশুতোষ গল্প ও উপন্যাসগুলি প্রকাশিত হয়।

তিনি ১৯৬২-৬৩ সালের দিকে সৈয়দ শামসুল হকের অনুপম দিন, শীত বিকেল, সম্রাটের ছবি, এক মহিলার ছবি, দেয়ালের দেশ পড়ে তার সাথে দেখা করার চেষ্টা করেন। তিন পয়সার জোসনা গল্পটি পড়ার পর তিনি সৈয়দ হককে চিঠি লিখেন। সৈয়দ হক এক মাস পর সেই চিঠির জবাব দেন। এরপর প্রতিনিয়তই তারা চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ করতে থাকেন। একদিন সৈয়দ হক তাকে ঢাকার গুলিস্তান সিনেমা হলের চিন-চাও রেস্তোরায় দেখা করতে বলেন। প্রথম সাক্ষাতে সৈয়দ হক তাকে উদ্দেশ্য করে একটি কবিতা লিখেন। তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তখন তারা ব্রিটিশ কাউন্সিলসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন। ১৯৬৫ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি সৈয়দ হকের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সৈয়দ হক ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ফুসফুসের কর্কটরোগ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এই দম্পতির দুই সন্তান। মেয়ে বিদিতা সৈয়দ হক একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষক। ছেলে দ্বিতীয় সৈয়দ হক একজন আইটি বিশেষজ্ঞ, গল্পকার ও গীতিকার। তিনি যুক্তরাজ্যের রিচমন্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টারন্যাশনাল ফিনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে এমবিএ পাস করেন।

ছোটগল্প
• পরিবর্তন (১৯৫৪)
• পারুলীর উড্ডয়ন
• হেলাল যাচ্চিল রেশমার সাথে দেখা করতে
• গলে যাচ্ছে ঝুলন্ত পদক
• অন্ধকারে যে দরোজা
• মানসিক সমস্যার গল্প
• শূন্যতার সাথে নৃত্য
• গুজরিপঞ্জম
• গ্রাম গঞ্জের গভীরে
• পূর্ণিমায় নখের আঁচড়
• সূর্য ওঠার গল্প
উপন্যাস

• তৃষিতা (১৯৭৬)
• সোনার হরিণ (১৯৮৩)
• সেই প্রেম সেই সময়
• বাজিকর
• জলনুড়ি
• তারাবাজি
• হাতছানি
• উদয় মিনাকে চায়
• অস্থিরতার কাল, ভালোবাসার সময়
• ভালোবাসার লাল পিঁপড়ে
• নরক ও ফুলের কাহিনী
• বাড়ি ও বনিতা
• গা শিরশির (২০১১)
• কার্নিশে ঝুলন্ত গোলাপ
• সেই ভাষণটি শোনার পর
• নিঃশব্দতার ভাঙচুর
• তাম্রচূড়ের লড়াই
• সেইসব দিন
• যোজন দূরের স্বজনেরা
• ঘুম
• খাদ
• আহত জীবন
• আকাশ ভরা
• দুই রমণী
• নারী : বিদ্রোহী
• সবুজ পশমি চাদর
• ব্যবহ্নতা
• আয়নার বন্দী
• নখ
• সন্দেহ
• ঘুমন্ত খেলোয়াড়
• রূপালী স্রোত
• চেমনআরার বাড়ি

কাব্যগ্রন্থ

• কিছু কি পুড়ে যাচ্ছে কোথাও
• তুমি আগে যাবে, না আমি
• স্বপ্নের ভেতর
• তুমি এক অলৌকিক বাড়িঅলা
• কাল খুব কষ্টে ছিলাম
• আমার শয্যায় এক বালিশ-সতীন

প্রবন্ধ
• নারীর কিছু কথা আছে
• কিশোর-কিশোরীর মন ও তার সমস্যা
• যেমন আমাদের জীবন
• ক্ষুব্ধ সংলাপ (২০১১)
• মেয়ে হয়েছি বেশ করেছি (২০১২)
• তোমার কথা
• পিকাসোর নারীরা
শিশুসাহিত্য
• ছানার নানার বাড়ি (১৯৭৭)
• বাবার সাথে ছানা (১৯৮৬)
• ছানা এবং মুক্তিযুদ্ধ (১৯৮৭)
• পথের মানুষ ছানা
• একজন মুক্তিযোদ্ধার ছেলে
• আমাদের মুক্তিযোদ্ধা দাদাভাই
• মন্টির বাবা
• তোমাদের জন্য এগারোটি
• উল্টো পায়ের ভূত
• আমি ম্যাও ভয় পাই
• আমি বাবাকে ভালোবাসি
• হানাদার বাহিনী জব্দ
• মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ছড়া
• ছোটখেলের বীর
• যেমন আমাদের জীবন
• সর্পরাজের যাদু
• আমার মা সবচেয়ে ভালো (২০০৮)
• তুমি এখন বড় হচ্ছো
• টুটুলের মা-গাছ
• উদাসী বালক
• তপনের মুক্তিযুদ্ধ
• কাঠের পা
• আগুনের চমক
• দশ রঙের ছড়া
• মুক্তিযুদ্ধের পাঁচটি উপন্যাস
অনুবাদ

• ল্যু সালোমে : সাহিত্যভুবনের অগ্নিশিখা (২০১২)

স্মৃতিকথা

• অবরুদ্ধ

ভ্রমণকাহিনী
• উড়ে যাই দূরে যাই
পুরস্কার ও সম্মাননা

• ভাষা ও সাহিত্যে একুশে পদক-২০১৯
• উপন্যাস শাখায় নৃ প্রকাশনী থেকে ছানা ও নানুজান-এর জন্য পাঞ্জেরী ছোটকাকু আনন্দ আলো শিশুসাহিত্য পুরস্কার-২০১৯
• উপন্যাসে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০১০
• কবীর চৌধুরী শিশুসাহিত্য পুরস্কার-২০০৭
• ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০০৬
• অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার
• মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার
• শিশু একাডেমি পুরস্কার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *