দশঘরার বিনুনিবিতান

326 Views

Spread the love

কবিতার নতুন প্রস্তাবনা


 

লিখছি। লিখতাছি। মূলত কাতরাচ্ছি। ক্রমশ ভেসে চলেছি বাচনের জলে। দূরে অথই গান, পিপাসা আর পিষ্টনের টান বিঁধে আছে বুকে। গলুই তবু  বিজনে তাক করে রেখেছি। কোথায় যাচ্ছি? এমন প্রশ্ন না করাই ভালো। ভোরের রোদ, চাঁদের বেহাগ, জোনাকির সংরাগ কী ইশারা করে? তাও বলতে চাই না। শুধু যেতে হবে। ধরে আছি তাই ধীবরের বাচন-বৈঠা। বৈঠাতেই উজান বাই। উজান এক বিকল্পের চাবি। সবাই এই চাবির খোঁজে মাঝি হতে আসে থরে-বিথরে।

 

মাঝ-দুপুরে তাই একলা বাই দূরের নাও। ঝড় আসে, ঢেউ আসে। যা চাই না তাও আসে। সবই কালের ত্বরণ। বিকালে আমি তার সহোদরা হই। একসাথে মরণে যাই, একসাথে নাচি।

 


পুরাণ থেকে নতুনে হাঁটা। দশ কদম পার হলে সমতল গদ্যের পাঁটা। দশ মানে দশদিগন্ত। অবধারিত এই দশে যে—যেভাবে পারে হাঁটুক। সমতলে নেমে আসলেই নিশ্চিন্ত আবাস। যে—যেভাবে পারে গড়ুক। শুধু মনে রাখুক—দশদিগন্ত পার হলেই সমতল, ধীরপায়ে হাঁটা।


 

কোন মাঝির সাগরেদ আমি? কোন ঘাট চেনা উপকূল? ভাবছি। কাতরাচ্ছি। বাইছি বাচনের বৈঠা। নাও তখন এইভাবে যায় যেন ঢেউয়ের ভেতর থেকে ঢেউতোলা ফুল। অন্যরকম ঘ্রাণ, অন্যসুরের ঐক্যতান, অন্যভাবে সাঁতরায়। দক্ষিণা হাওয়া এসে উত্তরে মিশে যায়। একদুপুর তার জন্য অন্যখেলা খেলি। স্বাধীনতা দিই। স্বাধীনতা এক ‘বিনুনিবিতান’। যে—কেউ নিতে পারে নিক। নেওয়াটা আবশ্যিক। মূলত তার জন্যই এই নতুন অভিষেক।

 

পুরাণ থেকে নতুনে হাঁটা। দশ কদম পার হলে সমতল গদ্যের পাঁটা। দশ মানে দশদিগন্ত। অবধারিত এই দশে যে—যেভাবে পারে হাঁটুক। সমতলে নেমে আসলেই নিশ্চিন্ত আবাস। যে—যেভাবে পারে গড়ুক। শুধু মনে রাখুক—দশদিগন্ত পার হলেই সমতল, ধীরপায়ে হাঁটা।

 


একটি মৌলিক রচনা


 

ঘুরিয়ে বলা কথার বিকাল পার হয়ে
কুঁচকানো আলোটার দিকে তাকাও
সন্ধ্যার সংশ্লিষ্ট আগুন জ্বেলে
আরো একবার ঘুরিয়ে দাও পথ
আকাশটা উল্টো করে পড়ো;
পাঁজর বেষ্টিত সামুদ্রিক অঞ্চল থেকে
রক্তের ঢাল বেয়ে বহু নদী বয়ে গেছে
বিস্তীর্ণ হাওরের দিকে।
গতিবিধি যাই হোক
একেক নদীর চোখ একেক রকম উজ্জ্বল ও উন্মুখ।

 

তুমি এই বিস্মৃত জলমুখ পার হয়ে এসো। উপেক্ষিত করতালি আরো বেশি সাঁতার শেখাবে তোমায়। বিমুখবার্তায় উঠে আসা ঘাসের কৌতুকে রাখো পা। রেডিসনে চিকেন কিনে খাও; হাড় চিবানোর শব্দে অনুভব করো জীবন চিবিয়ে খাওয়ার স্বাদই আলাদা।

 


ঘুমহীন মোমের আলো


 

মৃতদের মফস্বলে ফিরে আসে ঝড়
পরিসর বাড়ানো পালকের
ধুলো মেশানো চাঁদের গল্পটাই এখন
ঠিকানা হারানো মানুষের;
আমরা তার উল্টো হাওয়ায় খুঁজি
অবারিতের মুখ। যতটুকু বুঝি
এ অসুখ বিদ্রুপ-বিয়োগের ম্যূরাল,
সকালের চায়ে তাই লিকার কম হলে
মিশিয়ে খাই অর্ধেক জীবন,
চাঁদজলে ধুয়ে নিই অপরাধের শ্বাসকাটা রুমাল।

 

যাচাই করার প্রতিটি কুহক ঘিরে যে—সকল ধোঁয়াটে অন্ধকার তা তো অক্ষত কোনো রাত্রিরই অভিযোগ! গতিরোধক গানের পুস্তুকজুড়ে গুনগুন করা কুয়াশার ঋতু। শীৎকার পার হয়ে উড়ে উঠা শাদা ঘোড়াটাই কী তবে শিল্পের সেতু! কিছুটা কালহেতু বটে, কিছুটা বিস্মৃত বিভ্রাট। তবুও তুমি লেখো হাহাকার চমকানো লেখা। তোমার লেখা থেকে বেরিয়ে আসুক শতকিয়া আলো। সম্পর্কের সুষমায় আমি দাঁড়িয়ে যাবো অখ্যাত মোমের পাশে। সামন্তের ধূলিশ্বাসে গজাবে ফিদেলীয় প্রাচীর। অপেক্ষার চৌচির গান গুঁজে রাখবো উপচে পড়া কৌটায়। অহেতুক ঝড়-ঝাঁপটা যেন ঢুকে পড়তে না পারে আমাদের সংরক্ষিত এলাকায়।

 


সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ


 

ছাপাখানায় মৃতস্বপ্নের সাথে আরেকবার
দেখা হয়ে যায়; ওজনহীন উন্মাদনার
চশমাজুড়ে স্বতন্ত্র সন্ধ্যা নেমে আসে;
বন্ধক রাখি হাসি, ছেঁড়াপাতার আশে
প্রচ্ছদ ও প্রস্তাবনার উচ্চতর নীলে
হুমরি খায় সম্পর্কের হাই তুলে তুলে।

 

একশো আকাশ ভান ধরে দৃশ্যলুকাবার
সম্ভাব্যের একটা সকাল হোঁচট খেলে
আরেকটা সকালের ঘুম ভেঙে যায়,
কী করে লিখি এই বিশদ বায়ুর অভিসার!

 

জীবনকে ভুল-ভাল বুঝিয়ে চাঁদকে সাক্ষী মানা যায়, বিচার পাওয়া যায় না। মৃতদের আড্ডায় রকমারি চা পাওয়া যায়, স্বাদ পাওয়া যায় না। না পাওয়ার অন্ধকারই হস্তগত আয়না। আমি তার মুখোমুখি দাঁড়াই; দাঁড়ানোই জীবন। আর অইজীবন জানে কী করে এড়িয়ে যেতে হয় দৃশ্যের চোখ। একপাতায় লিখি তাই দুইপাতা সমুুুদ্রের শ্লোক। তুমি তার তিনপাতা রিভিউ শেষে দেখে নাও নিজেকে কতোটা এড়িয়ে যেতে পেরেছো।

 


ফাল্গুনের পোস্টকার্ড


 

[আমোদ আমাদের, আহ্লাদ আমাদের, অথচ মানুষের কিছু নেই]

 

বুক অব্দি পৌঁছানো এই চাঁদক্ষণ
অনর্থক ধুলায় মেশাচ্ছো কেন?
বামহাত লুকাতে গিয়ে ম্যারাথন
ডানহাতের চুলায় তুলেছো জীবন!

উদভ্রান্ত ছাইকাঁটা ফুটেছে পাঁজরে
নিযুক্ত সন্ধ্যায় ভিতরে ভিতরে
যে—সকল স্বর-সন্ধির ইশারাকুটির
খুলে বসে অবাক মানুষের দোকান
তার আড়ালেই দেখি উদীয়মান
পাখি ও পাতার টেরাকোটা মন্দির।

 

নিস্কৃতির নামে যে—সকল গাঙচিল ছেড়ে যায় ঋতুর প্রহার তার প্রশিক্ষিত শৃঙ্গার থেকেই হাড্ডিসার কথাগুলো একদিন স্বাস্থ্যবতী হয়, ছুঁয়ে যায় বনেদি পালকের নীল। অনুগামী শরীর থেকে খসে পড়ে চোখ। দূরমানুষের সজাগমন কিনে খায় বিচিওয়ালা আপেলের ভাষাবিজ্ঞান। এসবের বাইরে আশ্চর্যমূলক রাশিচক্র ঘোরে, যার কোনো ভাগফল নেই। কেবল চারচক্ষু দেয়ালে ধাক্কা লেগে ভেঙে যায় দুপুরের ঢেউ।

 


পাঠ্যসূচির ঘড়ি


 

ঘুমের ভেতর ডুবে যায় শৈলান্দ্র চাঁদ
হাঁটুজলে নৌকা ভাসায় বর্ষাপতি মেঘের বালক,
অভিঘাতের বজ্রপাতে
অপমানের দাঁত ভেঙে যায়,
চাঁদ কী তবে আইসক্রিম! শরীরভরা হিমের পালক!

ঘড়িতে গোলক ছড়ায় বেশুমার শীত,
প্রশ্নের বিপরীত
অবসাদ মেশানো কোলাজ
একটানা বেজেই চলেছে;
যেন শুকনো পাতার পাশে মর্মরে হরিণনাচ।

 

আমরা তার হাসফাঁস আয়ত্ত করে বসে থাকি পৃথিবীর ডেরায়। হঠাৎ একজোড়া পা উধাও হলে রক্তাক্ত জুতো পড়ে থাকে সিথানে। হঠাৎ একজোড়া হাত উধাও হলে রক্তাক্ত নোটবই পড়ে থাকে টেবিলে।

 

এই মিলে তারার মাঠে ফোটাচ্ছে কে অন্ধকারের ফুল? বেভুল আঙুল ছুঁয়ে দেখেছি ক্রিয়াশীল পতিতারা আমাদের অন্তর্গত কেউ না। শুশ্রুষার ছাতিমগাছের নিচে এদের কোনো ছায়া নেই, শেকড়-বাকড় নেই। ‘পাহারা দেবে’, এমন কোনো ল্যাম্পপোস্টও নেই। কেবল কথার উপকথায় মিশে আছে নিস্ফলা দুঃখের ফেনা। ফলে, আমাদের ঘুমের ভেতর বারবার চাঁদ ডুবে যায়। উলঙ্গ মেঘবুরুজ দাঁড়িয়ে যায় রক্তের টবে!

অথচ ঘুম একটা নিজের কেনা বাঁশি; আমরা তাকে বাজাবো কবে?

 


শূন্যতার রূপক


 

আশ্রিত গাছের গল্প নিয়ে ঝাঁপ দেয়া
একটা হলুদ পাতা
হাবুডুবু খায় বাতাসের জলে।
টলমলে একটা আকাশ
নিবিড় বুদবুদ ছুঁয়ে
ভেঙে পড়ে উদগ্র ধ্বনির ভেতর।

 

আরো কিছু ইচ্ছেডাক
গানের বিন্যাসে
ছড়িয়ে পড়ে অস্পষ্টতায়;
যেন পুরনো কোনো বিভার বিস্ফোরক।

 

তবুও আমরা ভিড় করি শিল্পের দোকানে। স্বপ্নের দামে একপ্যাকেট জোছনা কিনে খাই। প্রার্থনার ঝালফ্রাই কিংবা কিসমিস দানার ভোর নাগালে না পেলে চিবিয়ে খাই অর্ধেক জীবন। অর্ধেক কান্নাকাটি আরো বেশি মাতাল করে তোলে, হেসে ওঠে মদিরতার গেলাস। বিষাদের বিদ্যুৎ চমকানো দুপুরে কৃচ্ছতার ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে এলে জানা যায়

 

অন্ধসময়ে মৃতরাই বীর্যবান, জাদুর বাক্স খুলে দংশনের ভয় দেখায়।

 


আঙুল


 

আমার দশাঙুল দশটি মহাসড়কের মতো।
ছড়ানো হাওয়া থেকে খড়কুটো
বাছতে বাছতে
প্রথম আঙুল ধূলিঝড়ে অন্ধ হয়ে যায়।
দ্বিতীয় আঙুলে হাঁটতে শিখি
সিঁড়ি টপকাই
খসে পড়ে একেকটি আয়ুরেখা।
দশ বছর বয়সে হারিয়ে ফেলি দশ নম্বর আঙুল
যাচাই করার প্রতিটি আঙুলই জানে
আনন্দ ও আর্তনাদ করা অন্ধকারের মানে।

 

ব্যক্তিগত গানের শানেনযুল পার হলেই বিলাপের রানওয়ে। সেখানকার চন্দ্রযানের প্রতিটি প্রশংসাই একেকটি আত্মহত্যাপ্রবণ ঋতুর কঙ্কাল। তবু ব-কাল পেরিয়ে সকাল হয়, আমরাও রক্তের উজান ধরে হাঁটি বহু জন্মের স্রোত। বহু অভিযোগ আর অপরাধের অনুপ্রাস পার হয়ে রপ্ত করি আঙুল দিয়ে আঙুল গণনার কৌশল। জনজট থেকে ছেঁটে ফেলি বানোয়াট চিঠির খসড়া। খেয়াঘাটে ফেলে আসা ভুল সিদ্ধান্তের মতো গণতন্ত্র বিধিবদ্ধ নয়। বিরহ মন্থন করা প্রতিটি আঙুলের সিদ্ধান্ত তাই আঙুলের কাছেই। আমার আঙুলও আমার জীবন, প্রবল প্রবাহের দিকে ছড়িয়ে পড়া স্ফীত হরিণের ডাক।

 


বিনোদবিহার


 

ফুটে আছে অভিমানী স্তনের বোঁটা
আপেলের চোখ,
গাভিন রাতের ইশারায়
ডিম ফোটায় অন্তর্গত চাঁদ, বিরহের শ্লোক।
অন্ধকারে দাঁত দেখানোর মতো তখন
অনেক কিছুই ঘটে
সাধ ও সাধ্যের বাটিতে
হেসে ওঠে রোদেলা সরোদ।
সচেতন শব্দের মৃত্তিকায়
জ্যোৎস্নার পলি পড়ে ব্রহ্মচারের দূরত্ব ঘুচে যায়।

 

নির্জনতার শরীর থেকে মুছে যায় ঈষৎ ঘামগন্ধ। সন্দেহের আলোকে যেসব মাজার উঠে হেগলীয় পাড়ায়, তার পাশেই সাদা কবুতরের ডাক মুকুট পড়ে ওড়ে। চেতনাকে লিখে রাখি খ্যাতিমান সারসের ডানায়। ভূস্বর্গ থেকে এই আরাধ্যতার বায়ুপথে লাল হয়ে ওঠে শৈশবের উড়াল।

 


সহজ কথামালা


 

ভেতরে গিরিখাত, লাবণ্যের নদী
স্থল ও জলে তুমি একাকার…।

 

আমি সকালের সমার্থক অনুভূতিশীল
শব্দ ও শিশিরের দ্রবণ।
পালক ছড়ানো পরাগের বিলে
নির্জনতার আলো হয়ে সাঁতরাই
অনাবৃত আনন্দের ধারায়।
সাঁতারের শ্বাস থেকে মূহুর্মুহু
আছড়ে পড়ে চাঁদ,
চাঁদেরা বিছা খুলে ঝরনা হয়ে যায়…।

 

অর্চনায় তুমি বেগানা রাত্রির সকাল, রোদ্রের অনুরূপ কথাচালাচালি; বর্ণহীন গদ্য-পদ্যে একাকার…। আমি তোমার মলাটবন্ধ সহজ কথামালা, অনুচর চড়ুই পাখির গোপন করা অভিমান। ঝাউপত্রে গুঁজে রাখি খেয়ালি রোদ ও বৃষ্টির ধারাপাত।

 


বালিকামুখ; মূলত সে মৃত্তিকা


 

চেয়ে আছে বালিকামুখ
মূলত সে মৃত্তিকা; মৃদঙ্গে ঊষাঢেউ
হাওয়াপাতার কম্পন,
যেন মহাকালের দিকে ছড়িয়ে থাকা
অপেক্ষারত ট্রেনদর্শন;

 

চলো তার গানজলে স্নান করে আসি
বিরহের বেলপাকা দুপুরে,
বহুদিন চরকি হাতে দেইনি দৌড়
প্রশমিত বৃষ্টির ধারায়
মুকলিত প্রশ্ন আজ মাঠের রাখালে চড়ায়।

 

ধানের কাঁন্দি ভেঙে দেইনি মলন বাউরি উঠোনে। উত্তরের বাও শরীর টানে, দক্ষিণের বাও টানে গামছার হাত। চলো যাই কথা বলি উদোম বাতাসের সভায়। ও আমার হলুদবাটা মেন্দিবাটা লক্ষীপেঁচার গ্রাম; বিবর্ণ বিলাপ শেষে আমি তোমার স্নেহময় নিদ্রায় ডুবে থাকি। রক্তের ভেতরে বাজে তালপাতার বাঁশি। চলো যাই ধল্লিবিলের মাঠে বাঁশিটার হাসি-খুশি গান বুনে আসি।

 

 


 

কবি

হাসনাইন হীরা

ঠিকানা—বাঙ্গালা, উল্লাপাড়া, সিরাজগঞ্জ
শিক্ষা—সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর

অর্জনজেমকন তরুণ কবিতা পুরস্কার-২০২০।

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *